আমাদের পরিবার হোক শান্তির আবাসস্থল

আমাদের পরিবার হোক শান্তির আবাসস্থল
আমাদের পরিবার হোক শান্তির আবাসস্থল

শাহাদাত আনসারী

আজ ১৫মে বিশ্ব পরিবার দিবস। একটা সুন্দর পরিবেশ গড়ে তুলতে হলে পরিবার নিয়ে চিন্তার কোন বিকল্প নাই। পরিবার নামক একটি পরিবেশে মানুষ বড় হয়ে উঠে বলে তারা হয়েছে উন্নত এবং অন্যান্য প্রাণী থেকে ভিন্ন।

মানুষ পৃথিবীতে বসবাস করে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্নভাবে। কেউ নিজ বাড়িতে, কেউ ভাড়া বাসায় আবার কখনও পড়ালেখার জন্য ছাত্রাবাসে বা হোস্টেলে, কেউ কাজের জন্য কুঁড়ে ঘরে আবার কেউবা অস্থায়ীভাবে ছাউনি তুলে কর্মস্থলেই। কিন্তু পারিবারিকভাবে বসবাস করার মতো আনন্দ ও সুবিধা কোথাও পাওয়া যায় না। অর্থনৈতিক অবস্থা খুব ভালো না হলেও সকল শান্তির গোলা যেন পরিবারের মধ্যেই লুকায়িত থাকে।

পৃথিবীতে বিভিন্ন ধরনের প্রাণীর জন্ম হয়েছে। সব কিছু সৃষ্টি কিন্তু মানুষের প্রয়োজনে। মানুষ ছাড়া অন্য কোন প্রাণীর জীবনে চলাচলের স্বাধীনতা নাই। মানুষ পৃথিবীতে ভালভাবে বাচার জন্য নতুন নতুন পদ্ধতি তৈরি করছে, আবিষ্কার করছে নতুন বস্তু। পৃথিবীতে তাদের বংশধরকে টিকিয়ে রাখার জন্য তারা নিজেদের পছন্দের মানুষের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। স্বামী-স্ত্রী মিলে গড়ে তুলে নতুন সংসার। স্বপ্ন দেখে নতুন করে পরিবার গড়ার।

একটি পরিবারের সূত্রপাত ঘটে বাবা-মাকে দিয়ে। কোন পরিবারে শুধু বাবা-মা, কোন পরিবারে বাবা-মায়ের সাথে ছেলে-মেয়ে আবার কোন কোন পরিবারে দাদা-দাদী কিংবা নানা-নানীরও অবস্থান ঘটে । একটি পরিবারে শৃংখলাবদ্ধ জীবনযাপন করতে ছোট বড় সকলের সমান ভূমিকা রয়েছে। একটি পরিবারে পিতা-মাতার অবস্থান যেমন তাদের অর্থ যোগানে সহায়তা করে তেমনি অন্যদিকে একটি ছোট্ট শিশুও পরিবারকে আনন্দে মাতিয়ে রাখতে সহায়তা করে। অর্থাৎ, পরিবারের প্রতিটি সদস্য নিজ নিজ অবস্থান থেকে তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে সেখানে আনন্দময় পরিবেশ বিরাজ করবে। প্রবাহিত হবে শান্তির সমীরণ।

একটি পরিবারে বাবা-মা উভয়ের গুরুত্ব রয়েছে। আমরা অনেকে মনে করি মায়ের কাজ কেবল রান্না করা , সন্তান জন্ম দেয়া।  সন্তান লালন-পালন করা এবং কচি শিশুকে প্রাথমিক আচরণ কিংবা শারীরিক বিকাশে প্রত্যেক মায়ের ভূমিকা নিশ্চয় বাবার চেয়ে বেশি। ‘মা’ শব্দটির সাথে কেমন যেন একটা মায়া-মমতা, একটু বেশি যত্ন এবং মধু জড়িয়ে আছে। কারণ পরিবারের কারও সাথে বেয়াদবি করলে কিংবা কোন ভুল করলে অন্য কেউ বকা দিলেও কেবল মা আদর করে সন্তানকে ভুল কাজ না করতে উৎসাহ দিয়ে থাকেন। আবার কখনও মা সন্তানের ভুলের জন্য বকা দিলে কিংবা শাসন করার জন্য হাল্কা পিটুনি দিলেও ঘুমানোর সময় গায়ে হাত দিয়ে আদর করেন।

একটি পরিবারে মায়ের ভূমিকা কতটুকু তা মনীষীদের উক্তির দ্বারাই ভালভাবে প্রমাণিত হয়। যেমন- হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর কাছে এক ব্যক্তি পিতা-মাতার সেবা সম্বন্ধে জানতে চাইলে তিনি বলেন প্রথমে তুমি তোমার মায়ের সেবা করবে এমন বক্তব্য তিনবার বলার পরে বাবার সেবা করতে বলেছেন। আবার নেপোলিয়ান বলেছেন, ‘আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও আমি একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেবো।’

এছাড়াও বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে মায়ের মর্যাদাকে পরিবারের সবার উর্ধ্বে স্থান দেয়া হয়েছে। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। আর মানুষের কাজ হবে সবপ্রাণীর চেয়ে ভালো। কিন্তু মানুষ এমন কাজ করে যা সমাজে তাদের মর্যাদাকে পশুর চেয়েও নিচে নিয়ে যায়। আর এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য একটি পরিবারে মা সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করেন।

মায়ের গুরুত্ব বেশি হলেও একটি পরিবারে বাবার গুরুত্বও কোন অংশে কম নয়। বাবা শব্দটি উচ্চারিত হলেই সন্তানের আবদার পূরণ বা সন্তানকে কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো এমন বিষয় চলে আসে। চট-জলদি সমাধানে বাবার সাথে পরিবারের অন্য কারও তুলনা করা যায় না। পিতার সাথে সন্তানের সম্পর্ক গড়ে উঠে ভয় আর আদরের মাধ্যমে। কোন অপরাধ করলে শাস্তি দেয়া আবার কিছুক্ষণ পরেই গায়ে হাত রেখে আদর করার মাধ্যমেই পরিবারে সন্তান ও পিতার মধ্যে একটি শক্তিশালী বন্ধন গড়ে উঠে।

পরিবারে সুন্দর পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে শিশুকেও ছোট করে দেখার কিছু নেই। শিশু শব্দটি শুনলে মনের অজান্তেই হৃদয়ে একটু মায়া অনুভূত হয়। শিশু জন্মের সময় কোন পাপ-পূণ্য নিয়ে পৃথিবীতে আগমন করে না। সে জন্মের সময় নিষ্পাপ হয়ে পৃথিবীর বুকে স্থান করে নেয়। সন্তান পেটে থাকা অবস্থায় প্রত্যেক মায়ের কী পরিমাণ কষ্ট করতে হয় তা কেবল সন্তান পেটে রাখা মা’ই জানেন। আবার সন্তান প্রসব করার সময় মা ভীষণ বেদনা অনুভব করেন। কিন্তু এতো বেদনার পরও যখন সন্তানের মুখ দেখেন তখন সব ব্যথা-বেদনা ভুলে গিয়ে বুকে নিয়ে আদর করেন। শিশুরা জন্মের পর পৃথিবীতে চোখ মেলে দেখে, কান পেতে শুনতে শিখে এবং প্রথমে মা নামক ছোট্ট শব্দ থেকে বড় এবং কঠিন শব্দও সহজেই শিখে যায়। ছোটকালে শিশুরা হরেক রকম মজার মজার ছড়া বলে, কচি মুখে আব্বা-আম্মা ডাক দিয়ে পরিবারকে মাতিয়ে রাখে। আর এতে করে পরিবারে প্রবাহিত হয় সুখের বন্যা।

মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। সমাজের একক বা ভিত্তি হলো পরিবার। একটি বড় বিল্ডিং গড়ে তুলতে ইট যেমন একক হিসেবে কাজ করে তেমনি সমাজ গড়ে তুলতে পরিবার একইভাবে কাজ করে। আবার বিল্ডিং শক্ত হবে না দুর্বল হবে তা যেমন ইটের উপর নির্ভর করে ঠিক তেমনি সমাজ খারাপ হবে না ভালো হবে তা নির্ভর করে পরিবারের উপর। সুন্দর এ পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য পারিবারিক পদ্ধতি বেশ গুরুত্বের দাবি রাখে। পারিবারিক অবস্থার উপর ভিত্তি করেই সমাজিক পরিবেশ গড়ে উঠে। সমাজের উপর প্রভাব বিস্তার করে পারিবারিক কাঠামো। পরিবারের শান্তি সমাজে শান্তি এবং পরিবারের দুঃখ সমাজে দুঃখ বয়ে আনে। পরিবারে অভিভাবকদের দেয়া উপদেশ শিশুকে নীতিবোধে জাগ্রত করে এবং মূল্যবোধের অবক্ষয় থেকে রক্ষা করে।

বর্তমানে প্রযুক্তির উন্নতির ফলে পারিবারিক ব্যবস্থা আগের চেয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে। মোবাইল, টিভি, কম্পিউটার আর ইন্টারনেটের মতো প্রযুক্তি কম ছিলো বলে তারা কাজের পর অবসর সময়টা পরিবারের মধ্যেই হেসে খেলে কাটাতেন। অবসর সময় এখন ফেসবুক, ইন্টারেনট আর টিভির সামনে কাটাচ্ছেন। অনেকে আবার নিজের ব্যক্তিগত কাজ ফেলে রেখেও বিনোদেনের জন্য ফেসবুকে ঘন্টার পর ঘন্টা পার করে । কেউবা প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখছেন। পরিবারের বন্ধন ভেঙ্গে বিশ্বজয়ে কোন কল্যাণ নেই।

আজ পত্রিকার পাতা উল্টালে কিংবা টেলিভিশন চালু করলে কোন সদস্য তার নিজ পরিবারের কারও দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশেও পারিবারিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। অনেক সময় নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে গিয়ে হত্যাকান্ডের ঘটনাও ঘটে । যৌতুকের কারণে গৃহবধুকে শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর-ননদ দ্বারা নির্যাতন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন কোন দিন থাকে না যেখানে কোন স্ত্রী তার পরিবারের সদস্য দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয় না। সমাজে মানুষ বিবাহ বন্ধনের মাধ্যমে পারিবারিকভাবে বসবাস করে বলে তারা অন্যান্য প্রাণী থেকে ভিন্ন। পরিবারে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালবাসা, সহমর্মিতা আর আগের মতো নেই। শিশুর প্রতি বাবা-মায়ের ভালবাসা কমে যাচ্ছে দিন দিন। 

বিবাহের পর নববধু শ্বশুর বাড়ি থেকে নিজ বাড়িতে ফিরে যায় মেয়ের বাপের বাড়ির অনেকেই স্বামীর আচরণ সম্বন্ধে জানতে চায়। নতুন বাড়ির পরিবেশ কেমন তাও জানতে চায়। শ্বশুর বাড়ির পরিবার যদি ভদ্র হয় তাহলে মেয়ে যেমন মন্তব্য করে খারাপ হলে ঠিক উল্টা মন্তব্য করে। ভদ্র পরিবার হলে নতুন বউ তার মাকে অনেক সময় বলে- ‘আম্মু আমি যেন স্বর্গে বসবাস করছি।’ ঠিক খারাপ হলে নরকে বসবাসের কথা বলে থাকে। পবিারকে স্বর্গ কিংবা নরকের সাথে তুলনা করা যায় না। তবে পৃথিবীতে কোন সুখের স্থান থাকলে কেবল তা পরিবারেই বিরাজ করা সম্ভব।

অতএব বাংলাদেশকে পরিবর্তন করতে হলে পরিবার নিয়ে ভাবতে হবে। ‘পৃথিবীকে গড়তে হলে সবার আগে নিজেকে গড়ো।’ এ শ্লোগান যেন সুন্দর পৃথিবী গড়ার যুদ্ধে আহবান করে যাচ্ছে। তাই সুন্দর একটা পৃথিবী গড়তে হলে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা ও শ্রম দিয়ে ভালো করার দৃঢ় মনোভাব থাকতে হবে। পরিবারের কচি শিশুদের আদর-সোহাগ দিয়ে ভালো ও সুন্দর কথাগুলো শিখাতে হবে। এতে শিশুটি যেমন আদর্শ নাগরিক হিসেবে তৈরি হবে ঠিক আমাদের দেশও পৃথিবীর মানচিত্রে একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হবে। তাই আজকের এই দিনে আমাদের সকলের স্বপ্ন হোক সুখী পরিবার গঠনের মাধ্যমে সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার।

লেখক:  ব্যাংক কর্মকর্তা ও কলাম লেখক