তৃণমূলের জয়লাভে তিস্তা চুক্তির কি হবে?

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: তিস্তা চুক্তির জন্য এখন আর কে কাকে দোষারোপ করবেন? রাজনীতির মারপ্যাঁচে পড়ে এতদিন ধরে শুধু দোষারোপ আর দোদুল্যমানতার মধ্যে ঝুলে আছে বাংলাদেশের কোটি মানুষের জীবন-মরণ সমস্যা তিস্তা ইস্যুটি। কেন্দ্র বলেছিলেন মমতার দায়িত্বের কথা আর মমতা বলেছিলেন কেন্দ্রের উদাসীনতার কথা। গত কয়েকটি বছর শুধু সামনের নির্বাচনের পর বিষয়টির সুরাহা হবে বলে সময় ক্ষেপণ করা হয়েছে। তাই দেখা যাক এবার কি হয়। কারণ, এবারের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে টানা তৃতীয়বারের মত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করছেন মমতা ব্যানার্জী। আন্তরিক অভিনন্দন মমতা ব্যানার্জীকে।

ভোটকুশলীদের ভবিষ্যৎবাণী নস্যাৎ করে দিয়ে বাঁধভাঙ্গা জোয়ার এসেছে তৃণমূল শিবিরে। নির্বাচনে জেতার জন্য হিন্দুধর্ম ও হিন্দুত্ববাদের মন্ত্র ছড়িয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মমতার উপকার করেছেন। কারণ পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বাঙ্গালীর চিরন্তন ঐক্য ও সংস্কৃতিকে বেশী ভালবাসেন। আরও ভালবাসেন বাঙালীয়ানাকে। এবারে নিরেট বাঙ্গালীয়ানার কাছে ঠেকে গেছে বিজেপি। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে করোনাকালে ঘরবন্দী মানুষের মনের মধ্যে গেরুয়া বসনে ধর্মের ভেদাভেদ তুলে কোন আঁচড় কাটতে পারেননি। একাজ করে নরেন্দ্র মোদী পশ্চিমবঙ্গের ২৭% মুসলিম ভোটারকে বরং মমতার দিকে ঠেলে দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১৪৮ আসনের। মোট আসন ২৯৪টি এবং ভোট গ্রহণ করা হয়েছে ২৯২টিতে। মমতার নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ২১৩টি আসন। নন্দীগ্রামে নিজের আসনে অল্পের জন্য হেরেও ভোটের সার্বিক শক্তির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন মমতা ব্যানার্জী। আর বাঙ্গাল মুল্লুকে নিজের জনপ্রিয়তা যাচাই করতে গিয়ে মোদী ধরাশায়ী হয়েছেন। আত্মপ্রত্যয়ী, কঠোর পরিশ্রমী মমতা দরিদ্র মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে জোর দিয়ে ব্যাপকভাবে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন। সেসময় পায়ে আঘাত পাওয়া সত্তে¡ও তিনি ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণা চালিয়েছেন ও তৃণমূল মানুষের নিকট নিজের হৃদয়ের মমত্বের কথা জানিয়েছিলেন।

যে যাই বলুন না কেন কার্যত: মমতা ব্যাণার্জী একজন দারুণ জাতীয়তাবাদী নেতা। নিজের দেশের জনগণ যেন কোনভাবেই কোনকিছুতে বঞ্চিত না হয় সেজন্য তিনি সর্বদা সজাগ। ‘আগে নিজে বাঁচলে পরে বাপের নাম’-এই নীতিতে তিনি বিশ্বাসী। তিনি নিজের জাতি-গোষ্ঠীর জন্য আগে ভাবেন। আগে নিজেদের চাহিদা মেটাবেন সেজন্য তিনি এতদিন তিস্তাচুক্তির জন্য অন্তরায় ছিলেন বলে বিবেচনা করা হয়। কিছুদিন আগে এক নির্বাচনী জনসভায় তিস্তার পানিবন্টন সম্পর্কে তিনি বলেছিলে, “ আগে নিজে খাব, পরে তো দেব।” তবে নির্বাচনে জয়লাভ করে আসার পরও তিনি এই নীতিতে অনড় থাকবেন কি-না তা এক্ষুনি বলা যাবে না।

কারণ, তিনি টানা তিনবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। এখন তাঁকে আরো বেশী উদার হতে হবে। হয়তো তিনি নিজেও তাই চাইবেন। এখন শুধু নিজেদের কথা ভাবলে চলবে না। বরং আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে তাঁকে সুনাম অর্জন করতে হবে। এজন্য আন্তর্জাতিক দ্বি-পাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক রাষ্ট্রীয় বিষয়ে তাঁকে নিজের ভাবমূর্তি উজ্জল করানোর জন্য জোর প্রচেষ্টা চালাতে হবে ও সমর্থন আদায় করতে হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মানুষ ব্যক্তি হিসেবে তাঁকে অনেক পছন্দ করে, অনেক ভালবাসে। তাই শুধু এপার বাংলা নয়-ওপার বাংলার মানুষের কথা বিশেষ করে মনে রাখতে হবে।

তিস্তা পানিবন্টন ইস্যুতে বাংলাদেশের কোটি মানুষ চরম হতাশায় নিপতিত। এ নিয়ে যতটুকু লেখালেখি বা প্রচারিত হয়েছে তাতে জানা যায়, মমতা ব্যানাজীর বাগ্ড়া দেয়ার কারণে তিস্তাচুক্তি করা সফল হয়নি। কেন্দ্রের কিছুই করার ছিল না বা থাকে না বলে আমরা জানি -যদি পশ্চিমবঙ্গ থেকে এ বিষয়ে বাধা আসে তাহলে। এভাবেই কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে পারস্পরিক দোষারোপের মধ্যে বিষয়টি দীর্ঘদিন ও যুগের পর যুগ ঝুলে থাকার শক্তি খুঁজে পায়। দুই বাংলার ভাষা, খাদ্য ও সাংস্কৃতিক ঐক্য যখন তৃণমূল মানুষের শক্তির প্রেরণা যোগায় তখন আরেক বাংলার মানুষকে এরকম একটি আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বার বার উপেক্ষা কেন?

এবারের করোনার ভয়ে লকডাউন পড়ে যাওয়ায় বংলাদেশের মানুষ কোলকাতার বাজারে ঈদের কেনাকাটা করতে যেতে পারেনি। কোলকাতার ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত পড়েছে। একদিকে ইলিশ বন্ধ হলে অন্যদিকে পিঁয়াজ রপ্তানীতে ভাটা পড়ে যায়। এগুলো তো মুক্তবাজার অর্থনীতির বাগ্ড়া বৈ-কিছু নয়। এতে পারস্পরিক সহযোগিতা ও ভালবাসা ক্ষুন্ন হয় আর তা থেকে কোন সুফল লাভের আশা করা বোকামী।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গত নির্বাচনে জেতার জন্য মতা ব্যানার্জী ভোটারদের মন জয় করতে তিস্তার পানিবন্টন সম্পর্কে শুধু নিজেদের স্বার্থের কথা বলে রাজনৈতিক বক্তৃতা দিয়েছেন মাত্র। এটা তাঁর মনের কথা নয়। একটা ফলপ্রসূ তিস্তা চুক্তির জন্য এবার তাঁর দায়-দায়িত্বটা আরো বেশী বেড়ে গেছে। এখন এই দায়ভার তিনি আর কারো উপর চাপাতে পারবেন না। জোর করে চাপাতে গেলে তাঁকে সত্যি সত্যি মমত্বহীন মনে করবে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডল। তাই বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে তিস্তা বেসিনে বসবাসরত কোটি মানুষের চরম পিপাসার কথা ভেবে তাঁকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।E-mail: fakrul@ru.ac.bd

জেড,আই/ঢাকানিউজ২৪ডটকম।