দুর্দিনে নিম্ন আয়ের মানুষ

বড় দুর্দিনে নিম্ন আয়ের মানুষ
বড় দুর্দিনে নিম্ন আয়ের মানুষ

নিউজ ডেস্ক : দেশে নিম্ন আয়ের মানুষ এত বেকায়দায় আগে কখনও পড়েননি। সংসারের খাওয়া-পরা, ছেলে ও মেয়ের লেখাপড়ার খরচ- সবই মিলে ভীষণ সমস্যায় পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। লকডাউন ঘোষণার পর তার আয় পাঁচ ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। হিমশিম খেতে হচ্ছে তার দিন চালাতে। রাজধানীর সব নিম্ন আয়ের মানুষের এখন এমন অবস্থা। বড় দুর্দিন এখন তাদের।

রাজধানীর রিকশাচালক শামসুল আলম বলেন, ছয় দিন ধরে ২০০ টাকার বেশি আয় করতে পারছেন না। আর সব রমজানে আধাবেলা রিকশা চালালেই ৭০০ টাকা আয় করা যেত। রমজান মাসে মানুষজন হাঁটাহাঁটি কম করে। তাই রিকশার যাত্রী বেড়ে যায়। তিনি এবার যাত্রীই পাওয়া দুস্কর। সংসারের খরচই তুলতে পারছেন না ।

পান-সিগারেট বিক্রেতা আল আমিনের একই অবস্থা। তিনি রাজধানীর মতিঝিল এলাকায় ঘুরে ঘুরে বেচাকেনা করেন । এর আগে বেচাকেনার পর গড়ে দৈনিক আয় হতো ৫০০ টাকা। কয়েক দিনের লকডাউনে বেচাকেনাই হচ্ছে ৫০০ টাকা, আয় হচ্ছে দৈনিক সর্বোচ্চ ১০০ টাকা। দিনের থাকা-খাওয়ার খরচই উঠে না। আল আমিন বলেন, মানুষজন বাইরে বের হন কম। আর যারা বের হন, তাদের অনেকেই রোজাদার। এজন্য বেচাকেনা একদম কমে গেছে। চায়ের দোকানদার বাবুলও জানালেন, বেচাকেনা নেই।

রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মার পাশে বসে ভিক্ষা করেন ফরিদপুরের কাউলিকান্দার প্রতিবন্ধী এসকেন সরদার। তিনি জানান, রমজান মাসে মানুষ বেশি দান করায় আয়ও হতো বেশি। এবার প্রথম রমজান থেকেই লকডাউন। মানুষজন নেই রাস্তায়। ভিক্ষাও পাচ্ছেন না। ইফতারের আগে কেউ কেউ খাবার-দাবার দেয়, তা দিয়েই দিন পার করতে হচ্ছে তাকে।

শামসুল আলম, আল আমিন, বাবুল, এসকেনের মতোই দুরবস্থা দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য মানুষেরও। কঠোর লকডাউনে অনানুষ্ঠানিক খাতের দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল মানুষের আয় কমেছে। এদিকে কারও কারও আয় বন্ধ হয়ে গেছে। কেউ কেউ প্রয়োজনীয় খাবারের জন্য ঋণ করতে হচ্ছে অথবা আত্মীয়-পরিজনের সহায়তা নিতে হচ্ছে। সামাজিক সহায়তার জন্যও হাত বাড়াচ্ছেন অনেকে। সবাই ঋণ বা সহায়তা পাচ্ছেন না। গতবছর সাধারণ ছুটির সময় বিত্তবান ব্যক্তি, বিভিন্ন কোম্পানি ও সংস্থা সহায়তা নিয়ে এগিয়ে এলেও এবার তেমন দেখা যাচ্ছে না।

প্রথম করোনার ঢেউয়ের প্রভাব কাটতে না কাটতেই শুরু হয়েছে দ্বিতীয় ঢেউ। গতবারের ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটির ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত অনেকেই এখনও বিপর্যস্ত অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। দেশে ওই সময় দারিদ্র্যের হার দ্বিগুণ হয়েছিল। নিম্ন আয়ের মানুষ যখন সেই ধাক্কা সামলে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখনই শুরু হয়েছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ।

সরকারের ৫ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহের বিধিনিষেধে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাব সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষরা । করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়ে যাওয়ায় গত ১৪ এপ্রিল থেকে সার্বিক কার্যাবলি ও চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। একে বলা হচ্ছে সর্বাত্মক লকডাউন। জরুরি পণ্য ও সেবার সঙ্গে সম্পৃক্ত কার্যক্রমের বাইরে সবকিছু বন্ধ রাখা হয়েছে। এই লকডাউন আরও এক সপ্তাহ বাড়ানো হবে বলে আভাস দিচ্ছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল মানুষের টিকে থাকার সংগ্রাম আরও কঠিন হতে যাচ্ছে। অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে দুর্ভাবনায় পড়েছেন নতুন করে।

লকডাউনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন দিনমজুর, শ্রমিক ও নিম্নবিত্ত জনগণ। বিশেষ করে যারা শহর ও শহরের উপকণ্ঠে থাকেন। এ পরিস্থিতিতে অনানুষ্ঠানিক খাতের লোকজন রিকশাচালক, পরিবহনকর্মী, হকার, দিনমজুর, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, কামার, কুমোর, জেলে, দর্জি, বিভিন্ন ধরনের মিস্ত্রি, নির্মাণ শ্রমিকসহ দৈনন্দিন আয়ের ওপর নির্ভরশীল মানুষ কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন না। কাজ থেকে দূরে থাকতে হচ্ছে ভ্যানচালক, ঠেলাগাড়িচালক, রংমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, তালা-চাবির মিস্ত্রি, সাইকেল-ভ্যান, রিকশা ও মোটর গ্যারেজের কর্মীদেরও। মোবাইল রিচার্জের ব্যবসায়ী, ফুল বিক্রেতা, দোকানের কর্মচারী, ফুটপাতের ব্যবসায়ীরাও আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। মিষ্টির দোকান ও বেকারি বন্ধ থাকায় গ্রামে দুধ ব্যবসায়ীরা দুধ কিনছেন না। 

যারা গাভি পালন করেন, তারা ও ব্যবসায়ী উভয়েই সমস্যায় পড়েছেন। মুদ্রণ ও প্রকাশনা খাতের কর্মীরা বেকার বসে আছেন আগে থেকেই। শহরের বস্তিবাসী- যারা বাসাবাড়ি, নির্মাণ খাতসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে দিনমজুরের কাজ করেন, হকারি করেন এবং রাস্তার পাশে অস্থায়ী দোকান করেন- তারাও বেকার এখন। সামগ্রিকভাবে কৃষি, শিল্প ও সেবা সব খাতেই নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর লকডাউনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আয় হারিয়ে কর্মহীন বসে থাকার ফলে এ ধরনের মানুষের খাদ্য সংকট ছাড়াও স্বাস্থ্য ও মানসিক পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতিরও আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা লকডাউনের সময় দরিদ্রদের খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলছেন, শহরের দরিদ্রদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাড়াতে হবে। বিত্তবানদের সহায়তা করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে। লকডাউন-পরবর্তী সময়ে এ ধরনের লোকেরা যাতে সহজেই আয় করতে পারে, এমন পরিবেশ সৃষ্টি করার কথা বলছেন তারা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের কর্মসূচি দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।