ভারতের ‘চীন নীতি’-তে অবশ্যই পরিবর্তন আনতে হবে

নিউজ ডেস্ক:   চীনা কৌশলের প্রেক্ষিতে ভারতের এমন কোনো কৌশল অবলম্বন করতে হবে, যা সামরিক সংঘাত এড়াতে সাহায্য করবে।

সাম্প্রতিক চীন-ভারত সম্পর্কের সমীকরণ বদলে দেয়া গালওয়ান সীমান্ত সংঘাতের প্রায় এক বছর হতে চললো। সেসময় উভয় পক্ষেই উল্লেখযোগ্য প্রাণহানির ঘটনা ঘটে, যার মধ্যে প্রায় ২০ জন ভারতীয় সৈন্য হতাহত হয়।

এরপর চলতি বছর ফেব্রুয়ারী মাসে প্রথম সংঘাত বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয় দুই পক্ষ। কিন্তু তারপর থেকে দফায় দফায় আলোচনা করলেও কোনো কার্যকর সমাধান করতে পারেনি তাঁরা। ভারত যেখানে সীমান্তে অতিরিক্ত সৈন্য প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে, সেখানে চীন ভিন্ন পন্থা অনুসরণে ব্যস্ত।

চীন বরাবরই দাবি করে আসছে যে, তারা ১৯৯৩-২০০৩ সালের মধ্যে স্বাক্ষরিত সীমান্ত সমঝোতা চুক্তি গুলো মেনে আসছে। কিন্তু ভারত এক্ষেত্রে সবসময়ই চীনকে সীমান্ত লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত করছে।

এটা বলা বাহুল্য যে, চীন যদি সীমান্তে কোনো প্রকার স্থিতাবস্থা গ্রহণে বাধ্য হয়, তাহলে সেটিও তাদের পরাজয় তুল্য। তাই তাঁরা আলোচনাকে যথাসম্ভব টেনে নেয়ার চেষ্টা করবে। অন্যদিকে, যেকোনো প্রকার শান্তি সুরাহাও ভারতের জন্য বিজয় তুল্য, যা চীন কখনোই মেনে নিবেনা।

ফলস্বরূপ, চীন লাইন অব একচুয়াল কন্ট্রোলের কাছাকাছি অবকাঠামোগত বিকাশ, সৈন্য সমাবেশ এবং গভীর অঞ্চলে মহড়ার মতো সকল কার্যক্রম অব্যহত রেখেছে। তবে এসব বিষয়ের চেয়েও উদ্বেগজনক হচ্ছে, শান্তি প্রতিষ্ঠায় চীনের অনীহা। ভারতও তাই প্রতিনিয়ত নিজ সীমান্তে সৈন্যদের সতর্কভাবে দায়িত্ব পালনে তাগাদা দিচ্ছে। তাঁরা চীনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ পূর্বক যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।

এদিকে, সর্বশেষ এক প্রস্তাবনায়, চীন ভারতকে স্থানীয় পর্যায়ের বিরোধ গুলো মেজর জেনারেল পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে এখনও এই প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দেয়নি ভারত।

ইতোপূর্বে আমরা দেখেছি, লাদাখে সীমান্ত রেখা লঙ্ঘনের সময় চীন নিজেদের সামরিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বকে কাজে লাগিয়ে নিজেদেরকে গোটা বিশ্বের কাছে একমাত্র এশীয় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের বার্তা দিতে চেয়েছিলো। তাঁরা ভেবেছিলো ভারত কোনো প্রতিক্রিয়া জানানোর পূর্বেই তাঁরা তাঁদের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করবে। কিন্তু ভারতের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তাঁদের সেই পরিকল্পনাকে ভন্ডুল করে দেয়। উপরন্তু কৈলাশ পর্বত ভারতের দখলে থাকায় ভারতীয় সৈন্যগণ কৌশলগত সুবিধা পায়। ফলে প্যানগং সহ অন্যান্য অঞ্চলে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় চীন।

ভারত সম্প্রতি চীনা আগ্রাসনের প্রতিবাদ জানিয়ে অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক হ্রাসে সচেষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে, চীন বরাবরই সীমান্তের বিষয়গুলো কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের সঙ্গে না মেলানোর আহবান জানিয়ে আসছে। তবে একটি কথা না বললেই নয়, যতক্ষণ না ভারত এবং চীনের মধ্যকার জাতীয় শক্তির বিস্তৃত ব্যবধান কমে আসছে, ততক্ষণ অবধি চীনের আগ্রাসন মোকাবেলায় ভারতকে সর্বোচ্চ সচেষ্ট থাকতে হবে।

চীনা দর্শনের প্রেক্ষিতে ভারতের এমন কোনো কৌশল অবলম্বন করতে হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে সামরিক সংঘাত এড়াতে সাহায্য করবে। এর প্রথম ধাপ হিসেবে ভারতীয় নেতৃত্বের উচিত হবে এমন দাবি না করা, যেখানে বলা হবে ‘কোনো ভূখন্ড হারায়নি ভারত।’

বাস্তবতা হচ্ছে, ভারত ভূখণ্ড হারিয়েছে এবং চীনারা এখানে অনুপ্রবেশ করেছে। আমরা যদি এখনই এই অনুপ্রবেশকারী অঞ্চলটিকে ভারতীয় ভূখণ্ড হিসেবে অভিহিত না করি, তাহলে এর সুবিধা চীনই পাবে।

সীমান্তে সংঘাত গুলো এড়ানোর জন্য ভারতকে দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পনা করতে হবে। উত্তর এবং পূর্ব সীমান্তে আক্রমণ ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে, চীনের যেকোনো ভুলের সর্বোচ্চ সুযোগ গ্রহণ করতে হবে।

এছাড়াও, ভারত যদি দীর্ঘমেয়াদে চীনের দুরভিসন্ধিগুলো শুরুতেই আটকে দিতে চায়, তাহলে বর্তমানে ভারতে যেসব প্রযুক্তির অভাব রয়েছে, সেগুলো সংগ্রহ পূর্বক সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি, অর্থনৈতিকভাবে চীনকে আটকাতে ৫জি সহ অন্যান্য ভারতীয় প্রকল্প গুলো থেকে চীনকে বাদ দেয়ার যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা কার্যকর করতে হবে। এতে চীনের অর্থনীতিতে আঘাত পড়বেনা সত্যই, কিন্তু তা চীনের অহংকারকে ধূলিস্মাত করে দিবে। একই সঙ্গে, বিশ্বব্যাপী চীনা টেলিকম সংস্থাগুলোকে টেক্কা দিতে আমাদেরকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

তাছাড়া, ভারতকে এখনই কোয়াড এবং সমমনা অন্য দেশ ও জোট গুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি করতে হবে। অন্যদিকে, চীনের সাথে ব্যবধান হ্রাস করার জন্য আগামী দু দশকে বাস্তবায়ন উপযোগী কার্যকর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কৌশল তৈরী করতে হবে। এক্ষেত্রে বলা যায়, কোয়াড, জি-৭ জোট এবং ইইউ এর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর থেকে গভীরতর করতে হবে ভারতকে।

পরিশেষে, চীনের সঙ্গে থাকা সীমান্ত গুলোতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পুনর্বিন্যাস করতে হবে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর মধ্যে আক্রমণাত্মক ধারা আরও বৃদ্ধি করতে হবে। সর্বোপরি, কৌশল এবং পরিস্থিতি যাই হোক না কেনো, চীনকে শান্ত করার বদলে তাদেরকে একটি প্রতিপক্ষ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।

লেখক: ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল, কৌশলগত কূটনীতি এবং নিরাপত্তা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ। (প্রকাশিত লেখনী সম্পূর্ণই তাঁর নিজস্ব অভিমত)

সূত্র: ইন্ডিয়ান নিউজ নেট্ওয়ার্ক