আনুষ্ঠানিকতার সঙ্গে চাই মানবিকতা

আনুষ্ঠানিকতার সঙ্গে চাই মানবিকতা
আনুষ্ঠানিকতার সঙ্গে চাই মানবিকতা

হাসান আজিজুল হক

এবারও করোনাকালেই এলো ঈদ। গতবার ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় বিশ্বের অনেক দেশের মতো আমাদের দেশেও করোনার সংক্রমণ ছিল ঊর্ধ্বমুখী। এবার আমরা মোটামুটি নিয়ন্ত্রণমূলক পরিস্থিতি থেকে ফের বিস্ম্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতিতে পড়লাম। বাঙালি মুসলমানের ঈদ উৎসব এবারও আনন্দ-খুশির ডালা সাজিয়ে নয়, এসেছে আশঙ্কা-অনিশ্চয়তার বার্তা নিয়ে। যদি প্রশ্ন রাখি, এমন দুর্যোগ-দুর্বিপাকে কি ঈদ আসেনি? বাঙালি প্রকৃতির বৈরী আচরণের মধ্যে আরও ঈদ কাটিয়েছে, লড়াই করে টিকে থেকে যেমন করেই হোক উদযাপন করেছে উৎসব। কিন্তু গতবার ও এবারই শুধু তা নয়; বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই যে লড়াইটা চলছে, এর চরিত্রগত পার্থক্য অনেক। কঠিন ও সংকটের বৃত্তবন্দি। এমনিতেই চলছে ঘোর অমানিশা। এর মধ্যে বাড়তি দুঃসংবাদ হলো সাংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে করোনার নতুন ধরন যে মর্মন্তুদ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, এর সন্ধান বাংলাদেশে মিলেছে। এই দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনার খবরটি জানা গেল ঈদের একেবারে নিকটবর্তী সময়ে।

দীর্ঘ এক মাস সংযম সাধনার পর বছর ঘুরে ঈদুল ফিতর আবার এলো ভিন্ন আবহে। এবার প্রকৃতি সদয় থাকলেও গতবার করোনা দুর্যোগের মাঝেই ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে উপকূলীয় জনপদে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল। এই ক্ষতচিহ্ন ও করোনার থাবা, দুই দুর্যোগের মাঝে উদযাপিত হয়েছিল ঈদুল ফিতর। জনস্বাস্থ্যবিদরা এবার আরও সতর্ক করে দিয়েছেন, ঈদের পর করোনা সংক্রমণ বাড়তে পারে। কেন এই সতর্কবার্তা তা সচেতন মানুষ মাত্রই জানা। মানুষ করোনা সংক্রমণের ব্যাপারে এখন জানে অনেক কিছুই, কিন্তু অনেকেই মানেন না সংক্রমণ প্রতিরোধমূলক উপায়গুলো। পত্রিকার পাতায়, টেলিভিশনের পর্দায় দেখা গেছে, মানুষ সতর্কবার্তা, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কীভাবে গাদাগাদি করে ফেরিঘাটে, রাস্তায় ছুটেছে ঘরের দিকে। ঈদে বাড়িযাত্রা- এই বিষয়টি অতীতে সংবাদমাধ্যমে যাতায়াত ঝুঁকির মাঝেও এক ধরনের আনন্দবার্তা নিয়ে চিত্রিত হতো। কিন্তু গতবার ও এবারের পরিস্থিতি তো সেরকম নয়। গতবার ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় আমাদের দেশে সংক্রমণের মাত্রা ছিল সর্বোচ্চ। খোলা ময়দানে বা ঈদগাহে ঈদের জামাত হয়নি; হয়েছিল মসজিদে মসজিদে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে। এবার তা-ই হবে।

বেঁচে থাকলে, দুর্যোগের মেঘ কেটে গেলে সাড়ম্বরে ঈদ উৎসব উদযাপনের অনেক সুযোগ সামনে আসবে। কিন্তু এই ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে কেন মানুষ নিজেকে সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে অপরিণামদর্শিতার সাক্ষ্য রাখছে! নাড়ির টানে অন্যান্যবারের মতো বাড়ি ফেরা আর এবারের এই ফেরার মধ্যে পার্থক্য আছে। করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো- ভিড় বা জনসমাগম এড়িয়ে চলা, মাস্ক পরিধানসহ সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে চলা। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলেও অনেকাংশেই সত্য, এসব কিছুরই ব্যত্যয় ঘটে চলেছে জনপরিসরে। ব্যক্তি সুরক্ষিত না থাকলে সমাজ সুরক্ষিত থাকবে কী করে? করোনা সংক্রমণ থেকে ব্যক্তির সুরক্ষার দায় বৃহদাংশই নিজের। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- কত সংখ্যক মানুষ এই দায় বোধ করছে? মানুষ যদি বেঁচে না থাকে তাহলে আনন্দ, জীবিকা কিংবা জীবনের অন্যান্য অনুষঙ্গের মূল্য কী? জীবন আগে না জীবিকা আগে- এমন প্রশ্নও উঠেছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। কেন এমন তর্ক-বিতর্কের পরিধি বিস্তৃত করা, তাও বুঝি না। আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে নানা ক্ষেত্রে। করোনার দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব তা আরও পুষ্ট করেছে। আমাদের জন্য তা সুবার্তা নয়।

গতবার ঈদের আগে-পরে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারিভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিপর্যায়ে যেভাবে দুর্যোগের কারণে কর্মহীন, গরিব, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সহায়তার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছিল, এবার তেমনটি দৃশ্যমান নয়। সরকারি পর্যায়ে গরিব, অসহায়, বিপন্ন মানুষের প্রতি সহায়তার নানা কর্মসূচি চললেও বিপন্ন মানুষের সংখ্যা গত এক বছরে অনেক বেড়েছে এবং ভবিষ্যতে যে তা আরও বাড়বে, তাতে সন্দেহ নেই। আমরা যতই গর্ব করে বলি না কেন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে মানুষ মানুষের পাশে দুর্যোগ-দুর্বিপাকে দাঁড়ায়, কিন্তু তা ততটা গর্ব করে বলার নয়। সাম্প্রদায়িকতার ধোঁয়া কি এখনও সমাজ-ব্যক্তি-গোষ্ঠীকে আচ্ছন্ন করছে না? নিকট অতীতে এ রকম বৈরী ঘটনা ঘটেছে। বৈষম্য কি কমানো গেছে? বরং বলা ভালো, বৈষম্যের দাগ ক্রমেই মোটা হচ্ছে। একশ্রেণির মানুষ ক্রমেই নিঃস্বের তালিকায় নাম লেখাচ্ছে, অন্যদিকে ধনবান ব্যক্তি আরও ধনবান হচ্ছেন। সংবাদমাধ্যমেই দেখেছি, করোনা দুর্যোগে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে। এও দেখেছি, করোনা দুর্যোগ পুঁজি করে রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আরও ফুলেফেঁপে উঠছে। কী বিস্ময়কর বার্তা!
মানুষই তো মানবিক হবে। মানুষই তো সব ভেদাভেদ দূর করে মানবিক সমাজ গড়বে।

মানবিকতা, সহমর্মিতা, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ়করণের যেসব পথ সব ধর্মই দেখিয়ে দিয়েছে, তা কি সবক্ষেত্রে অনুসৃত হচ্ছে? যদি এই প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ সূচক হতো, তা হলে ঈদ উৎসবের সর্বজনীনতার আলোয় সমাজ আরও অন্যরকমভাবে আলোকিত হতো। আমরা চাই- জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সব উৎসবে শরিক হোক সমাজের সব মানুষ। করোনাকালে ঈদ উৎসবে আমাদের সব আয়োজনই হোক নিরাপদ ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করে। সবকিছুই সরকার করে দেবে, সব নেতিবাচকতার দায়ই সরকারের ওপর বর্তাবে, তা কেন? বিশ্বাস করি, মানুষ তার উদ্ভাবনী শক্তি দিয়েই একদিন করোনার জীবাণুকণা নির্মূলে সক্ষম হবে। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা নিশ্চয়ই সেই পথ তৈরি করবে। কিন্তু যতক্ষণ তা না হয়, ততক্ষণ আমরা যেন প্রতিরোধের সব ব্যবস্থা মেনে চলি। প্রায় গোটা বিশ্বে গত এক বছরেরও বেশি সময়ে বিষাদের যে ছায়া বিস্তৃত হয়েছে, এর ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ নিষ্প্রয়োজন।

মানবজাতি চলছে ভয়াবহ ক্ষয়ের মধ্য দিয়ে। জীবনের ক্ষয়, জীবিকার ক্ষয় আর এ থেকে সৃষ্ট আরও কত ক্ষয়। ক্রান্তিকালে কত বেদনাবিধুর পরিস্থিতিরই সৃষ্টি হয় ক্ষণে ক্ষণে। হচ্ছে তো তা-ই। আজ যার সঙ্গে কথা হচ্ছে কাল তাকে পাব কিনা সেই শঙ্কা এখন সর্বক্ষণ তাড়া করে। মৃত্যু অনিবার্য, এটা চিরন্তন সত্য বটে। কিন্তু অস্বাভাবিক মৃত্যু তো মেনে নেওয়া কঠিন। তাই একটা কথাই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আমলে রাখতে হবে। ঈদ উৎসব উদযাপনে আতিশয্যে নয়; বরং বিদ্যমান পরিস্থিতি সামনে রেখে সহমর্মিতা, মানবিকতা, ভালোবাসা, সম্প্রীতির বন্ধনে মানবিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় করব। এই হোক প্রত্যয়। ঈদ আবার আসবে। ততদিনে নিশ্চয়ই করোনামুক্ত মানবতা আবার ফিরে আসবে স্বাভাবিকভাবে। আমরা যেন ভুলে না যাই মানবতার ইতিহাসে বিপর্যয় নতুন নয়। শুধু প্রকৃতিকে দোষ দেব কেন, মানুষ কি মানুষকে নিধন করছে না হীনস্বার্থের বশবর্তী হয়ে? করোনা দুর্যোগ-উত্তর বিশ্ব কতটা মানবিক হয়, তাও দেখার অপেক্ষা।

ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার- এই বাক্য বাংলাদেশে বহুল উচ্চারিত। আমরা যেন নব প্রত্যয়ে এর মর্মার্থ ধারণ করে মানবিক সমাজ গঠনে নিরন্তর প্রয়াস চালাই। এই রক্তস্নাত বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মূলের প্রত্যয়গুলোর বিবর্ণতা বড় বেশি বেদনাহত করে। সেই প্রত্যয়গুলোর সমাজের সর্বস্তরে ব্যাপকভাবে পুনর্জাগরণ ও যথাযথ বাস্তবায়ন চাই! বিপুল ত্যাগ আর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত সেই বাংলাদেশ চাই- যেখানে থাকবে না ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা, বৈষম্য, নিপীড়ন, শোষণের ছায়া। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে চেতনার আলোয় বাংলাদেশের জন্ম, চাই সেই আলোর ব্যাপ্তিময়তা। তাও তো মানুষকেই করতে হবে। মানুষ মানুষের পরম মিত্র হোক। এও কথা আছে, আজকের ভয়াবহ করোনা পরিস্থিতি মানুষই সৃষ্টি করেছে। আমাদের যে সামাজিক ঐক্য ও উৎসবের গৌরব হারানোর মুখোমুখি, এই গৌরব পুনরুদ্ধার করতে হলে গোটা মানবসভ্যতার পুনর্জাগরণ জরুরি, খুব জরুরি।

যে কোনো উৎসবের অন্যতম দিক হচ্ছে সৌহার্দ্য-সম্প্রতি-মৈত্রীর সেতুবন্ধ আরও পোক্ত করা। উৎসব আমাদের সেই পথই তৈরি করে দেয়। উৎসব মানেই তো মানুষে মানুষে মিলনমেলা। এই দুর্যোগকালে কামনা করি, মানুষের হৃদয়ে মানুষের ছায়াই যেন বিরাজমান থাকে, উৎসব যেন প্রকৃতই মানবিক আবেগের আনন্দঘন যে সর্বজনীন আবেদন, তা আরও ছড়িয়ে দেয় সর্বত্র। শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, সব ক্ষেত্রেই মানবিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার ব্যাপক বিস্তার ঘটুক। আলো আসুক আঁধার কেটে। সত্য, সুন্দর শুভবোধের আপন চেতনা হোক প্রসারিত। জয় হোক মানুষের। দূর হোক অন্ধকার। নির্মূল হোক সব নেতিবাচকতা। উৎসব রূপ পাক সর্বজনীনতার।

   শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক