গ্রাম বাংলার খেলা হুমগুটি

গ্রাম বাংলার খেলা হুমগুটি
গ্রাম বাংলার খেলা হুমগুটি

মুর্শেদ আলম খান :

হুমগুটি ময়মনসিংহের কয়েকটি এলাকার একটি ঐতিহ্যবাহী খেলা।খেলাটি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা, ফুলবাড়িয়া, জামালপুর এবং টাংগাইলের কিছু অন্ঞ্চল ব্যতীত অন্য কোন এলাকায় হুমগুটি বা অন্য কোন নামে এমন খেলা অনুষ্ঠিত হবার কোন প্রমান আদৌ মিলে নি। কাজেই এ কথা বলা যায় যে এটি ময়মনসিংহ বিশেষ করে মুক্তাগাছা ও ফুলবাড়িয়া অন্ঞ্চলের একটি সতন্ত্র খেলা।

এখানে আন্ঞ্চলিক শব্দে হুম মানে শক্তি বা আজগবি বা বৃহৎ কোন বিষয় আর গুটি মানে গোলাকার বস্তু বা খেলার জন্য ব্যবহৃত কোন উপকরণ। সাধারনত আমন ধানের ফসল ঘরে উঠার পর মাঠ পতিত থাকে তখন দিগন্ত বিস্তৃর্ণ খোলা মাঠে জমজমাট খেলা জমে উঠে। বিশেষ করে ফাল্গুন চৈত্র মাসে হুমগুটি খেলাটি বেশী অনুষ্ঠিত হয়। এ খেলায় অংশ গ্রহনকারী খেলোহারদের নিদিষ্ট কোন সংখ্যা,বয়স, উচ্চতা, বা কোন ধরনের মাপকাটি নেই। জাতি, বর্ণ, ধর্ম নির্বিশেষে আবাল- বৃদ্ধ – বনিতা যে কেও এখেলায় অংশ নিতে পারে।

                                   

এমনও দেখা যায়, এ খেলায় একই সাথে ২০/৫০ হাজার লোক অংশ নিয়ে থাকে। এ খেলার উপকরণ হলো একটি বৃহৎ গুটি। যাকে বলা হয় হুমগুটি। একটি পিতলের কলসির উপরের অংশ প্রথমে কেটে ফেলা হয়। অনেক সময় কলসি আস্তও রাখা হয়। পরে সেই কলসির ভেতরে চিনি, গুড়, অথবা বালু দিয়ে ভরা হয়। পরে কলসির মুখ ঝালাই করে বন্ধ করে দেয়া হয়। পরে এটিকে চটের বস্তা দিয়ে মুড়িয়ে নিয়ে দিড় দিয়ে বিশেষ কৌশলে পেঁচিয়ে নেয়া হয় যাতে করে খেলার সময় আঘাত না পায়।

এভাবেই হুমগুটি তৈরি হয়ে যায়। কখনো কখনো নারিকেলকে হুমগুটি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পূর্বে নির্ধারিত দিন তারিখ অনুযায়ী বিভিন্ন অন্ঞ্চল থেকে খেলোয়াড় এসে বিশাল পতিত মাঠে জমায়েত হলে খেলার আয়োজক কমিটি র লোকজন মিলে হমগুটিটি নিয়ে মাঠে হাজির হয়। সেখানে মাঝখানে গুটি রেখে সবাই গোল হয়ে হাত তালি দিতে থাকে। এ সময় একজন ওপর দিকে মুখ করে আ,,বা,, দে,,রে বলে উচ্চ স্বরে ডাক দিবে। তার ডাক থামার সাথে সাথে গোল হয়ে দাঁড়ানো বাকি সবাই এক সাথে বলে উঠে “হিও’। শব্দটি এমন প্রকট হয় যে বাতাসে আলোড়িত হয়ে অনেক দ্ূর পর্যন্ত চলে যায়। এটাকে খেলায় হাবা দেয়া বলে। এভাবে তারা কম পক্ষে তিনবার আবা দিবে।

                                     

এ সময় অন্যান্য পক্ষ যারা খেলায় অংশ নিবে তারা নিজেদের সুবিধা মতো স্থানে একত্রিত হয়ে উল্টো আবা দিবে। এ ক্ষে তারা পূর্বের ন্যায় একত্রিত হয়ে একজন ফিরের আ,,বা,,দে,,রে বলে উচ্চস্বরে ডাক দিবে। বাকিরা বলবে, হিও,। একে ফিরের আবা বলা হয়।এভাবে (যে মাঠে খেলা শুরু হবে তার চর্তুদিকে) সমগ্র এলাকার চার দিক থেকে ভেসে আসা আবা আর ফিরের আবারধ্বনি, প্রতিধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠে। তখন কমিটি খেলা শুরু করে দেয়। খেলা শুরু করাকে বলা হয় গুটি ছাড়া।

প্রথমে কমিটি নিজেদের মাঝে খেলতে থাকে। তখন গুটি ছাড়া হয়েছে শুনে অন্যান্য পক্ষের লোকজন এতে অংশ নিতে থাকে। একাধিিক পক্ষের লোকজন খেলা শুরু করলে কমিটির লোকজন খেলা ছেড়ে বিশ্রাম নিতে থাকে। এবং খেয়াল রাখে কোন পক্ষ যেন গুটিটি বেশি দূর নিয়ে যেতে না পারে। নিয়ে যেতে থাকলে গুটিটি নিজেদের গন্ডির মধ্যে রাখার চেষ্টা করবে। এভাবে খেলা চলতে থাকে। খেলায় অংশ গ্রহনকারী লোকজন বৃদ্ধি পেতে থাকে। এক এলাকা থেকে খেলা ভিন্ন এলাকায় চলে যেতে পারে। নিয়ে যেতে থাকলে তারভ খেলায় অংশ নিয়ে নিজেদের গন্ডির মধ্যে রাখার চেষ্টা করে। এক সময় খেলায় লোক সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে বিশ থেকে পন্ঞ্চাশ হাজার পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। তখন মূল গুটিটি কোথায় আছে তা বুঝা কঠিণ হয়ে পড়ে। নিজেদের দিকে গুটি নিতে একজন আরেক জনকে শক্তির জোরে ধাক্কা দিতে থাকে। তবে এ ক্ষেত্রে সবার সজাগ দৃষ্টি থাকে যেন কেউ ব্যাথা না পায় কিংবা কারও ফসল বা গাছপালা নষ্ট না হয়। খেলাটি দেখলে যে কারো মনে হবে চরের জমি দখলের কোন লড়াই হচ্ছে।

                                   

কিন্তু মজার বিষয় হলো হুমগুটি খেলায় বড় ধরনের কোন ঝগড়া হয় না। এমনও হয় এ খেলা তিন চার দিন চলতে থাকে। আগের দিনে গ্রামের লোকজন মিলে খেলোয়াড়দের খাবার দাবারের ব্যবস্থা করত। খেলতে খেলতে গুটিটিকোন এলাকার লোকজন গুটিটি কোন বাড়িতে লুকিয়ে ফেলে। একে গুটি তোলা বলে।সাধারনত গ্রামের মোড়ল শ্রেণীর বাকোন ধনাঢ্য ব্যাক্তির বাড়িতেই গুটি তোলা হয়। এরপর তারা একত্রিত হয়ে পূর্বের ন্যায় গোলাকারে দাঁড়িয়ে হাততালি দিবে আর একজন উচ্চস্বরে বলবে জিতের আ,,বা,,রে,,রে। বাকিরা তখন একত্রে বলবে ” হিও’।এভাবে তিনবার জিতের আবা দিতে পারলে তারা জিতে গেছে বলে ধরা হবে। তখন অন্যান্য এলাকার লোকজন চলে যাবে। যার বাড়িতে গুটি উঠানো হয়েছে সে সবাইকে চিড়ে,মুড়ি,গুড় বা চিনি খেতে দেবে। অনেক সময় পরবর্তীতে গরু বা খাসী জবাই করে এলাকার সকলকে নিয়ে ভুড়িভোজের আয়োজন করে থাকে।

কখনো কখনো পরেরদিন এলাকার যুবকরা দল বেঁধে ঢোল নিয়ে হুমগুটি সংগে নিয়ে সারা এলাকা ঘুরে বেড়ায়। এ খেলায় জিতে যাওয়াটাকে এলাকার সন্মান হিসেবে ধরা হয়।জানা যায় রায়তদের মাঝে জমির বন্টন নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে মুক্তাগাছার জমিদাররা একটি নিদিষ্ট সীমানা নির্ধারণ করে এ হুমগুটি খেলার আয়োজন করেন। তখন যে পক্ষ তাদের পক্ষে গুটি নিতে পেরে ছিল সে পক্ষকে জমি বুজিয়ে দেয়া হয়। সে থেকেই না কি হুমগুটি খেলার প্রচলন। কারও কারও মতে মুক্তাগাছার কোন এক জমিদারের সাথে ফুলবাড়িয়ার পুটিজানার একজন জমিদারের সাথে জমির বিরোধ ছিল।

                                     

তখন এ হুমগুটি খেলার আয়োজন করে তার সমাধান করেন। অধিকাংশের মতে মুক্তাগাছা ও ফুলবাড়িয়ার সীমান্তবর্তী এলাকার একটি পতিত জমিতে হুমগুটি খেলা প্রথম অনুষ্ঠিত হয়। সে থেকেই আজও প্রতি বছর পৌষ সংক্রান্তির দিন ফুলবাড়িয়াতে হুমগুটি খেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। হুমগুটি খেলার দিন, তারিখ নির্ধারণ করে আশপাশের এলাকার হাট- বাজারে ঢোল পিটিয়ে খেলার কথা জানিয়ে দেয়ে হয়। আধুনিক কালে খেলার সাথে রঙ্গিন টেলিভিশন, ষাঁড়, গরুসহ বিভিন্ন ধরনের পুরস্কার ঘোষণা করা হয়।

লেখা গ্রামিণ খেলাধূলা বই থেকে : মুর্শেদ আলম খান ও এম ইদ্রিস আলীর