গৌরীপুরে ১৪জন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের পেনশন প্রাপ্তিতে জটিলতা

গৌরীপুরে ১৪জন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের পেনশন প্রাপ্তিতে জটিলতা
গৌরীপুরে ১৪জন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের পেনশন প্রাপ্তিতে জটিলতা

শফিকুল ইসলাম মিন্টু, গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) থেকে:  ময়মনসিংহের গৌরীপুরের অবসরপ্রাপ্ত ১৪জন শিক্ষক পেনশন, প্রভিডেন্ড ফান্ডের সঞ্চিত অর্থসহ সকল ভাতাদি প্রাপ্তিতে জটিলতার সম্মুখীন হয়েছেন। পেনশন ও ভাতা পাওয়ার জন্য ধর্না দিচ্ছেন অফিসের দ্বারে দ্বারে। দ্রুত পেনশন ও ভাতা পরিশোধের দাবিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকবৃন্দ। দ্রুত সময়ের মধ্যে পেনশন পরিশোধের দাবি জানিয়ে বলেন, হয় পেনশন দেন, নয়তো বিষের বোতল দেন। স্ত্রী-সন্তানদের ভরণপোষণ দিতে পারবো না, তাহলে ওদেরকে নিয়ে বিষ খেয়ে মরে যাই।

পেনশনের দুর্ভোগের বিষয়টি তুলে ধরে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন সহরবানু বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আলী আজগার ফরহাদ, নহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. সিদ্দিকুর রহমান, বৈরাটি আমজত আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুস সালাম, মহিশ^রণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের

অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদার, পুম্বাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল বারি, গড়পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নওয়াব উদ্দিন খান পাঠান, তালেব হোসেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মনিরা আক্তার খাতুন, ভিটেরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক মো. আব্দুল লতিফ, দৌলতাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক আবু হাসান, মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাসিম দৌলতাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক মনোয়ারা ইয়াসমিন, পুম্বাইল দৌলতাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক মো. আবুল হাসেম, লামাপাড়া দৌলতাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক আব্দুল কাদির, হিম্মতনগর দৌলতাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক সাহাব উদ্দিন প্রমুখ।

সহরবানু বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক মো. আলী আজগার ফরহাদ বলেন, প্রভিডেন্ড ফান্ডের টাকা পাননি, পেনশনের টাকার জন্য একবছর ধরে ফাইল হাতে নিয়ে অফিসের বারান্দায় ঘুরছেন। তিনি অসুস্থ্য, ওষুধ কিনতে পারছেন না, স্ত্রী’র চিকিৎসা বন্ধ, সন্তানের খাবারও দিতে পারছেন না। কষ্টের এমন বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তিনি ২০২০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি অবসরে যান।

নহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. সিদ্দিকুর রহমান জানান, তিনি ২০১৯সালের ১৪ সেপ্টেম্বর অবসরে যান। গত বছরের ৬অক্টোবর জেলা অফিসে পেনশন ফাইল নিয়ে গেলে জমা রাখেনি। রাশিয়ায় অধ্যয়নরত সন্তানের খরচ পাঠাতে পারছেন না। ২ ছেলে আর ১ মেয়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত তাদের লেখাপড়ার খরচও দিতে পারছেন না।

সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুস সালাম বলেন, গত বছরের ২০ডিসেম্বর শূন্যহাতে বাড়িতে গিয়েছি। ছেলে-মেয়ে আর স্ত্রীর হাতে ঈদে কাপড়, সুচিকিৎসা ও সন্তানের খরচ দিতে পারছি না। অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল

ওয়াহাব তালুকদার জানান, আমাদের স্ত্রী-সন্তান নিয়ে উপোস থাকছি। কেউ আমাদের খোঁজখরব নিচ্ছে না। ফাইল ঘুরছে, বেতন-ভাতা কিছুই পাচ্ছি না।

মো. আব্দুল বারি বলেন, ২০১৮সালের ৩১ডিসেম্বর পেনশনে গিয়েছি। সন্তানের খরচ দিতে পারছি না, তাই ডিপ্লোমা পড়ুয়া সন্তানের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে। এসময় গড়পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নওয়াব উদ্দিন খান পাঠান বলেন, সারাবছরের জমানো টাকা পাচ্ছি না, পেনশন পাচ্ছি না, তাহলে আমাদের বিষের বোতল দেন। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে খেয়ে একবারে মরে যাই। এই যন্ত্রণা আর সহ্য হয় না।

অবসরপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক মো. আবুল হাসেম বলেন, আমার এক মেয়ে বাংলাদেশ কৃষিবিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত তাকে খরচ দিতে পারছি না। ২০২০সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি অবসরে গেলাম শূন্য হাতে, স্ত্রী আর সন্তানদের সামনে দাঁড়াতে পারছি না। ভিটেরপাড়ের সহকারী শিক্ষক মো. আব্দুল লতিফ বলেন, ৩০ডিসেম্বর অবসরে গিয়েছি। আমার এক ছেলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, অপর ছেলে জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেয়ে মুমিনুন্নেছা সরকারি কলেজে পড়ে। তাদের খরচও দিতে পারছি না। বিনা চিকিৎসায় আমার মৃত্যু হলে এই পেনশনের টাকা দিয়ে কী হবে?

উপজেলা শিক্ষা অফিসার মনিকা পারভীন বলেন, আমরা বিধিমোতাবেক পেনশনারদের দ্রুত ভাতাদি প্রদানের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. শফিউল হক জানান, স্কেল সংক্রান্ত মামলার জটিলতায় পেনশন দেয়া যাচ্ছে না। একজনের ফাইল অনুমোদন করেছিলাম হিসাব রক্ষণ বিভাগ আপত্তি দিয়েছে। তাই বন্ধ ছিলো তবে দ্রæত পেনশন নিষ্পত্তি উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

উপজেলা হিসাব রক্ষণ অফিসার মেঘলাল মন্ডল বলেন, শিক্ষকদের কোন পেনশন ফাইল এ অফিসে আটকা নেই। জেলা শিক্ষা অফিস থেকে অনুমোদন দিচ্ছে না। অনুমোদন দিলে তাদেরকে ২৪ঘন্টার মধ্যে পেনশন ফাইল নিষ্পত্তি করতে আমরা প্রস্তুত।