গরীবি জ্ঞান নেই এলএসডি সেবনকারীদের

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: ওরা ধনীর সন্তান। প্রাচুর্যের মধ্যে ওদের বেড়ে ওঠা। কেউ দেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, কেউ আবার বিদেশে পড়াশুনা করে। করোনার অনির্দিষ্ট ছুটিতে দেশে এসেছিল আর যাওয়া হয়নি। মাদকদ্রব্য এলএসডি সেবনের দায়ে ধরা পড়েছে পুলিশের হাতে। হাতির ঝিলে পাকড়াও হয়ে হাতকড়া পরাবস্থাতে পুলিশের প্রিজন ভ্যানে হ্যালুসিনেশনের কারণে কেউ কেউ ক্রমাগত হাসছে। কেউ ফোনে বলছে, ‘বাপী তুমি ওদেরকে ফোন করে বলো আমাকে কেন ট্রাকে চড়তে হবে? এই গাড়িতে এসি নাই। উহ্ গরমে মরে গেলাম, ট্রাকে করে কোথায় যেন নিয়ে যাচ্ছে আমাকে।’ এছাড়া কোন আক্ষেপ নেই, বিকার নেই ধনীর দুলালদের।

একদল মাতাল সুদর্শন তরুণ, বেশ-ভূষায় আধুনিক। গ্যাং ধরে চলাফেরা করে, ঘুরে বেড়ায় আর মাদক সেবন করে আজ এখানে, কাল ওখানে; জনসমাগমস্থলে মাতলামী করে সময় কাটায়। করোনাকালে ওরা বেশ বেপরোয়া জীবন-যাপন করে। অঢেল টাকা-পয়সা চাইলেই ওদের একাউন্টে জমা হয়ে যায়। টাকা দেয়া ছাড়া ওদের প্রতি অভিভাবকদের আর কোন দায়িত্ব আছে বলে মনে হয় না। ওদের বাবা-মা, পরিবারের সদস্যরা শাসন করেনা, কিছু বলার সাহসও করে না। আদরের সন্তান ওরা। বর্তমানে এই ধরনের মাদকসেবীদের সংখ্যা কত, তার পরিসংখ্যান নেই কারো কাছে।

পুলিশ ওদেরকে গ্রেপ্তার করেছে এলএসডি নামক ভয়ংকর ও শক্তিশালী মাদক সেবন করা অবস্থায়। এজন্য হাসাহাসি, তাচ্ছিল্য করছে। আর ভাবছে, বাপীকে অলরেডি বলা হয়েছে। একটু পরেই ওরা বাসায় ফিরে যাবে। বিত্তশালী বাবা বিরাট ব্যবসায়ী অথবা কেউকেটা একজন; চিন্তা কিসের? বাবার নাম কী? কি করেন? জিজ্ঞেস করা হলে ঠিকভাবে বলতে পারছে না ওরা। আসলে ওদের এই হাসাহাসির কারণ আদতে সেটা নয়। কারণটা এলএসডি নামক মাদকের মারাত্মক প্রতিক্রিয়া, যা ওদের এই আচরণ দেখে একজন স্বাভাবিক মানুষ সহজে আঁচ করতে পারবেন না।

এলএসডি খুবই শক্তিশালী ড্রাগ। এটা এক ধরনের সাইক্যাডেলিক মাদকদ্রব্য। যা সেবনের ফলে হ্যালুসিনেশন বা ভ্রান্তি বা ভ্রম হয়। এছাড়া সেবনকারী ইল্যুশন বা একধরণের মায়াবী জগতের বর্ণচ্ছটার মধ্যে নিজেকে হারিয়ে পাগলের প্রলাপ বকে ও উল্টোপাল্টা আচরণ শুরু করে। এটা এতটাই শক্তিশালী যে অতি অল্প পরমিাণে ব্যবহার করতে হয়। সেজন্য মাইক্রোগ্রাম হিসেবে এর ডোজ নিতে হয়। হঠাৎ পরিমাণে বেশী নিয়ে ফেললে মৃত্যু ঘটতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হাফিজের মৃত্যু এভাবে ঘটেছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

এলএসডি-র ল্যাবরেটরী নাম ‘লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাইথ্যালামাইড’। এটা অতি পুরাতন ড্রাগ। ১৯৩৮ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে এটা আবিষ্কৃত হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনলাইন ফার্মাসিউটিক্যাল এনসাইক্লোপিডিয়া থেকে জানা যায়- ল্যাসারজিক অ্যাসিড থেকে এলএসডি তৈরী হয়। এই অ্যাসিডের উৎস হলো রাই বা সয়াবিন জাতীয় দানাদার শস্যের মধ্যে জন্মানো একধরনের মাশরুম বা এরোগেটেড ছত্রাক।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর আমাদের দেশ এই ড্রাগের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা হয়। তখন চারটি বিশ্ববিদ্যালয় ও বড় বড় কলেজ পড়–য়া ছাত্রদের মধ্যে এই ড্রাগ ছড়িয়ে পড়ে। তখন এক বলা হতো- ‘লাইফ সেভিং ড্রাগ’ বা এলএসডি। দাম বেশী হওয়ায় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে এর বাজার গড়ে উঠেনি। শুধু তৎকালীণ বার্মা হয়ে থাইল্যান্ডে পাচার হয়ে যেত। প্রখ্যাত লেখক হুমায়ুন আহমেদের আমার ছেলেবেলা গ্রন্থে এর নাম জানা যায়। সেখান থেকে জানা যায়, এলএসডি নিলে মানুষের মাতৃগর্ভে থাকাকালীন সময়ের কথাও মনে পড়ে! তবে তখনকার দিনে মাদকসেবীর সংখ্যা কম হওয়ায় এবং এলএসডি অজানা ইংরেজি শব্দসংক্ষেপ হওয়ায় এটা নিয়ে সমাজে তেমন কৌতুহল জাগেনি। ২০০৭-২০০৮ সালে বাজারে নতুন মাদক তুলনামূলকভাবে সস্তা ইয়াবা বড়ি ঢুকে পড়লে এলএসডির বাজার মার খায়।

তবে দুই বছর আগেও এলএসডি জব্দ করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। ২০১৯ সালের ১৫ জুলাই মহাখালীর ডিওএইচ এলাকা থেকে এলএসডি সহ দু’জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এজন্য রাজধানীর কাফরুল থানায় মামলা হয়েছিল। কালক্রমে এই ‘আউটডেটেড’ ড্রাগের অতি আধুনিক রূপ দেয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় খাটুনী বেশী, সময়ও বেশী লাগে। তাই দামও বেশী। বর্তমানে পাউডার, ক্যাপসুল, তরল, কিউব সব ফর্মেই এলএসডি পাওয়া যায়। সম্প্রতি বার্মিজ বরই আচার বা চাটনীর পুরিয়ার মত রঙ্গীন কার্টুন আঁকা কাগজে মোড়ানো এলএসডির প্যাকেট উদ্ধার করা হয়েছে।

এই হ্যালুসিনোজেনিক ড্রাগ সেবনকারীর চিন্তা ও অনুভূতিতে মারাত্মক কুপ্রভাব বয়ে আনে। এটা মনের ওপর দারুণ ভীতিকর প্রভাব ফেলে। আবার কখনও মহা শক্তিশালী এ্যাডভেঞ্চার সৃষ্টি করে। সেবনকারী একাই একটি ট্রেনকে ধাক্কা মেরে থামাতে উদ্যত হতে পারে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিহত ছাত্র হাফিজের প্রতিক্রিয়া থেকে জানা গেছে সে হাফপ্যান্ট পরে রাস্তায় নেমে ডাব বিক্রেতার দা নিজ হাতে নিয়ে নিজের গলায় আঘাত করে মারাত্মক আহত হয়। এর প্রভাব এত ভয়ংকর যে, এলএসডিকে বলা হয়- ‘লাস্ট স্টেট্ অব ড্রাগ’।

এলএসডি এখনও বিত্তশালীদের মধ্যে প্রচলিত মাদক। এর প্রধান কারণ এর দাম বেশী। তাই উন্নত দেশে এর প্রচলন বেশী। সম্প্রতি নেদারল্যান্ডস্ থেকে এর চালান আমাদের দেশে এসেছে বলে জানা গেছে। আমাদের দেশে উঠতি ধনীদের কাঁচা পয়সাকে টার্গেট করে এর ব্যবসা জমে উঠেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। করোনাকালীণ ঘরবন্দী তরুণদেরকে মক্কেল বানানোর জন্য মরিয়া হয়েছে এই মাফিয়ারা। সার্বক্ষণিক অনলাইনে যুক্ত থাকা কিশোর-তরুণ শিক্ষার্থীরা ওদের সহজ শিকারে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক কুরিয়ারের মাধ্যমে এলএসডির বেচাকেনা খুবই সহজসাধ্য হয়ে পড়েছে।

কানাডায় পড়তে যাওয়া এক শিক্ষার্থী জানিয়েছে সে সেখানে আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী চক্রের সাথে পরিচিত হয়ে এলএসডি সেবন করে ও ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়ে। উত্তর আমেরিকার জনপ্রিয় অনলাইন আর্থিক প্রতিষ্ঠান পে-প্যালের মাধ্যমে ব্যবসায়িক অর্থের লেনদেন করতো। ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এলএসডির অর্ডার নিত ও বিক্রি করতো। এভাবে নিরাপত্তাবাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে এই ভয়ংকর মাদক পৌঁছে যাচ্ছে ক্রেতাদের দোরগোড়ায়।

বিত্তশালী ঘরের সন্তান এই মাদকসেবীদেরকে কঠিন নজরদারীর মধ্যে এনে তাদের পরিবার ও অর্থদাতাকে চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। মাদক ব্যবসায়ী ও অবৈধ টাকার মালিকদের কালো অর্থকে নতুন বাজেটে সাদা করার সুযোগ দান আমাদের দেশে সকল সামাজিক অন্যায় ও অবিচারকে আরো উস্কে দিচ্ছে। তাই একদিকে দুর্নীতি ও মাদক ব্যবসাকে থামাতে হবে অন্যদিকে কালো-সাদা, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য নিরুপণ করে ঘৃণা ও পঙ্কিলতামুক্ত নীতির মাধ্যমে আর্থ-সামজিক সুশাসন নিশ্চিত করার জোর তাগিদ সৃষ্টি করতে হবে। পাশপাশি সকল মাদকাসক্তকে সংশোধনের জন্য যথাযথ চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করাটাও বেশ জরুরী।

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।E-mail: fakrul@ru.ac.bd

জেড,আই/ঢাকানিউজ২৪ডটকম।