সন্তানের প্রতি মা বাবার দায়িত্ব

সন্তানের প্রতি মা বাবার দায়িত্ব
সন্তানের প্রতি মা বাবার দায়িত্ব

অমিতা বর্দ্ধন 

যেসব পরিবারে সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা নেই আছে শুধু কেবল ধর্মীয় গোড়ামী ও স্বল্পশিক্ষার ঝলকানি ঐ সমস্ত পরিবারের সন্তানরাই পরবর্তীতে জঙ্গী সংগঠনে যোগদান করে। পরিবারের অভিভাবকরা সন্তানদের কেবল স্নেহের চাদরে আবৃত করে রাখলে চলবে না। এক্ষত্রে মায়ের ভূমিকা অনেকাংশে জোড়ালো ভূমিকা রাখে। বাবা, দিনের অনেকখানি সময় অফিসে বা বাহিরে কাজে থাকেন। মা সন্তানদের সব চেয়ে বড় কারিগর। সকালে পড়াশুনা, ব্যায়াম বিকালে খেলাধুলা ও সন্ধ্যায় প্রার্থনায় মনোনিবেশ করা ইত্যাদি মাকেই দায়িত্ব নিতে হয়। ছুটির দিনে পারিবারিক পরিবেশে ভাল উপদেশ ও নৈতিক চরিত্র গঠন সম্পর্কে আলোচনা করা। মাঝে মাঝে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আলোচনা সভাতে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি সন্তানদের মনে উন্নত ভাবনার চিন্তা দেবে।

স্কুলে পিতা-মাতাকে সন্তানদের ব্যাপারে হুঁশিয়ার করতে হবে। স্কুলে কাদের সাথে ওরা মিশে, চলাফেরা করে ও সময় কাটায়। সন্তান বড় হলে বন্ধুর মতো আচরণ করতে হবে যাতে ওরা নির্দ্ধিধায় নির্ভয়ে সব কিছু বাবা মায়ের সাথে শেয়ার করতে পারে। অধিক আদর স্নেহ সন্তানদের বেপরোয়া করে তোলে। বিবেকের চেয়ে আবেগের মাত্রা বেড়ে তখনি তাদের আদরের সন্তান পিতা মাতার কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ননীর পুতুল নয়, নৈতিক চরিত্রের মানুষ যেন হয় প্রতিটি সন্তান এই ভাবনায় ভাবিত হয়ে পদক্ষেপ নেয়া প্রতিটি বাবা-মার কর্তব্য। সন্তানকে সু-নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রথম থেকে আদব কায়দা ও শিষ্ঠাচার সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া উচিত। রাস্তা বা বিভিন্ন স্থানে লক্ষ করলে দেখা যায় বড়দের আদাব সালাম ও নমস্কার এর পরিবর্তে নির্বিঘ্নে সিগারেট এর ধোঁয়া ছেড়ে দিচ্ছে।

পরিবার হলো প্রাথমিক বিদ্যালয়। কিন্তু বর্তমান ডিজিটাল যুগে মা-বাবা আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য বাইরে কাজের তাগিদে মহাব্যস্ত। দিনে দীর্ঘ সময় মা-বাবার অনুপস্থিতে সন্তানদের কোমল মনে হিংস্রতার জন্ম হয়। সমস্যায় দু’জনই পরিশ্রান্ত, যার যার মতো করে আছেন হয়তো বা ফেইসবুক নিয়ে। কোন মা ক্লাব ও সমিতি নিয়ে ব্যস্ত। এদিকে বাচ্চারা তাদের মতো করে আছে, অনেক মহিলাকে বলতে শুনেছি তাদের বাচ্চা কোন দুষ্টুমী করে না, মোবাইল নিয়ে থাকে-কথাটি বেশ তৃপ্তির ঢেকুর তোলেই বলছেন। কিন্তু বাচ্চারা কৌতুহল প্রিয়। ওরা ভালো মন্দ না বুঝে খারাপ দিকেই ধাবিত হচ্ছে। অভিভাবকদের এই উদাসীনতা পারিবারিক সুশিক্ষার অভাব ইত্যাদি কারণে কিশোরেরা বিপথগামী হচ্ছে। তাইতো গানে রয়েছে-“এমন মানব জীবন রইল পতিত আবাদ করতে ফলতো সোনা।“

আজ কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে দেখলাম ২ টি স্কুল ছাত্র বয়স কত আর হবে ১০/১১ বছরের। রাস্তার পাশে একটি চা দোকানে ঢুকে বসে হরদম সিগারেট টানছে। আমি দৃশ্যটা দেখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় ছিলাম। তারপর আরো ২টি ছেলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে, ক্লাসমেট হবে-বলছে, এই এত নেশা করা ভালো না, খুব ঘন ঘন হচ্ছে দাঁড়া আমি তোর মাকে গিয়ে বলে দেব ইত্যাদি। মনে মনে ভাবছি হায়রে। মাতা-পিতা স্কুলে পাঠিয়েছে, আর ওরা কি অসাধারণভাবে সে বিশ্বাসের মূল্য দিচ্ছে। আজ বিবেকবান অভিভাবক খুব কম সংখ্যকই নজরে আসে। মাতা-পিতা আজ অর্থের কাঙাল কিন্তু ভাবেনা সন্তান সম্পদে তৈরী করা প্রয়োজন।

আজ কিছু সংখ্যক অভিভাবক দিনরাত টাকার পেছনে ছুটছে বদ্ধ পাগলের ন্যায়। যেন ওদের পিপাসা অদম্য ও বেপরোয়া। বাচ্চারা মানুষ হচ্ছে কাজের বুয়ার কাছে। সুতরাং ছেলে-মেয়েরা (বাচ্চারা) কি পারিবারিক শিক্ষা পাবে? অর্থপিপাসু অভিভাবকদের স্বস্থি নেই। ওরা বুঝেই উঠতে পারছে না ডাল-ভর্তা খেয়েও সুস্থ সুন্দরভাবে জীবন ধারন করা যায়। সন্তানদের বলিষ্টভাবে মানুষ করা যায়। আবার অনেক অভিভাবক আছেন জিপিএ-৫ পাওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা তদবির করেন। সেটা পেতেই হবে। কিন্তু সন্তান মানবিক ও নৈতিক চরিত্রে বলিয়ান হয়ে উঠছে কিনা সেটা তলিয়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করেন না। এই হলো আমাদের মনের দৈন্যতার পরিচয়। এতে করে যেমন সামাজিক অবক্ষয় ঘটছে তেমনি অন্যদিকে সমাজ ব্যবস্থার পরিচয়ও বহন করছে।

সমাজের বাস্তব চিত্র দেখা যায় নিম্ন, মধ্য ও উচ্চ বিত্তের পরিবারের সন্তানরাই সব অপরাধ জগতের সাথে কোন না কোনভাবে জড়িয়ে আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন-শিশুকাল থেকেই সন্তানরা মা-বাবার আদর সোহাগ না পাওয়ায় নিজের খেয়াল খুশী মত ভালো মন্দের মাধ্যমে বড় হতে থাকে। ফলে সেই উঠতি বয়সে ভাল বা মন্দের পার্থক্যবোধ শক্তি বুঝে উঠতে পারে না। যা করে তাই তাদের ভালো লাগে। মন্দ কাজই তাদের আকৃষ্ট করে বেশি। পারিবারিক অতি আদরে অহেতুক অর্থ প্রদান সন্তানদের বিপথগামী করে তুলেছে। অনেক পরিবারে পিতা-মাতার ঝগড়া মনোমালিন্য সন্তানদের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

আজকাল এই একবিংশ শতাব্দীতে প্রায় পরিবারেই আছে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভুল বুঝাবুঝির দ্বন্দ্ব, সেটা টাকা-পয়সা বা সে যেকোন কারণেই হোক। যা একটা পরিবারে স্বাভাবিক সুখ আনন্দ সব সন্তানদেরই কাম্য। সেটায় ব্যাঘাত ঘটলে অশান্তির কারখানায় পরিণত হয় পরিবার। সন্তান ক্রমান্বয়ে হিংস্র ও মাদকে আসক্ত হয়। ওরা শান্তির জন্য নানা অপকর্ম ও বিপথে ধাবিত হয়।

সভ্য,সুন্দর সমাজ ও দেশ বিনির্মানে পারিবারিক শিক্ষার বিকল্প নেই। সে ক্ষেত্রে মায়ের ভূমকাই প্রধান সোপান। আর তাই নেপোলিয়ান বলেছেন-তোমরা আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি উন্নত জাতি উপহার দেব। তাই সকল মায়েদের প্রতি আহবান অর্থ সম্পদের পানে না ছুটে সন্তান-সম্পদের দিকে তাকান। সন্তানকে সম্পদে পরিণত করুণ।

লেখক : অমিতা বর্দ্ধন
উপদেষ্টা, ড. মঞ্জুশ্রী একাডেমি, সিলেট।