মোর্শেদ আলী : এক নক্ষত্রের প্রস্থান

মোর্শেদ আলী : এক নক্ষত্রের প্রস্থান
মোর্শেদ আলী : এক নক্ষত্রের প্রস্থান

মাহবুবুল ইসলাম

বিংশ শতকের প্রথমার্ধের শেষপ্রান্তে ঈশ্বরদীর এক নিম্নবিত্তের জীর্ণ কুটিরে সালমা খানমের কোলজুড়ে যে নক্ষত্রের উদয় হয়েছিল, তার প্রস্থান ঘটল একবিংশ শতকের সাত এপ্রিল সূর্যোদয়ের পরক্ষণেই। ষাটের দশকে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞানে অধ্যয়ন করা ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য একটি স্বপ্ন। সেই দুঃসাধ্য স্বপ্নে পৌঁছেও যিনি জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন বঞ্চিত খেটেখাওয়া মেহনতী মানুষের দুঃখ লাঘবের প্রচেষ্টায়, সমাজ থেকে ক্ষুধা-দারিদ্র্য দূর করার অন্বেষায়, বৈষম্যমুক্ত আলোকিত সমাজ বিনির্মাণের সংগ্রামে, তিনি অতিমারির মাঝে নিভৃতে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

না অতিমারি তাকে স্পর্শ করতে পারেনি, তিনি চলে গেলেন বঞ্চিত খেটেখাওয়া মেহনতী মানুষের দুঃখ লাঘব করতে না পারা বেদনার চাপে ব্যথিত হয়ে। ব্যর্থতা নয়, তিনি তার সবটুকু আলো দিয়েই সমাজকে আলোকিত করার চেষ্টা করেছিলেন। জরাজীর্ণ সমাজকে বিনির্মাণ করে মানবীয় শোষণ-বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের চেষ্টা করেছেন নিরন্তর। মুক্তির মশাল হাতে নিয়ে বঞ্চিত-নিপীড়িত প্রান্তিকজনকে মুক্তির পথ দেখিয়ে গেছেন অবিরাম।

সুযোগ ছিল তার সাধারণের স্বপ্নের মতো সমাজের উঁচুতলায় পৌঁছে সেখানকার সব সুবিধা ভোগ করার। সুযোগ ছিল বিত্তে-বৈভবে সমৃদ্ধশালী হওয়ার, তার পারিপার্শ্বিক সারথিদের মতো বিত্তবান-ক্ষমতাবান হওয়ার। নিকটজনের বাসনাও তাই ছিল; কিন্তু না তিনি তার কিছুই করলেন না। কোন লালসাই তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। সব সুযোগ-সুবিধাকে পদদলিত করে বেছে নিয়েছিলেন জন্মসূত্রে পাওয়া নিম্নবিত্ত ও তারও নিচের মেহনতি মানুষের জন্য সংগ্রামের জীবন। লক্ষ্য একটাই, প্রান্তিকজনকে মুক্তির পথ দেখিয়ে নতুন এক মানবিক সমাজ বিনির্মণের। তাইতো তিনি ছাত্রাবস্থায়ই কৃষক ক্ষেতমজুরদের সংগঠিত করতে বেরিয়ে পড়েছিলেন।

শাসকদের রোষানলে পড়ে গ্রেফতারও হলেন। দীর্ঘদিন কারাভোগ করলেন। কারামুক্ত হয়ে এসেই চলে গেলেন বাওয়ানী জুট মিলের মেহনতী শ্রমিকদের মাঝে। বেছে নিয়েছিলেন শ্রমিকের জীবন। তাদের অধিকার আদায়ে অগ্রজের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। এজন্য তাকে কম মূল্য দিতে হয়নি, কম অপবাদ সহ্য করতে হয়নি, প্রশাসন ও সুবিধাভোগী বিত্তবানদের কাছে কম লাঞ্ছিত হতে হয়নি। এমনকি তার সারথিদের কাছ থেকেও। কিন্তু তিনি মেহনতী মানুষের মুক্তির প্রতিজ্ঞায় অবিচল থেকে দৃঢ়তা, একাগ্রতা, নিষ্ঠা, বিবেক-বিবেচনা, জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে সব প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করেছেন নিজ আলোয়।

মানুষ গড়ার কারিগর স্কুলশিক্ষক শেখ আরশাদ আলীর সাত রত্নের দ্বিতীয় এই রত্ন পিতার ছড়ানো আলোর জ্যোতিতে দীপ্তমান হয়ে অচিরেই ছাড়িয়ে গিয়েছেন আপন মহিমায়। অসম্ভব মেধাবী এই সন্তানকে নিয়ে আরশাদ আলী ও সালমা খাতুনের স্বপ্ন ছিল আকাশচুম্বী। বন্ধু-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর আকাক্সক্ষাও কম ছিল না। সবার আকাক্সক্ষার সাথে মেহনতী মানুষের মুক্তির আকাক্সক্ষাকে যুক্ত করে তিনি তার আলো বিলিয়েছেন সবার মাঝে।

তিনি হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রীর প্রিয়পাত্রে পরিণত হয়ে আর এক সহচারী মাহফুজা খানমের সাথে ১৯৬৬-৬৭ বর্ষের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র-ছাত্রী সংসদের (ডাকসু) কর্ণধার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। পরবর্তীতে লতিফ বাওয়ানী জুট মিলের শ্রমিকদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার সাথী হয়ে তাদের প্রিয়পাত্রে পরিণত হয়েছিলেন তিনি। প্রান্তিক কৃষকদের দুঃখ লাঘবে তাদের সংগঠিত করে অধিকার আদায়ে আমৃত্যু চেষ্টা চালিয়েছেন সশরীরে, লেখনিতে ও সংগ্রামের মাধ্যমে।

মেহনতী মানুষের মুক্তির সংগ্রাম মোর্শেদ আলীকে অসম্ভব সাহসী করেছিল। তাইতো মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন পরিবারকে সংগঠিত করে যে বিশেষ গেরিলা বাহিনী গঠিত হয়েছিল, সেই বাহিনীর অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করেই একটি ব্যাটালিয়নের কমান্ডার নিযুক্ত হয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তার সাহসিকতা, নেতৃত্বের গুণাবলী তাকে অন্য যোদ্ধাদের কাছে বিশেষ মর্যাদায় পৌঁছে দিয়েছিল।

’৯০-এর দশকের শেষ ভাগে যখন ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন বিশেষ গেরিলা বাহিনীর তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়, তখন দেখেছি অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে মোর্শেদ ভাইয়ের গ্রহণযোগ্যতার পরিধি কত ব্যাপক ছিল। কৌশলগত কারণে এই বাহিনীর কোন তালিকা সংরক্ষিত ছিল না। রাষ্ট্রের কোন দলিলে এ বাহিনীর নাম স্বীকৃতি পায়নি। মোর্শেদ ভাই এই বাহিনীর তালিকা তৈরির দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নজনকে দিয়ে কাজটি করানোর চেষ্টা করেছেন।

সর্বশেষ ১৯৯৭ সালে তিনি এক প্রকার আবেগতাড়িত হয়ে আমাকে ডেকে তালিকা প্রস্তুতের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আমি তার দেয়া দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করতে পারিনি। তাইতো তার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে, মুক্তিযোদ্ধা কামরুজ্জামান ননী ভাইয়ের সক্রিয় সহযোগিতায় এ বাহিনীর তালিকা সরকারি গেজেটভুক্ত করতে পেরেছিলাম; যার ফলশ্রুতিতে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন বিশেষ গেরিলা বাহিনী জাতীয় স্বীকৃতি লাভ করেছে। একই সাথে প্রায় আড়াই হাজার মুক্তিযোদ্ধা জাতীয় তালিকাভুক্ত হয়ে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি লাভ করেছে। শব্দের গাঁথুনি দিয়ে মোর্শেদ ভাইকে বর্ণনা করা অন্তত আমার পক্ষে দুঃসাধ্য। তবুও একটি প্রসঙ্গের অবতারণা না করে পারছি না।

হাজারও কর্মের ভিড়ে পরিবারের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য পালনে মোর্শেদ ভাইয়ের কোন ব্যত্যয় ঘটেছে বলে আমার জানা নেই। তার বিশাল কর্মভুবনের কেন্দ্রে ছিল শেলী ভাবি ও তার দুই কন্যা। তাদের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য পালনে তার জুড়ি মেলা ভার। তাইতো তিনি বিদায়ক্ষণে একজন সফল পিতার পরিচয়ে পরিচিত হতে পেরেছিলেন। এক্ষেত্রে শেলী ভাবি সমান তাল ও লয়ে মোর্শেদ ভাইকে অনুসরণ করেছেন, ছায়ার মতো মোর্শেদ ভাইয়ের সাথে লেগে থেকেছেন। এমনকি পার্টির কঠিন সময়ের কার্যক্রমেও মোর্শেদ ভাইয়ের সাথে শেলী ভাবিকে প্রায়ই দেখা যেত। শেলী ভাবির জন্যই হয়েতো মোর্শেদ ভাই শত প্রতিকূলতার মাঝেও মানুষের মোর্শেদ ভাই হতে পেরেছিলেন। মোর্শেদ ভাই চির ভাস্বর, অমর।

[লেখক : ছাত্র-যুব সংগঠনের সাবেক কর্মী, আইনের ছাত্র]