নারী ভোটাররা মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় ব্যাকফুটে বিজেপি!

নারী ভোটাররা মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় ব্যাকফুটে বিজেপি!
নারী ভোটাররা মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় ব্যাকফুটে বিজেপি!

রক্তিম দাশ

একুশের বিধানসভার ভোটে বিজেপি এই বেদনাদায়ক হারের কাঁটা হল পশ্চিমবঙ্গের নারীদের ভোট! নারী ভোটাররা বিভিন্ন প্রশ্নে গেরুয়া শিবিরের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বিজেপির নবান্ন দখলের স্বপ্নকে ধুলিসাৎ করে দিল। অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূলকে শতাংশের হারে বাংলার ৫০ ভাগ নারী বেছে নিয়ে তৃতীয়বারে জন্য সরকার গঠনের রায় দিল।

লোকনিটি ও সিএসডিএস সংস্থার ভোট পরবর্তী সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, একুশের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে পুরুষদের থেকে বেশি পছন্দের রাজনৈতিক দল ছিল তৃণমূল কংগ্রেস। পরিসংখ্যানের হিসাবে পুরুষদের থেকে বেশি নারীরা এবার বিজেপির থেকে তৃণমূলকে তাদের ভোট দিয়েছেন। যদিও পরিসংখ্যানের হিসাবে এটা নতুন নয়, গত ২০১৬ থেকেই শতাংশের হারে রাজ্যের নারীরা বিজেপি থেকে তৃণমূলকেই তাদের ভোটটি বেশি দিয়েছেন।

এই সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটে তৃণমূলকে ভোট দিয়েছিলেন ৪২ শতাংশ পুরুষ। নারীরা ভোট দিয়েছিলেন ৪৮ শতাংশ। বিজেপি পেয়েছিল ১০ শতাংশ পুরুষ ও ১০ শতাংশ নারীর সমর্থন। ২০১৯ লোকসভা ভোটে তৃণমূল পেয়েছিল ৪১ শতাংশ পুরুষ এবং ৪৭ শতাংশ নারীর সমর্থন।

অন্যদিকে বিজেপি পেয়েছিল ৪২ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৮ শতাংশ নারীদের সমর্থন। এই ভোটে তৃণমূলের নারীরা পুরুষদের থেকে ৬ শতাংশ ভোট বেশি দিয়েছিল। ২০২১ এর বিধানসভা ভোটে তৃণমূল পেল পুরুষদের ভোট ৪৬ শতাংশ এবং নারীদের ভোট ৫০ শতাংশ। অন্যদিকে, ২০১৯ এর লোকসভার থেকে পুরুষ এবং নারীরা দুই ভোটারদের সমর্থন কমে গিয়ে ২০২১ বিজেপির পক্ষে এল পুরুষ ৪০ শতাংশ আর নারী ভোট ৩৭ শতাংশ। অর্থাৎ তৃণমূল বিজেপির থেকে ১৩ শতাংশ নারী ভোট বেশি পেয়েছে একুশে নির্বাচনে। এই পরিসংখ্যানে এটা পরিষ্কার রাজ্যের নারীদের অর্ধেক অংশই বিজেপিকে ভোট দেননি।

ধারণা করা হচ্ছে, এই বিপুল সংখ্যক নারী ভোটারের সমর্থনের পিছনে কাজ করেছে মমতা সরকারের কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, সবুজ সাথীর সাইকেল বিতনণের মতো প্রকল্পগুলো। এছাড়া তৃণমূল সরকার পরিচালনায় নারীদের বিপুল সংখ্যায় অংশগ্রহণও প্রভাব ফেলেছে ভোটে। এর পাশাপাশি এবারের ভোটে উল্লেখযোগ্য ভাবে নারী প্রার্থীকে দাঁড় করানোও তৃণমূলকে বিজেপির থেকে মাইলেজ দিয়েছে।

সমীক্ষটিতে দেখা যাচ্ছে উচ্চ বর্ণের পুরুষদের ৩৮ শতাংশ তৃণমূলকে এবং বিজেপিকে ৪৯ শতাংশ ভোট দিয়েছেন। উচ্চ বর্ণের নারীদের মধ্যে তৃণমূলকে ৪৫ শতাংশ এবং বিজেপিকে ৪৩ শতাংশ ভোট দিয়েছেন। ওবিসি পুরুষদের ৩৬ শতাংশ তৃণমূল এবং ৪৫ শতাংশ বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। ওবিসি নারীদের ৩৬ শতাংশ তৃণমূল এবং ৫৪ শতাংশ বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। দলিত পুরুষদের মধ্যে ৩৩ শতাংশ তৃণমূল এবং ৫৭ শতাংশ বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। দলিত নারীদের ৩৮ শতাংশ তৃণমূল এবং ৫৩ শতাংশ বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। আদিবাসী পুরুষদের মধ্যে ৩৬ শতাংশ তৃণমূল এবং ৫৪ শতাংশ বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। আদিবাসী নারীদের মধ্যে ৪৯ শতাংশ তৃণমূল এবং ৩৮ শতাংশ বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। মুসলিম পুরুষদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ তৃণমূল আর মাত্র ৮ শতাংশ বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। অন্যদিকে মুসলিম মহিলাদের ৭৫ শতাংশই তৃণমূল আর মাত্র ৭ শতাংশ বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। এই পরিসংখ্যানে এটা দেখা যাচ্ছে, উচ্চ বর্ণের নারী, আদিবাসী মহিলা এবং মুসলিম নারীদের ভোট শতাংশের হারে বিজেপির থেকে বেশি পেয়েছে তৃণমূল। আবার ওবিসি এবং মুসলিমদের পুরুষ ও নারী ভোট প্রায় সমসংখ্যায় গিয়েছে তৃণমূলের পক্ষে। বাদবাকি ক্ষেত্রে মহিলারাই শতাংশের হারে বেশি ভোট দিয়েছেন তৃণমূলকে।

একেবারে গরিব থেকে আর্থিকভাবে বিভিন্ন শ্রেণির নারীদের ভোটের হিসাব যদি শতাংশের হারে দেখা হয় তাহলে এই সমীক্ষায় পাওয়া যাচ্ছে, গরিব নারীদের ৫২ শতাংশ তৃণমূল আর ৩৪ শতাংশ বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। নিন্মবিত্ত নারীদের ৫৫ শতাংশ তৃণমূল এবং ৩৩ শতাংশ বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। মধ্যবিত্ত নারীদের ৪৫ শতাংশ তৃণমূল এবং ৪২ শতাংশ বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। শুধু মাত্র উচ্চবিত্ত নারীদের ক্ষেত্রেই ৪২ শতাংশ বিজেপিকে আর ৪০ শতাংশ তৃণমূলকে ভোট দিয়েছেন। নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষে এবার তৃণমূলের স্লোগান ছিল,‘ বাংলা তার নিজের মেয়েকে চায়।’ সেই স্লোগানের যর্থাততা প্রমাণ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের নারী ভোটারাই, একুশের ভোটের পরিসংখ্যান কিন্তু তাই বলছে।