আশ্চর্যময় রূপায়ণ কালের যাত্রী সুফিয়া কামাল

আশ্চর্যময় রূপায়ণ কালের যাত্রী সুফিয়া কামাল
আশ্চর্যময় রূপায়ণ কালের যাত্রী সুফিয়া কামাল

ড. পারভীন জলী  

আপনার ঘর মানে ঘর আর বাইরের নীল/ভাষার থালায় ভাত খেতে বসে অপার নিখিল/কারা ভাত কেড়ে নেয়, সাবধান, সামাল, সামাল/ভাত মানে ভাষার খালাম্মা সুফিয়া কামাল/ঐতো লক্ষ ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনি দামাল/সবুজ দীপের মতো মাঝখানে সুফিয়া কামাল।

কবীর সুমনের মতো এত সুন্দর ও সহজভাবে কে আর আমাদের সুফিয়া কামালকে বলতে পেরেছেন! গত শতকের বাংলার এক আশ্চর্য নাম সুফিয়া কামাল। ২০ জুন এই মহীয়সী নারীর জন্মদিনের প্রাক্কালে যখন তার সম্পর্কে ভাবতে বসি, তখন হঠাৎই মনে হয় আসলেই কি সুফিয়া কামালরা আমাদের মাঝে এসেছিলেন? এই সুবিধাবাদী আর দলকানা সময়ের দিকে তাকালে প্রশ্নটা আরও বাস্তব লাগে। অথচ কী বিরূপ আর চরম প্রতিকূল সময়ের মধ্যে সুফিয়া কামালদের বেড়ে ওঠা। বিপুল প্রতাপ নিয়ে তারা আমাদের জন্য তৈরি করে গেছেন একটি ক্ষেত্র, যেখান থেকে আমাদের শুধু সামনেই এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই ক্ষেত্রটা ব্যবহার করে আমরা ঠিক কতটা এগোতে পেরেছি তা নিয়ে রয়েছে যথেষ্ট সন্দেহ।

বাংলায় নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সুফিয়া কামাল এক অনবদ্য নাম। কিন্তু আমাদের সমাজে বিরাজমান পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবোধের কারণে এ রাষ্ট্র গঠনে সুফিয়া কামালের যে ত্যাগ, তিতিক্ষা ও অবদান তা সম্পর্কে আমরা বর্ণাঢ্য আলোচনা দেখতে পাই না। বাংলায় গণমানুষের সামাজিক বঞ্চনা, সামাজিক অসাম্য বিশেষ করে নারী শিক্ষার অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার, এমনকি আইনগত অধিকার নিয়ে আমৃত্যু লড়াই করে গেছেন তিনি। একজন আটপৌরে সরল জীবনযাত্রার স্বকীয় সৌন্দর্যের নারীর দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলে আমাদের দৃষ্টির সম্মুখে যে মাতৃমুখের অবয়ব অন্তরের মাধুর্য ও চরিত্রশক্তির দৃঢ়তা নিয়ে পরম মমতায় পাশে দাঁড়ান তিনিই সুফিয়া কামাল। তিনি নিজে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত না হলেও আজীবন নারী শিক্ষার অধিকারসহ নানাবিধ অধিকারের প্রশ্নে সংগ্রাম করে গেছেন। তৎকালীন কুসংস্কারাচ্ছন্ন পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশে বাস করেও তিনি নিজ প্রচেষ্টায় হয়ে ওঠেন স্বশিক্ষিত। পরিবারে উর্দু ভাষার চর্চা থাকলেও নিজের সাধনায় বাংলা ভাষা রপ্ত করে আজীবন বাংলায় সাহিত্যচর্চা চালিয়ে গেছেন এই মহীয়সী নারী।

সুফিয়া কামাল অত্যন্ত রক্ষণশীল পরিবারে বড় হয়েও দেশমাতৃকা, গণমানুষ, সমাজ ও সংস্কৃতির সংকট নিয়ে প্রতিনিয়ত ভাবতেন। তার চিন্তা ও কর্মতৎপরতার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৩১ সালে তিনি মুসলিম নারীদের মধ্যে প্রথম নারী হিসেবে ‘ভারতীয় মহিলা ফেডারেশন’-এর সদস্য নির্বাচিত হন। বেগম রোকেয়া ছিলেন তার সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে যোগদানের অনুপ্রেরণা। তাই তো তিনি নিভৃতে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের প্রতিষ্ঠিত ‘আঞ্জুমান-ই- খাওয়াতিন’ প্রতিষ্ঠানের হয়ে দীর্ঘদিন বস্তি এলাকায় ঘুরে ঘুরে মেয়েদের শিক্ষিত করে তোলার কাজ করে গেছেন। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের সময় বর্ধমানে এবং ‘৪৬-এর ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’র সময়ে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্র্রদায়িক দাঙ্গার পর বিপন্ন গণমানুষের সেবায়ও কাজ করেছেন।

মা ও মাটির প্রতি সুফিয়া কামালের ছিল গভীর টান। মায়ের ভালোবাসা স্মরণ করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘মাটিকে বাদ দিয়ে ফুল গাছের যেমন কোনো অস্তিত্ব নেই আমার মাকে বাদ দিয়ে আমারও তেমন কোনো কথা নেই।’ সাত বছর বয়সে তার পিতা আবদুল বারী গৃহত্যাগ করলে মা সৈয়দা সাবেরা খাতুন তাকে বড় করে তোলেন। মেয়েবেলা থেকেই জীবনের কঠিন সংগ্রাম কোনোভাবেই সুফিয়ার পিছু ছাড়েনি। কিন্তু তার জীবনের সব প্রতিকূলতা, নানাবিধ ঘাত-প্রতিঘাত তাকে অনন্য মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছিল। অল্প বয়সে স্বামী নেহালকে হারানো, তার কিছু বছরের মধ্যে নিজ জীবনের অনুপ্রেরণা বেগম রোকেয়া এবং মমতাময়ী মাকে হারিয়ে জীবনের কঠিনতর পরিস্থিতির সম্মুখীন হন সুফিয়া। কিন্তু তিনি যতবার ভেঙে পড়েছেন ততবারই আবার সব দুঃখকে জয় করে, সব বাধা দুমড়েমুচড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন।

১৯৪৭ সালে সুফিয়া কলকাতা থেকে দেশে ফিরে আসেন এবং লীলানাগ রায়ের সঙ্গে মিলে ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ঘুরে ‘ওয়ারী মহিলা সমিতি’ গড়ে তোলেন। এ সমিতির নারীরা সমকালীন সকল সংগ্রামে একযোগে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৯ সালে তিনি ‘সুলতানা’ পত্রিকার কাজ শুরু করেন, যা বেগম রোকেয়ার ‘সুলতানার স্বপ্টম্ন’-এর ‘সুলতানা’ চরিত্রটির নামের অনুপ্রেরণায় নামকরণ করা হয়। ১৯৫০ সালে মুসলিম লীগ সরকার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করে পূর্ববঙ্গের প্রগতিশীল আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে চাইলে সুফিয়া কামাল ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করা ও দাঙ্গা রোধ করার কাজে সম্পৃক্ত হন।

মহান ভাষা আন্দোলনেও সুফিয়া কামাল সামনের সারি থেকে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষণ করা হলে সুফিয়া কামাল, মমতাজ বেগমসহ অসংখ্য শিক্ষার্থী বিক্ষোভ করেন। বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানার অংশ হিসেবে পাকিস্তানি সরকার রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে তিনি তার বিরুদ্ধেও তীব্র প্রতিবাদ জানান। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষে তিনি ‘সাংস্কৃতিক স্বাধিকার আন্দোলন’ পরিচালনা করেন এবং এ সময়েই রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি এবং পল্লিগীতির ভালো শিল্পী তৈরির লক্ষ্য নিয়ে সংগীত বিদ্যায়তন ছায়ানটের প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৬১ সালে পারিবারিক আইন প্রণয়নের অন্দোলনেও সুফিয়া কামাল অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন যার মধ্য দিয়ে বহুবিবাহ রোধ, তালাক প্রথার অপপ্রয়োগরোধ, বিয়ের রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক, মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৬ এবং ছেলেদের বিয়ের বয়স ২১ নির্ধারণ করা হয়। তৎকালীন সময়ে আলেম এ আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালে এবং এ আইন সংশোধনের দাবি করলে সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে নারীরা একত্রিত হয়ে ১৯৬৩ সালের ৫ অক্টোবর প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন। তাদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতেই ১৯৬৩ সালের নভেম্বর মাসে কোনো প্রকার সংশোধনী ছাড়াই জাতীয় পরিষদে আইনটি গৃহীত হয়। নারী অধিকার প্রশ্নে পাকিস্তান আমল থেকে যে যুদ্ধ তিনি শুরু করেছিলেন তা জারি ছিল আমৃত্যু। আপসহীন সংগ্রামী মনোভাবের কারণেই ধর্মান্ধ এবং প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণির প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হন তিনি। কিন্তু রক্তে যার ন্যায় আর সংগ্রামের নেশা তাকে টলাতে পারে কে! তাই সব বাধা ডিঙিয়ে, সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে একটি অসাম্প্রদায়িক এবং সমঅধিকার ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে তিনি কাজ করে গেছেন।

উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানেও সুফিয়া কামাল অগ্রগামী ভূমিকা রাখেন। গণঅভ্যুত্থানে আসাদের মৃত্যুর পর ৭ ফেব্রুয়ারি তারিখে তার নেতৃত্বে হাজার হাজার নারী মিলিত হয়ে শোক মিছিল বের করে। ফলে আন্দোলন থেকে সুফিয়া কামালকে সরাতে পাকিস্তানি-সরকার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কিন্তু সবকিছু উপেক্ষা করে অবিচল থাকেন সুফিয়া কামাল। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় নারী নেতৃবৃন্দ সুফিয়া কামাল ‘পূর্ব পাকিস্তান মহিলা সংগ্রাম পরিষদ’ গড়ে তোলেন, যা স্বাধীন বাংলাদেশে ‘বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ’ নামে পরিচিতি লাভ করে। তিনি মহিলা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান হিসেবেও কাজ করেন। মূলত ১৯৬৮ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পূর্ণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, জরুরি আইন প্রত্যাহার, দমননীতি বন্ধ, রাজবন্দির মুক্তিসহ নানা দাবিতে দেশব্যাপী যে গণতান্ত্রিক আন্দোলন তার প্রতিটিতেই সুফিয়া কামাল অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছেন। এ সময় তিনি সামরিক শাসকদের গণবিরোধী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে, রাজবন্দিদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে সংগ্রাম করেছেন। এ ছাড়া সুফিয়া কামাল বাংলাদেশ মহিলা পুনবার্সন বোর্ড, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ পল্লি উন্নয়ন কমিটি এবং দুস্থ পুনর্বাসন সংস্থা, নারী কল্যাণ সংস্থা গড়ে তোলায়ও নেতৃত্ব দেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও সুফিয়া কামাল গৌরবোজ্জল ভূমিকা রাখেন। তিনি তার দুই কন্যা সুলতানা কামাল ও সাঈদা কামালকে নিয়ে বিভিন্ন ক্যাম্প ও হাসপাতাল ঘুরে ক্যাম্পে আশ্রিত বাংলাদেশের জনগণের সেবা-শুশ্রূষা করেন।

সুফিয়া কামাল তার সংগ্রামমুখর জীবনকালকে উল্লেখ করেছেন আশ্চর্যময় রূপায়ণের কাল হিসেবে। কারণ তার ক্ষুদ্র জীবনে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, ভারতের স্বাধীনতার সংগ্রাম, দেশভাগ, ভাষার জন্য বাঙালির সংগ্রাম, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধসহ বিশ্বব্যপী ঘটে যাওয়া নানা সাংস্কৃতিক বিপ্লব। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে প্রাণ হারালে সব ভয়ভীতি উপেক্ষা করে তিনি এ হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে সমগ্র দেশবাসীকে তিনি সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান এবং নিজে সামরিক সরকারের ঘোষিত কারফিউয়ের বিরুদ্ধে গিয়ে মৌন মিছিলে নেতৃত্বদান করেন। তার এ বৈচিত্র্যময় জীবনে তিনি যেমন সমাজের ভয়াবহ পর্দার বেড়াজাল অতিক্রম করেছেন, ঠিক তেমনিভাবে বাংলাদেশের রাজপথের নারীনেত্রী হিসেবে গণমানুষের জীবন পরিবর্তনে অনবদ্য ভূমিকা রেখে নিজ স্বভাবগুণে অনন্য হয়ে আছেন।

নারীর সামাজিক শৃঙ্খল ভেঙে মুক্তির দিগন্ত উন্মোচন করার জন্য বাংলার নারীর ইতিহাসে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। নারীজীবন নিয়ে তার অনুভব ছিল গভীর। তাই তো তিনি বলেছেন, ‘আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লাগে এই দেখে যে, মেয়েরা আগের তুলনায় এখন অনেক সাহসী হয়েছে। মেয়েরা এখন রাস্তায় বেরিয়ে অন্তত নিজেদের কথা বলতে শিখেছে। আমরা চেয়েছিলাম, মেয়েরা কথা বলতে শিখুক, সাহসী হয়ে উঠুক, নিজেদের অধিকার তারা বুঝতে পারুক। এটা এখন হয়েছে। এটা বড় আনন্দের।’ সনৎকুমার সাহা তার সম্পর্কে যথার্থই বলেছেন, ‘সুফিয়া কামালের অনুভূতি, মনন, বুদ্ধি, ইচ্ছা, এমনকি কায়া ছিল সমস্ত পৃথিবীর সাথে তিনি যে একাত্মবোধ নিয়ে চলতেন তারই এক অবিচ্ছেদ্য রূপ। তিনি সর্বদাই পৃথিবীর সর্বক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলেন- হয়তো গড়ার কাজে, নয়তো প্রতিবাদে। এ উপস্থিতিতে তিনি সদা নির্দেশ নিয়েছেন তার বিবেকের কাছ থেকে এবং কখনই হননি পলায়নপর।’ সুফিয়া কামাল বাঙালির এমন অভিভাবক ছিলেন যিনি সংঘাতকে ব্যক্তিগত করে না দেখে আদর্শের জন্য আমৃত্যু লড়ে গেছেন। এক্ষেত্রে তিনি তার সংগ্রামের সহযাত্রীদের ভুলগুলোও ধরিয়ে দিয়েছেন অকপটে।

আজ ২০ জুন এই সাহসী নারীর জন্মদিন। যিনি জাতি, ধর্ম, বর্ণকে অতিক্রম করে অহংকারহীন, সংকোচহীন, আপসহীন দৃঢ় চেতনায় জননীর অনপেক্ষ সমদৃষ্টি দিয়ে বাঙালি জাতির জন্য মঙ্গলদ্বীপ জ্বেলেছেন। জন্মদিনে আপনাকে অভিবাদন জানাই জননী সাহসিকা।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় । Email: arvin.joll@yahoo.com ।