‘দিল খুলবে পরে তোর আগে খুলুক হাত’

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ হলো জাকাত। রোজা আত্মার শুদ্ধি এনে দেয় আর জাকাত নিয়ে আসে সম্পদের শুদ্ধি। সৎপন্থায় উপার্জিত জমাকৃত নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের উপর নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলে সুনির্দিষ্ট হারে জাকাত প্রদানের বিধান রয়েছে। এটা ইসলামের একটি অবশ্য পালনীয় বিষয়। পবিত্র কোরআন শরীফের ৮২ জায়গায় নামাজ আদায়ের সাথে সাথে জাকাত প্রদানের কথা উল্লেখ রয়েছে। জাকাত প্রদানের মাধ্যমে ধর্মীয় অনুশাসন পালনের পাশাপাশি একজন মানুষের বদান্যতা, পরোপকারীতা ও হৃদয়ের বিশালতা প্রকাশিত হয় এবং দুস্থ: মানুষের কল্যাণ আনয়নের মাধ্যমে সামাজিক সহমর্মিতা ও স্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়। ফলে আর্থিক ও সামজিক বৈষম্যপূর্ণ একটি দুর্বল ও ভঙ্গুর সমাজ হয়ে উঠে সমান্তরাল ও শান্তিময়। যে ব্যক্তি রোজা রাখে ও সঠিকভাবে জাকাত দেয় তার জন্যই কল্যাণের বার্তা রয়েছে। কারণ নিজেকে নিজের সাথে শপথ করার মাধ্যমে দেহ, মন ও চিন্তা চেতনার আসল শুদ্ধি শুধু রোজার মাধ্যমেই সম্ভব। অন্য কোন বাহ্যিক ইবাদতের সাথে রোজার এখানেই আসল পার্থক্য বিরাজমান। ঈমানদার মুসলমানগণ নামাজ আদায় করেন, রোজা রাখেন, জাকাত প্রদান করেন। জাকাতের মাধ্যমে দুস্থ:, অসহায় মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসা, উদারতা ও সহানুভূতির মহিমা প্রকাশিত হয়। সাধারণত: প্রতিবছর রমজান মাসে মুমিনদের জমাকৃত বার্ষিক সম্পদের উপর ধর্মীয়মতে নির্দিষ্ট হার হিসেব করে জাকাত প্রদানের তৎপরতা বিষেশভাবে লক্ষ্যনীয় হয়ে উঠে।

কিন্তু বর্তমানে ভোগবাদী জীবনে অভ্যস্ত মানুষ ক’জন অপরের কথা ভাবেন? মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা মুসলিম বিশ্বর বিত্তশালী অনেক মানুষ এখন চাকচিক্যময় আধুনিক অট্টালিকা তৈরী, দামী ব্রান্ডের নতুন গাড়ি ক্রয়, বিদেশী রিসোর্টে অবসর যাপন ও দরিদ্র প্রতিবেশীদের উপর যুদ্ধ করার জন্য অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র ক্রয়ে বেশী তৎপর। তারা দরিদ্র নিরীহ প্রতিবেশীদেরকে সাহায্য সহযোগিতা না করে বরং যুদ্ধ বাঁধাতেই বেশী আগ্রহী। অপরদিকে দরিদ্র প্রবাসী শ্রমিকদেরকে কম বেতন প্রদান,নিম্নমানের আবাসন, চাকুরী ছাঁটাই, গহকর্মীকে পাশবিক নির্যাতন করা ইত্যাদি যেন তাদের নিত্যসঙ্গী।

আমাদের দেশেও শত শত কোটিপতি মুসলিম আছেন। যারা বাহ্যিক ইবাদতে নিয়মিত কিন্তু সুদ-ঘুষেরও চর্চ্চা করেন অবিরত। এই বিত্তশালীদের অনেকেই জাকাত প্রদান করতে চান না। অনেকে সরকারী ট্যাক্স প্রদান করতে গিয়ে নানা কৌশল অবলম্বন করে বিরাট অংক ফাঁকি দেন। এত বড় সংখ্যার ধনীদের মধ্যে মাত্র ক’জন হাতে গোণা ভালমানুষ জাকাত প্রদান করেন। অন্যদের অবস্থা কোন ভাল হিসেবেই মেলানো যাবে না। তারা সবাই ঠিকমত ট্যাক্স এবং জাকাত প্রদান করলে দেশে হতদরিদ্রাবস্থা বিমোচনের জন্য বিদেশী কারো কাছে অর্থ ঋণের জন্য হাত পাতার প্রয়োজন হতো না।

আমাদের দেশে বিত্তশালী মানুষের সংখ্যা এবং জাকাত প্রদানের উপযুক্ত মানুষের সংখ্যার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তারা তারা অনেকে নামে-বেনামে ব্যাংকে অথবা ট্যাক্স প্রদানের ভয়ে বালিশের মধ্যে অর্থ লুকিয়ে রাখেন। তাঁদের কতজন জাকাত দেন? দিলেও কতজন সঠিক পরিমাণ হিসেব করে জাকাত আদায় করেন তা বলাই বাহুল্য। দুর্নীতি, কপটতা, কৃপণতা, বখিলতা ইত্যাদি যেন এক শ্রেণির উঠতি বিত্তশালীদের মজ্জাগত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অচিরেই তাঁদের ঘুম ভাঙ্গাতে হবে।

প্রতিবছর ঈদুল ফেতেরের পূর্বে যারা লোক দেখানোর জন্য সামান্য অর্থ বন্টন করতে মাইক লাগিয়ে প্রচারণা করেন, যারা নিম্নমানের বস্ত্র কিনে বন্টনের নামে পদদলন সৃষ্টি করেিয় প্রতিবছর দুস্থ: অসহায় মানুষের প্রাণ কেড়ে নেন তারা মুমিন হতে পারেন না, আসল মুসলিম হিসেবে তাদের পরিচয় দিতে লজ্জা হওয়া উচিত। এদের নিয়ন্ত্রণের জন্য আগেভাগে সরকারী কোন উদ্যোগ চোখে পড়ে না। লোক দেখানো জাকাত বন্টন নিয়ে ভয়াবহ পদদলনে মৃত্যু বা দুর্ঘটনা ঘটে গেলে কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে উঠে।

নামাজ ও জাকাত এক অপরের পরিপূরক। দু’টোই অবশ্য পালনীয় ইসলামী বিধান। এর দ্বারা সম্পদের পবিত্রতা আনয়ন ও দরিদ্রদের হক আদায় করা হয়। হযরত আল্লামা ইবনে মাসুদ বলেছেন- “কেউ যাকাত আদায় না করলে তার সালাত আদায় হবে না”। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে- “তাদের মালামাল থেকে জাকাত প্রদান কর যাতে তুমি সেগুলো পবিত্র করতে ও বরকতময় করতে পারো এর মাধ্যমে। যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য মজুদ করে ও আল্লাহ্র পথে ব্যায় করে না, হে নবী ! তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সংবাদ দিন।” (সুরা আত-তাওবা আয়াত: ৩৪)।

পৃথিবীতে দুর্যোগ, রোগ-শোক, মহামারী ইত্যাদি সবসময় লেগেই আছে। হয়তো চিরদিন সেগুলো কোন না কোন ভাবে হতেই থাকবে আর এর নেতিবাচক প্রভাবে ধনীরা দরিদ্র হবে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী ধনী হতে থাকবে। দরিদ্র ও দুস্থ: নিরীহ মানুষ সাহায্য বা দান-খয়রাত না পেলে বেঁচে থাকবে কীভাবে? অথচ, পুজিঁবাদী অর্থনীতিতে কল্যাণের কথা বলা হলেও দানের কথা নেই। ঋণের কথা ও সুদের মাধ্যমে ধার-দেনার কথা বিভিন্ন অর্থসূত্রে বলা হলেও শর্তবিহীন ও সুদবিহীন অর্থ সাহায্য করার মহান পদ্ধতি হলো জাকাত। এট যেহেতু গ্রহীতার জন্য ফেরত প্রদানের শর্তে আবদ্ধ নয় সেহেতেু এখানে দেউলিয়া হয়ে পথে বসার কোন ঝুঁকি নেই। সুতরাং জাকাত গ্রহীতার জন্য যে কোন বিরুদ্ধ পরিস্থিতিতেও জাকাতের অর্থ শুধু কল্যাণই নিশ্চিত করতে পারে।

তবে জাকাত নিয়ে শুধু খেয়ে ফেলে সাবাড় করে দিয়ে আবার হাত পাততে আসবে এমন দর্শন থাকা উচিত নয়। জাকাত গ্রহণের মাধ্যমে একজন গ্রহীতা যেন তার নিজস্ব সম্পদ বৃদ্ধি করতে পারে এমন কর্মসূচি থাকা দরকার।

এজন্য দেশের দরিদ্রদের মোট সংখ্যা সঠিকভাবে চিহ্নিত করে, দৈহিক ও মানসিক অবস্থা যাচাই করে শ্রেণিবিভাগ করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বনের মাধ্যমে জাকাত প্রদানের ব্যবস্থা করা দরকার। অভাবী মানুষকে যেনতেনভাবে না ঠকিয়ে মানসম্মত বস্ত্র, পরিমাণমত দ্রব্য ও অর্থ সাহায্য করতে হবে। যাতে এটা গ্রহণের মাধ্যমে তারা স্বাবলম্বী হতে পারে ও ফিবছর সাহায্যের জন্য দুয়ারে দুয়ারে ধর্ণা না দেয়।

এজন্য সমাজের সচেতন সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এক ভিখারীর ভিক্ষার পরিবর্তে ছাই চাওয়ার গল্পটা অনেকেই হয়তো জানেন। তবুও বলছি। এক ভিখারী ধনী গৃহস্থ বাড়িতে ভিক্ষা চাইতে গেলে তাকে গৃহিনী বার বার নানা অজুহাতে খালি হাতে ফিরিয়ে দিত। একদিন ভিখারী জেরা করলো- আজও ফিরালেন মা। আজ ভিক্ষা না দেবার কারণটা কি জানতে পারি? গৃহিণী নিজের অতি ব্যস্ততা দেখিয়ে সে সময় চুলোর ছাই ফেলতে বাইরে যাচ্ছি বলে কড়া স্বরে উত্তর দিল। একথা শুনে ভিখারী বলেছিল, আমাকে ভিক্ষার পরিবর্তে একমুঠো ছাই দিন মা! ভিখারীর আব্দারে গৃহিনী আশ্চর্য্য হয়ে বললো- ছাই দিয়ে কি হবে তোমার? ভিখারী উত্তরে বলেছিল, আমাকে ছাই দিতে দিতে মহান আল্লাহ তোমাকে কিছু দান করার অভ্যাস সৃষ্টি করে দিন মা। তাহলে এই হাত খুলে গিয়ে একদিন প্রাণ খুলে ভিক্ষা দেয়ার ভিক্ষা দিতে পারবেন মা।

বিষয়টির গভীরতা অনুধাবন করে নিজের ভুল বুঝতে পেরে গৃহিণী লজ্জা পেয়ে সেদিন থেকে সব ভিখারীকে ভিক্ষা দেয়া শুরু করেছিল। আমাদের সমাজে অনেক বিত্তশালী কিন্তু ভীষণ কৃপণ ও বখিল লোকদের জন্য এই গল্পটা একটা শিক্ষণীয় উদাহরণ।

এভাবে আগে হাত খুলুক সবার। কৃপণতা ও কপটতা যেন শয়তানের প্রভাবে কারো মনের মধ্যে ধোঁকা দিতে না পারে সেজন্য সতর্ক থাকতে হবে সকল মুমি-মুসলমানকে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই বিখ্যাত গজলের মত তাই আজ বলতে ইচ্ছে করছে-“দে জাকাত দে জাকাত। দিল খুলবে পরে তোর আগে খুলুক হাত”। আমরা সবাই অপরের সাহায্যে নিজের হাত বাড়িয়ে দিই। এভাবে একদিন আর কারো কাছে চাইতে হবে না, বলতে হবে না। সবার আত্মা এমনিতেই সৎকাজে সজাগ হয়ে উঠবে এবং সূচিত হবে বিশ্ব মানবতার কল্যাণ।

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।E-mail: fakrul@ru.ac.bd

জেড,আই/ঢাকানিউজ২৪ডটকম।