তাহলে তিস্তায় এতযুগ বরফগলা পানি ছিল না?

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: এপ্রিলের খরতাপে তিস্তানদীর ধু ধু বালুচরে বহুযুগ পরে হঠাৎ পানিপ্রবাহ শুরু হয়েছে। বিষয়টি অনেকটা বিস্ময়কর! গত ৪ এপ্রিল থেকে নিলফামারী জেলার বাইশপুকুর এলাকায় চরের মধ্যে পানিপ্রবাহ দেখা যাচ্ছে। চৈত্রের দাবদাহের মাঝে উত্তরের জেলাগুলোতে ধুলিঝড় হচ্ছে। এ বছর বৃষ্টিছাড়া কালবৈশাখী ছোবল হানছে বারবার। কালবৈশাখী ঝড়ে গাইবান্ধা জেলায় তিস্তা-ব্রহ্মপুত্র বিধৌত এলাকায় মানুষের বসতবাড়ি লন্ডভন্ড হয়ে একদিনে ১২ জনের প্রাণহানির খবর জানা গেছে একই দিনে।

এর দু’-তিনদিন পূর্বে লালমনিরহাটের ডালিয়া ব্যারেজ পয়েন্টে পানিপ্রবাহ ছিল মাত্র এক হাজার আটশত কিউসেক। সেখানকার পানি প্রবাহ পরিমাপক অফিস জানিয়েছে সীমান্তের ওপারের উজান থেকে পানির স্রোত এসে আমাদের মিটারে হঠাৎ ১৫ হাজার কিউসেক পানিপ্রবাহ লক্ষ্য করা গেছে (দৈনিক ইত্তেফাক ০৫.০৪.২০২১)।

দ্রুত নদীতে নৌকা নিয়ে নেমে পড়েছে তীরবর্তী মানুষ। উজানের পানির স্রোতে হঠাৎ বৈরালী মাছ ধরার উৎসবে মেতে উঠেছেন তারা। তবে চরের অনেক বীজতলা ও উঠতি ফসল পানিতে ডুবে গেছে। বহু বছর জুনের আগে নদীতে পানির দেখা মেলেনি। তাই তারা এবছরেও চরের উর্বর জমিতে গ্রীষ্মকালীণ নানা ফসল বুনেছেন।
এপ্রিলে তাপমাত্রা বেড়ে গেলে তিস্তার উৎসমুখে পাহাড়ের পাদদেশে বরফ গলতে শুরু করে। সাধারনত: বরফগলা পানি দিয়ে তিস্তা খরা মৌসুমে প্রাণ ফিরে পায়। এটাই প্রাকৃতিক নিয়ম। এ নদীর শতাব্দীর ইতিহাসে এটাই চলে আসছিল। কিন্তু সিকিম ও জলপাইগুড়ির গাজলডোবাসহ উজানে অনেক ড্যাম ও বাঁধ দিয়ে এর পানিপ্রবাহ একচেটিয়াভাবে আটকিয়ে তারা নিজেরা ব্যবহার শুরু করলে বাংলাদেশের তিস্তা ক্যাচমেন্ট এলাকা শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে চৌটির হয়ে যায়। এর প্রতিবাদে বাংলাদেশের মানুষ সোচ্চার হয়ে উঠলেও বিষয়টি নানা টালবাহনার মাধ্যমে অতিক্রান্ত হতে থাকে।

বিশেষ করে গত কয়েক যুগ ধরে অসংখ্য মিটিং-মিছিল হয়। অনেক আশ্বাস দেয়া হলেও বিশ্বাসের বরফ গলেনি। আন্তর্জাতিক নদী আইন অমান্য করে কালক্ষেপন চলছে। বর্তমানে শোনা যাচ্ছে গত ১০ বছর আগেই তিস্তার পানিবন্টন চুক্তি হয়েছে। কিন্তু সে অনুযায়ী বেশী কিছু প্রকাশিত হয়নি, তথ্য জানা যায়নি, পানিও আসেনি। এটা এখন দু’দেশের বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বলেছেন, “ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মত পার্থক্যের কারণে তিস্তা চুক্তি আটকে আছে। তবে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের পর তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছে ভারত।” ভারতের সাথে পানিসম্পদ বিষয়ক সচিব পর্যায়ের বৈঠকের বিস্তারিত নিয়ে ১৭ মার্চ ২০২১ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান। তিনি আরো বলেন, “২০১৯ সালের আগস্টে বাংলাদেশ-ভারতের সচিব পর্যায়ের বৈঠক হয়েছিল। …এই বৈঠকটি আবার আমাদের গতকাল নয়াদিল্লীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিস্তাসহ আমাদের সবগুলো অভিন্ন নদী নিয়ে আলোচনা হয়েছে। খুব পজিটিভ ও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। ..তাদের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে নির্বাচনের কারণে এই মুহূর্তে কোনো চুক্তি স্বাক্ষর বা পারস্পরিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর তারা করবে না, নির্বাচনের পর তারা করতে সক্ষম হবেন।” (দৈনিক ইত্তেফাক ১৭ .০৩. ২০২১)।

প্রশ্ন হলো- তিস্তা চুক্তি যদি ১০ বছর পূর্বে হয়ে থাকে তবে এখনও কেন নতুন করে চুক্তি করার ব্যাপারে একেকজন একেক কথা বলছেন তা বোধগম্য নয়। তিস্তা ইস্যুর কার্যকরী সমাধান নিয়ে আমাদের দায়িত্বশীলদের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য মানুষকে বিভ্রান্ত ও হতাশ করছে। এর আগে ২০১৭ সালে মমতা ব্যানার্জী বলেছিলেন, ‘তিস্তায় তো পানি নেই-চুক্তি হবে কিভাবে’? তাঁর কথা ছিল তিস্তা নয়- তোরসা, জলঢাকা, মানসাই, ধানসাই ইত্যাদি নদীতে পানি আছে। সেগুলো থেকে বাংলাদেশের জন্য পানি দেয়া যাবে। তিনি বলেছিলেন-বাংলাদেশের তিস্তা চুক্তি নয়, দরকার তো জলের! তবে এসব ক্ষীণ জলধারাকে বর্ষাকালে নদী মনে হলেও এগুলো সারা বছর প্রবাহমান কোন নদী নয়। এসব নদীর কোন অস্তিত্ব বা প্রবাহ কি বাংলাদেশে আছে? তিনি তিস্তা পানি বন্টনের কথা অন্যখাতে নিয়ে গেছেন।

তিস্তা শুধু বৃষ্টিপাত নির্ভর পাহাড়ি ঢলের নদী নয়। বর্ষাকালে অতি বৃষ্টিপাাতের ফলে অতিরিক্ত পানি পাহাড়ি ঢল হয়ে বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত করে দেয়। শীতকাল পেরিয়ে মার্চমাস শুরু হলে এ নদী বরফ গলা পানি নিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে। এইটা ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত ছিল। তাই শুকনো মৌসুমে তিস্তার পানি কে সিকিমে আটকালো বা কে মহানন্দা দিয়ে সরিয়ে নিল? কোথায় গেল? কোথায় যাচ্ছে? কোথায় কে ব্যবহার করছে বা কে কোথায় আটকে রেখে, কে খাচ্ছে? প্রযুক্তির বহুধা ব্যবহারের এ যুগে অনেকেই তা জানেন। এপ্রিলে উপরের বরফ গলা পানিও তিস্তা দিয়ে নেমে আসে। মমতার কথা যে সঠিক নয় তা সবাই স্বীকার করবেন।

প্রশ্ন্ হলো- এপ্রিলের শুরুতে হঠাৎ পানিপ্রবাহ কি অন্যকিছুর ইঙ্গিত দেয়? এতদিন পানিবন্টন নিয়ে মমতা বলেছিলেন মোদির কথা আর মোদি বলছিলেন মমতার একগুঁয়েমী মনোভাবের কথা। বিশেষ করে পশ্চিম বঙ্গে নির্বাচন শুরু হলে ঐ সময় ভারতের প্রানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে আমন্ত্রিত হয়ে ঢাকা সফর করেন। সে সময় তিস্তা ইস্যু হালে পানি পায়নি। সবাই নির্বাচনের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করার কথা বলেছিলেন। প্রথম পর্বের নির্বাচন শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বের নির্বাাচন সামনে। এ সময় হঠাৎ তিস্তায় পানির স্রোত কিছুটা প্রশ্নের উদ্রেক করে।

প্রাকৃতিক কোন বিষয়কে রাজনীতির বলি হতে দেয়া ঠিক নয়। প্রকৃতি চলুক নিজের নিয়মে ও নিয়ন্ত্রণে। মানুষ কেন বাগ্ড়া দেবে তাতে? প্রকৃতি ধ্বংস হলে প্রকারন্তরে মানুষই ক্ষতির সন্মুখিন হবে।

তিস্তার পানিবন্টন সমস্যা নিয়ে শুধু রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুড়ি নয়- চলছে সঠিক তথ্যসংক্রান্ত লুকোচুরি ও মিথ্যাচার। ‘তিস্তায় তো পানি নেই’- এ কথার সত্য-মিথ্যা এবার এপ্রিলের শুরুতে বরফগলা স্রোতের ঢল বাংলাদেশে নেমে এসে প্রমাণ করে দেখিয়েছে। তাই সবাইকে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে সৎ প্রতিবেশী সুলভ আচরণ প্রকাশ করা উচিত। পাশাপাশি সবার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভিতরে সততা ও নৈতিকতার উন্মেষ ঘটানোর জন্য এ ধরনের কুৎসিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। তা না হলে ধর্মের ঢোল একদিন নিজেই বেজে যাবে।

এর আগে উল্লেখ করেছিলাম, চীনের সংগে তিস্তা পুন:র্জীবন ও সংরক্ষণ সংক্রান্ত প্রকল্পের একটি সফল বাস্তবায়ন করতে গেলেও প্রতিবেশী ভারতের বিশেষ সহযোগিতা প্রয়োজন। বাংলাদেশের এই সুবর্ণ সময়ে যদি সেটা আদায় করা না যায় তাহলে আর কখনও এই সমস্যার কার্যকরী সমাধান হবে তা বলাই বাহুল্য। যে বরফগলা পানি ক’দিন আগে তিস্তায় প্রবাহিত হয়ে হঠাৎ বাংলাদেশে ঢুকেছে তা যেন রাজনৈতিক ইচ্ছা-অনিচ্ছার যাঁতাকলে ঘুরে আবার বন্ধ হয়ে না যায় সেদিকে সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টি কামনা করছি।

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।E-mail: fakrul@ru.ac.bd

জেড,আই/ঢাকানিউজ২৪ডটকম।