একজন হেলথকেয়ার স্পেশালিস্টের জীবনের গল্প

একজন হেল্থকেয়ার স্পেশালিস্টের জীবনের গল্প
একজন হেল্থকেয়ার স্পেশালিস্টের জীবনের গল্প

ড. মশিউর রহমান:   ঘটনাটি ১৯৯৪ সনের মে কিংবা জুন মাসের কোন একটি সময়। আমাদের টিনের ছাদের বাসাতে দুপুরে খাবারের কার্যক্রম শেষ করে আমরা ভাইয়েরা মিলে গল্প করছি। হটাৎ পোস্ট অফিসের পিয়ন এসে একটি চিঠি দিয়ে গেল। সেই চিঠি আমাদের পুরো পরিবারকে আলোড়িত করে ফেললো। আমরা মধ্যবিত্ত পরিবার তখন ঢাকাতে নিজের একটু ঠাঁই করে নিতে ব্যস্ত। সেই সময়ে বিদেশ ভ্রমণ ছিল আমাদের জন্য অলিক স্বপ্নের মতন একটি ব্যপার। অথচ সেই কাগজটিতে একটি পুঁচকে ছেলে- যে কিনা মাত্র কলেজ পার হয়েছে, তাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে জাপান সরকার জানাচ্ছে যে, সরকারি বৃত্তি নিয়ে জাপানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে।

জাপানে যাবার বিমানের টিকেটের জন্য ছেলেটিকে যোগাযোগ করতে বলা হচ্ছে। আপাত দৃষ্টিতে সেটি সামান্য একটি কাগজ হলেও, আমাদের মতন তখন যারা খুব সাহস করে স্বপ্ন দেখছে – তার কাছে সেটি সত্যিই একটি আলাদিনের চেরাগের মতনই ছিল।

গ্রামের বাড়ি থেকে কেউ বেড়াতে আসলে- ঢাকা শহর পর্যটন করে দেখানোর দায়িত্ব ছিল আমার। আর সেই লিস্টে এয়ারপোর্টটি রাখতে ভুলতাম না। দূরের আকাশের বিমানের দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন বুনতাম – দেখ একদিন আমিও বিমানে উঠবো। কাগজটি যেন সেই স্বপ্নকে একেবারে কাছে নিয়ে এল। সারা বাংলাদেশ থেকে মাত্র ৪ জন মেধাবি ছেলেকে জাপান সরকার সেই সুযোগটি দিচ্ছে। সেই সুযোগটি আমার কাছে এলে সতির্থদের তখন কি হিংসে। কিন্তু এমনিতেই কি আমন্ত্রণটি চলে এলো? মোটেও তা নয়। এর পিছনে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম এবং লেগে থাকার গল্প।

কলেজে থাকতেই আশে পাশের বড় ভাইদের দেখতাম বিদেশে বৃত্তি নিয়ে যেতে। প্রায় তিন বছর আগ থেকেই ভালোমতন যোগাযোগ করা শুরু করে দিয়েছিলাম তাদের সাথে। কি কারণে তারা পেল এই প্রশ্নটার উত্তরটা তখন খোঁজার চেস্টা করেছিলাম। প্রায় সবার বাসায় ঘুরে মনে হল, এরা সবাই আমার মতন মধ্যবিত্ত। কিন্তু একটি জিনিস টের পেলাম তারা সবাই আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছেন এবং প্রচুর পরিশ্রম করেছেন। সেই সময়ে আমরা উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা যখন আড্ডাবাজি, প্রেম কিংবা রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত – এরা তখন নিজেকে তৈরী করেছেন। কলেজ হোস্টেলের করিডোরে দেখলাম সাকলায়েন ভাই, এসএসসি’তে সারা বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম হয়েছেন। কিন্তু খুব কাছ থেকে দেখলাম কোন যাদু নেই তার কাছে, শুধুমাত্র পরিশ্রম করে লেগে থাকা ছাড়া।

তাদের দেখাদেখি শুরু হল – আমার নিজেকে তৈরী করা। শুরু হল রিভিশন এর পরে রিভিশন। পাশাপাশি যোগাযোগ শুরু করলাম শিক্ষা মন্ত্রনালয়; ভারত, জাপান, তুরষ্ক, অস্ট্রেলিয়া, চীনের এম্বাসিগুলিতে।

শিক্ষা মন্ত্রনালয়ে কিভাবে ঢুকতে হবে সেই কৌশল রপ্ত করলাম। দুপুরে ক্ষীধে লাগলে কিভাবে একটি সিঙ্গারা দিয়ে ক্ষুধা মিটাতে হয়? – তাও শিখে নিলাম। শিক্ষা মন্ত্রানালয়ের নোটিশবোর্ডে কখন কোন দেশের বৃত্তির জন্য আবেদন করতে হবে সেই নোটিসগুলিতে নিয়মিত চোখ রাখতাম। একদিন সারা শহরে কি বৃষ্টি! পুরো শহর ডুবে যাচ্ছে, অথচ সেই ঝড় তুফানের মধ্যতেও মিনিবাসে ঝুলে-ঝুলে বৃষ্টিতে পুরো ভিজে হাজির নোটিস বোর্ডটি দেখতে। কোন নতুন নোটিস আছে কিনা। আজকের দিনে অনলাইনে ঘরে বসেই যারা তথ্য সংগ্রহ করে – তাদের ঠিক বোঝান যাবেনা কত কষ্টে আমাদের তথ্য সংগ্রহ করতে হোত।

ভারতের বৃত্তির কাগজ জমা দিতে যেয়ে মারাত্মক নাজেহাল হতে হল। একবার এখানে জমা দিই -তারা বলে অন্য জায়াগায় জমা দিতে। আবার সেই জায়গাতে জমা দিতে গেলে – তারা বলে অন্য জায়গায় জমা  দিতে। একবার এই অফিস, আরেকবার সেই অফিস। রাগ করে সব জায়গাতেই জমা দিচ্ছি আর ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে বেড়াচ্ছি। কিছুদিন পরে টের পেলাম – আমার অনেক সতীর্থরাই আশাহত হয়ে ঝড়ে পড়ছে।

তাদের আর খুব একটা মন্ত্রনালয়ের করিডোরে দেখা যাচ্ছে না। একটু একটু করে তাদের সংখ্যাটি কমতেলাগলেও – আমি আশাহত হলাম না। ঝড় বৃষ্টির মধ্যেও মন্ত্রণালয়ের নোটিস বোর্ডটা নিয়মিত দেখছি।

সবার শেষে আসলো জাপানের বৃত্তির নোটিস। সেই নোটিসটা পেলাম জমা দেবার শেষদিনের মাত্র কয়েকদিন আগে। সল্প সময় বলে অনেকেই আলসেমি করে আবেদন করলনা। আমি অল্প সময়েই আবেদন পত্রটি তৈরী করতে লেগে গেলাম। সেই সময়ে ছবি কোন সরকারি কর্মচারি দিয়ে সাক্ষর করে নিতে হোত।

পাড়ার এক আংকেল এর বাসায় অনুরোধ নিয়ে – কাচুমাচু হয়ে অপেক্ষা করছি। সবাই আড় চোখে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য দিচ্ছে – এই স্বপ্নবাজ ছেলেকে। সেসবকে পাত্তা না দিয়ে আবেদনপত্রটি জমা দিলাম।

আবেদনপত্রটি যদি ঠিকমতন জমা না হয়, সেই চিন্তায় আরেকটি জমা দিলাম শেষের দিনেও। কোন এক বড়ভাই বলেছিলেন যে, অনেক সময় আবেদনপত্র নাকি পিয়নরা ফেলে দেয়।
দু-দুইবার জমা দেবার কারনেই কিনা জানিনা বৃত্তি পরীক্ষা দেবার লিস্টে আমার নাম পেলাম তাও একেবারে তালিকার শেষের দিকে। যাক পরীক্ষায় তো বসতে পারবো! শুরু হল আবার হোমওয়ার্ক – নিজেকে তৈরী করার পালা। নিজের রুমে শুরু হল রিভিশনের পালা। যেহেতু আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষা হবে তাই নীলক্ষেতে বইয়ের খোঁজে গেলাম। আমার দরকার একটি প্রশ্নের বইয়ের যা দিয়ে ভালোমতন নিজেকে যাচাই করে নিতে পরবো এবং প্রস্তুতি নিতে পারবো। সেই বইটি নীলক্ষেতে তন্নতন্ন করেও পেলাম না। কয়েকদিন ঘোরাঘুরি করে পরে একদম পিছনের একটি দোকানে পেলাম সেই বইটি। প্রথম দিনেই ক্ষান্ত হলেই পেতাম না বইটি। পরীক্ষায় আমার সতীর্থরা দেখলাম প্রশ্ন পড়েই ভ্যাবাচাকা। টের পেলাম জোঁকের মতন বইটি খোঁজার কাজটি ব্যর্থ হয়নি।

আজকাল সফলতা পাবার জন্য সবাই মোটিভেশন স্পিকারদের পিছনে দৌড়ায়। আসলে সেই সব কিছুই নয়। প্রয়োজন শুধু “পরিশ্রম করে লেগে থাকা”। হ্যাঁ এটাই মন্ত্র!

গত বছর একটি ছেলে আমার সাথে যোগাযোগ করলো, “স্যার কিভাবে বৃত্তি নিয়ে বিদেশে যাব?” তাকে আমার উপরের গল্পটি বললাম। এবং উপদেশ দিলাম- এম্বাসিতে নিয়মিত যেতে। আমার উপদেশ তার পছন্দ হয়নি। সে আশা করেছিল -বৃত্তির চিঠিটি হয়তো তার হাতে আমিই তুলে দিব। আমার মতন স্বপ্নবাজদের বলি, “পরিশ্রম করে লেগে থাকো”। এটাই সফলতার মন্ত্র।

“ কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে
দুঃখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহীতে? ”

লেখক:   ড. মশিউর রহমান: জাপানে মনবুশো বৃত্তি নিয়ে পড়াশুনা করে ডক্টরেট ডিগ্রি নিয়ে বাংলাদেশে ফিরে নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাকতা করেছেন। বর্তমানে সিঙ্গাপুরে ডিজিটাল হেল্থকেয়ার স্পেশালিস্ট হিসাবে কর্মরত। পাশাপাশি শিক্ষার প্লাটফর্ম LearnTime.org এর প্রতিষ্ঠাতা। ইমেইল: mashiur@ymail.com