পুরান ঢাকায় সাকরাইন

সুমন দত্ত :ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে পুরান ঢাকায় উদযাপিত হলো পৌষ সংক্রান্তি। যার অপর নাম সাকরাইন (ঘুড়ি উৎসব)।

পর্বনটি সনাতন ধর্মের অনুসারীদের হলেও এটি এখন পুরান ঢাকার হিন্দু মুসলমান সবার উৎসব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলা ক্যালেন্ডার বিভ্রাটের কারণে কয়েক বছর পর পর হিন্দু ও মুসলমান একই দিনে উৎসবটি পালন করে থাকে। যেটা পহেলা বৈশাখের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।

আসলে হিন্দুরা চন্দ্র সূর্য তিথি ইত্যাদি অনুসারে ধর্ম পালন করে। তাই এরকম বিভক্তি। অন্যদিকে সংস্কার করা শহীদুল্লাহ তকিউল্লাহ বাংলা ক্যালেন্ডারে এসব তিথি ফিতির বালাই নাই। ইংরেজি গ্রেগরি ক্যালেন্ডারের সঙ্গে মিল রেখে বাংলা ক্যালেন্ডার তৈরি করেন। তাই এমনটা হচ্ছে।

পৌষ সংক্রান্তি হয় পৌষ মাসের শেষ দিন। মানে ৩০ তারিখে।

এদিন হিন্দুরা গঙ্গা স্নান করে। পূর্ব পূরুষের উদ্দেশে ভোগ নিবেদন করে। দই চিড়া তিলের নাড়ু ও কদমা দিয়ে সকালের খাবার খায়। ঘরে পূজার ভোগেও একই আইটেম দিয়ে ঠাকুরকে পূজা দেয়। এরপর নাটাই ও ঘুড়ি নিয়ে ছাদে। এই ঘুড়ি উড়ানোতে যোগ দেয় সব বয়সের মানুষ। সব ধর্মের মানুষ।

সারাদিন ঘুড়ি উড়ানো। একজন আরেকজনের ঘুড়িকে কেটে দেওয়া। এর মধ্য দিয়ে দিন পেরিয়ে যায়।

তারপর সন্ধ্যায় শুরু হয় মশাল জ্বালিয়ে সংক্রান্তি সমাপ্তি ঘোষণা। ইদানীং এই সমাপ্তি ঘোষণার ধরনটা পাল্টে গেছে। এখন সন্ধ্যার পর থেকে চলে ডিজে পার্টি। সবাই মিলে বাড়ির ছাদে নাচানাচি। এগুলো আগে ছিল না।

আগে সবাই সংক্রান্তির একদিন আগে, সুতায় মাঞ্জা দিয়ে ঘুড়ি কাটাকাটিতে মনোযোগ ছিল। কে কত শক্ত সুতায় ভালো মাঞ্জা দিতে পারতো, সেটা আগের দিন থেকে যাচাই করা হতো।

মাঞ্জা দিতে ইন্ডিয়ান ব্রান্ডের সুতা গুলো ছিল জনপ্রিয়। অধিকাংশ লোক ইন্ডিয়ান গান ও ইন্ডিয়ান বর্ধমান সুতায় মাঞ্জা দিত। বাংলাদেশি সুতাও ছিল। কর্ণফুলী, সেবক, হাত পাঞ্জা, তিন বন্দুক সুতা গুলো ছিল বাংলাদেশের।

এগুলো দিয়ে কম বাজেটের মাঞ্জা দিত ছেলেরা। ঘুড়িও তখন সস্তা ছিল। বড় ঘুড়ি গুলোর দাম ছিল ৩ থেকে ৫ টা। আর ছোট ঘুড়ি গুলো ছিল ৫০ পয়সা ১টা।

তবে পুরান ঢাকায় ঘুড়িকে ঘুড্ডি বলে। মাঞ্জা হতো আবার দুই ধরনের । টানের মাঞ্জা ও ছোড়ের মাঞ্জা। টানের মাঞ্জা মানে নাটাইতে সুতা টান টান থাকা অবস্থায় ঘুড়িকে কাটা। এজন্য নাটাইকে দ্রুত ঘুরাতে হয়। আর ছোড়ের মাঞ্জা মানে সুতা ছেড়ে অন্যের ঘুড়িকে কাটা। এতে নাটাই থেকে সুতে ছেড়ে ঘুড়ি কেটে দিতে হয়।

সুতার ধার বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হতো কাচের মিহি গুড়া। যাকে চুর বলা হয়। আর সাদা সুতাকে একটি রং, সাবু, শিরিশ ও গরম জলের মিশ্রণে রাখা হয়। যাকে বলা হয় লেদ্দি। একজন সুতাকে লেদ্দিতে ডুবিয়ে রাখে। আরেকজন মাঝ খানে সুতাকে চুরের মধ্যে চাপ দিয়ে ধরে রাখে। অপরজন নাটাইতে সুতায় পেঁচায়। এভাবে মাঞ্জা দেয়া হয়।

এখন আর এসব ঝামেলায় কেউ যেতে যায় না। রেডি চাইনিজ প্লাস্টিকের সুতা বেরিয়ে গেছে। এগুলো দিয়ে এখন ঘুড়ি উড়ানো হয়। আমাদের সময়কার মাঞ্জার যুগ এখন গত প্রায়।

সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণের মেয়র পুরান ঢাকার এই উৎসবকে স্বীকৃতি দিয়ে সরকারিভাবে পালনের উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষে ১০ হাজার ঘুড়ি ৭৫টি ওয়ার্ডে বণ্টন করা হয়েছে।

তাই পৌষ সংক্রান্তি এখন পহেলা বৈশাখের আমেজে উদযাপিত হবে।