সচিবালয়ের চারপাশে শব্দ দূষন নিয়ে গবেষণা বাপার

দূষণে ওপর বক্তব্য রাখছেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা

নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এর বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) এর যৌথ উদ্যোগে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তন, সেগুনবাগিচা, ঢাকায় ক্যাপস পরিচালিত “নীরব এলাকা ঘোষিত সচিবালয়ের চারপাশে তীব্র শব্দ দূষণ”- শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্টিত হয়।

সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এর মাননীয় উপাচার্য স্থপতি অধ্যাপক মুহাম্মাদ আলী নকী এবং অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বাপা’র সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল। এতে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বাপা’র যুগ্ম সম্পাদক এবং স্টামফোর্ড বায়ুমন্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)-এর পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার। এছাড়াও এতে বক্তব্য রাখেন বাপার যুগ্ন-সম্পাদক আলমগীর কবির।

গবেষণার ফলাফল প্রকাশ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, ২০২০ সালের ১৪ ডিসেম্বর থেকে ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৯ দিনে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এর বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) এর ১০ সদস্যের একটি গবেষণা দল সচিবালয়ের আশেপাশের ১২টি স্থানে নীরব এলাকা ঘোষাণার আগে ও নীরব এলাকা ঘোষণার পরে দিনের বিভিন্ন সময়ে শব্দের তীব্রতা নির্ণয় করে। ১২টি স্থানের প্রতিটিতে দিন ব্যাপী ১৮০০ সংখ্যক উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছিলো। সেই হিসাবে ১২টি স্থানে সকাল-দুপুর-বিকালে সর্বমোট প্রায় ১,৯৪,৪০০ সংখ্যক উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছিলো। জরিপ কাজের উদ্দেশ্য ছিল ২০১৯ সালে ডিসেম্বর মাসে নীরব এলাকা ঘোষণা করার আগে এবং পরে শব্দ দূষণের যে পরিবর্তন হয়েছিল তার সাথে ২০২০ সালে ডিসেম্বর মাসের শব্দ দূষণের কোন পরিবর্তন হয়েছে কিনা তার তুলনা করা ।

পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ২০২০ সালে করোনাকালীন সময়ে যানবাহন চলাচলে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণের কারণে সময়ের ব্যাপ্তিতে শব্দদূষণ কিছুটা কমলেও তীব্রতার দিক থেকে শব্দ দূষণ বেড়েছে। অর্থাৎ তীব্রতার ভিত্তিতে সবচেয়ে বেশি শব্দ দূষণ লক্ষ্য করা গেছে পল্টন বাসস্ট্যান্ডে এবং সময়ের ব্যাপ্তিতে সবচেয়ে বেশি শব্দ দূষণ লক্ষ্য করা গেছে কদম ফোয়ারায়। ২০২০ সালে ১৪-২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৯ দিনে ১২ টি স্থানের সবগুলোর মধ্যেই সর্বোচ্চ শব্দের মান পাওয়া গিয়েছে ১২০ ডেসিবেলের উপরে। এদিক থেকে পল্টন বাসস্ট্যান্ডে (১২৯.২ ডেসিবেল) সবচেয়ে বেশী শব্দের মাত্রা পাওয়া যায়। সংগৃহীত উপাথ্যের গড়ের হিসাবে শব্দের সর্বোচ্চ মান পাওয়া গিয়েছে কদম ফোয়ারায় যা ১১৮.৭ ডেসিবেল এবং সবার চেয়ে কম শব্দ রয়েছে সচিবালয়ের পশ্চিম দিকের (মসজিদ) স্থানে (৯৯.৫ ডেসিবেল)। শব্দের সর্বোচ্চ মানের দিক থেকে ২০১৯ এর চেয়ে ২০২০ সালে ৭.৮ শতাংশ দূষণ বেড়েছে।

2019 সালের তুলনায় সর্বোচ্চ মানের দিক থেকে ২০২০ সালে সবকটি স্থানেই শব্দ দূষণ বেড়েছে, তবে শব্দের সর্বোচ্চ মানের ভিত্তিতে দূষণের স্থান ভেদে ক্রম পরিবর্তন হয়েছে । দিনের ব্যবধানে, সকালের তুলনায় দুপুর এবং বিকালের সময়ে গড় শব্দের সর্বোচ্চ মান কিছু বেশী ছিল। ১২টি স্থানের প্রতিটিতে দিনের বেলায় ১০০ ভাগ সময় নীরব এলাকার জন্য প্রযোজ্য মানমাত্রার (৫০ ডেসিবল) চেয়ে প্রায় ২.১ গুন বেশি মাত্রার শব্দ ছিল। ২০২০ সালে সামগ্রিকভাবে বারটি স্থানে ৮৮.৪ শতাংশ সময় ৭০ ডেসিবেল (তীব্রতর) এর বেশি শব্দের মাত্রা ছিল যা ২০১৯ সালের তুলনায় ৩.৫ শতাংশ কম।

যেহেতু করোনা পরিস্থিতে প্রায় ১০ শতাংশ যানবাহন কম (স্কুল কলেজ ও অন্যান শিক্ষা প্রতিষ্টান বন্ধ থাকায়) যেখানে মাত্র ৩.৫ শতাংশ শব্দের মাত্রা কমলেও প্রকৃত হিসাবে শব্দ দূষণ না কমে বরং বেড়েছে। জরিপ পর্যবেক্ষণের অংশ হিসেবে হর্ন গণনার ফলাফল অনুযায়ী “জিরো পয়েন্ট” এলাকায় সবচেয়ে বেশী হর্ন গণনা করা হয় যেখানে ১০ মিনিটে ৩৩২ টি হর্ন বাজাতে দেখা যায়, যার মধ্যে ৭০টি হাইড্রোলিক হর্ন এবং ২৬২টি সাধারণ হর্ন বাজানো হয়।

২০০ ট্রাফিক পুলিশদের শ্রবণ স্বাস্থ্যের উপর প্রশ্নপত্র জরিপের ফলাফলে দেখা যায় যে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের দায়িত্ব পালনরত ৯.৫ ভাগ ট্রাফিক পুলিশের শ্রবণশক্তি হ্রাস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ২৮.৬ ভাগ ট্রাফিক পুলিশ জানান যে, অন্যরা উচ্চস্বরে কথা না বললে তাদের কথা শুনতে কষ্ট হয়, ১৩.৭ ভাগ ট্রাফিক পুলিশের সাধারণভাবে মোবাইলে কথা শুনতে অসুবিধা বোধ করে । তিনি সচিবালয়ের ভিতর ও চারপাশে প্রচুর পরিমান গাছ লাগানোর তাগিদ দিয়েছেন। এছাড়াও সচিবালয়ের দেওয়ালে সাউন্ড প্রুফ প্লাস্টার বোর্ড বসানো যেতে পারে উল্ল্যখ করেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ছাড়া অন্য কাউকে রাস্তায় সাইরেন বাজানোর সহ ভিআইপি প্রটোকল না দিতে অনুরোধ করেন।
সভাপতির বক্তব্যে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এর মাননীয় উপাচার্য স্থপতি অধ্যাপক মুহাম্মাদ আলী নকী বলেন, শব্দ দূষণের মত মারাত্মক ঘাতক থেকে আপামর জনসাধারণকে রক্ষা করতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের শিক্ষক মন্ডলী ও ছাত্র সমাজকে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে হবে। এছাড়াও, তিনি বিশ্ববিদ্যালয় সমূহকে এই ধরণের জাতীয় গণগুরুত্বপূর্ণ গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানান। তিনি আরও বলেন, সরকার এবং জনগণ এর নিকট শব্দদূষণ এর ক্ষতিকর প্রভাবটি তুলে ধরতে পারলে আমাদের এই উদ্দোগ সফল হবে।

বাপার সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল বলেন, শব্দ দূষণ একটি সামাজিক ব্যধি এবং রাষ্ট্রীয় সমস্যা। সর্ব প্রথম সমাজের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শব্দ দূষণ বন্ধের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এছাড়াও তিনি হাইড্রলিক হর্ন ব্যবহার ও এর আমদানী নিষিদ্ধ করণের আইনটি দ্রুত কার্যকর করার জন্য সরকারকে অনুরোধ জানান। তিনি আরও বলেন শব্দ দূষণের কারণে স্বাস্থ্যগত এবং সামাজিক ক্ষতির পরিমান অনেক বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পের চেয়েও বেশী, তাই একে বিশেষগুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বাপার যুগ্ন-সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, শব্দ দূষন এর কারনে মানব জাতি আস্তে আস্তে বধির এবং খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। এই জন্য তিনি সুষ্ট দূষণ মনিটরং এবং এর থেকে পরিত্রান এর জন্য সরকারকে অনুরোধ জানান।

সংবাদ সম্মেলন থেকে শব্দ দূষণের ভয়াবহতা থেকে উত্তরণ এর জন্য ১৯টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়-
1. সচিবালয়ের ভিতর ও চারপাশে প্রচুর পরিমান গাছ লাগাতে হবে।
2. সচিবালয়ের দেওয়ালে সাউন্ড প্রুফ প্লাস্টার বোর্ড বসানো যেতে পারে।
3. বিধিমালা সংজ্ঞা অনুযায়ী চিহ্নিত জোনসমূহে (নীরব, আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প ও মিশ্র) সাইনপোস্ট উপস্থাপন করা।
4. হাইড্রোলিক হর্ণ আমদানি বন্ধ করা, হর্ণ বাজানোর শাস্তি বৃদ্ধি ও চালকদের শব্দ সচেতনতা যাচাই করে লাইসেন্স প্রদান করা।
5. নিরব এলাকা ঘোষণার আগে পর্যাপ্ত গবেষণা এবং প্রচারণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা এবং চালকদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
6. অনুমতি ব্যতীত সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মাইক বাজানো নিষিদ্ধ করা এবং মাইকের শব্দ সীমিত করা।
7. ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য উচ্চতর শব্দের পরিবেশ এড়ানো উচিত।
8. ট্রাফিক পুলিশদের কানের সুরক্ষা সরঞ্জামগুলি (পিপিই) যেমন কান এবং শ্রুতি সুরক্ষার জন্য কানের প্লেগ বা ইয়ারম্যাফ ব্যবহার করা উচিত।
9. নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা।
10. সড়কের পাশে গাছ লাগিয়ে সবুজ বেষ্টনী তৈরি করা।
11. আবাসিক এলাকা সমূহকে বাণিজ্যিক এলাকায় রুপান্তরিত না করা।
12. পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, সিটি কর্পোরেশন, স্থানীয় সরকার এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সহ অন্যান্য প্রশাসনিক দপ্তরের সমন্বয় সাধন করা।
13. শব্দের মাত্রা অনুযায়ী যানবাহনের ছাড়পত্র দেওয়া।
14. গণপরিবহণ ব্যবস্থা উন্নত করার মাধ্যমে ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ।
15. পৃথক বাইসাইকেল লাইন চালু করা।
16. জেনারেটর এবং সকল প্রকার শব্দ সৃষ্টি যন্ত্রপাতির মান মাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া।
17. শব্দের মাত্রা হ্রাসের পদক্ষেপ গ্রহণ ব্যতীত শিল্প-কারখানা স্থাপনে ছাড়পত্র প্রদান না করা।
18. কমিউনিটি ভিত্তিক কমিটি করে শব্দ দূষণ সংক্রান্ত আইন ভঙ্গের বিষয়ে তদারকি দায়িত্ব প্রদান করা।
19. শব্দ দূষণের ক্ষতি, প্রতিকার ও বিদ্যমান আইন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। 

সূত্র: প্রেস বিজ্ঞপ্তি

ঢাকানিউজ২৪ডটকম