লাভ জিহাদ আইন সংবিধান বিরোধী নয়

ভারতের সুপ্রিমকোর্ট

সুমন দত্ত

ভারতে লাভ জিহাদ নামে একটি শব্দ চালু হয়েছে। শব্দটি চালু ছিল অনেকদিন। তবে ইদানীং প্রচার পাচ্ছে বেশি। এর কারণ, বিজেপি শাসিত কয়েকটি রাজ্যে লাভ জিহাদ বিরোধী আইন পাস হয়। এতে বেকায়দায় পড়ে তারা, যারা এসব নোংরামিকে সমর্থন ও উৎসাহিত করত।

ভারতে কিছু রাজনৈতিক দল আছে, যারা ভিন্ন ধর্মে বিবাহকে উৎসাহ দেয়।

এদের মধ্যে অগ্রগণ্য বাম ধারার দলগুলি। ভারতে বাম দলের প্রতিষ্ঠাটা গুরু অবনী মুখার্জি, রাশিয়ান খ্রিস্টান নারী বিয়ে করেন। ফরওয়ার্ড ব্লক প্রতিষ্ঠাটা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস ভিন্ন ধর্মের নারী বিয়ে করেন। নেতাজির পরিবারের অনেকে ভিন্ন ধর্মের নারী বিয়ে করেন।

ভারতীয় কংগ্রেসের নেতা প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জহর লাল নেহেরুর মেয়ে প্রয়াত ইন্দিরা গান্ধি মুসলমানের (অনেকে বলেন পার্সি ছেলে)সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেন। ইন্দিরার ছেলে রাজীব গান্ধি ইতালিয়ান খ্রিস্টান নারী গ্রহণ করেন।

এখনো এ ধরনের বিয়ে চালু আছে। ভিন্ন ধর্মে বিয়ের এরকম বহু উদাহরণ দেয়া যাবে । এখন প্রশ্ন হচ্ছে ভিন্ন ধর্মে বিয়ে মানে কি লাভ জিহাদ?

ভারতের সেকুলাররা প্রচার করে থাকে, ভারতে যারা হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি করে, তারা ভিন্ন ধর্মের বিয়েকে লাভ জিহাদ বলছে।

আসলে তা না। তার বড় প্রমাণ, মুকতার হোসেন নাকভি ও শাহনেওয়াজ হোসেন বিজেপির দুই বড় নেতা। তাদের দুজনের স্ত্রী হিন্দু।

তাহলে তাদের দুজনকে বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদীরা কেন লাভ জিহাদি বলে না?

আসলে বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদীদের দৃষ্টিতে লাভ জিহাদি হচ্ছে তারা, যারা নিজেদের মিথ্যা পরিচয় দিয়ে কিংবা ভয় ভীতি দেখিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের ছেলে কিংবা মেয়েকে বিয়ে করে। তারপর তাদের দিয়ে সন্ত্রাসী কাজে ব্যবহার করে। কিংবা ছেলে অথবা মেয়েটিকে হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করিয়ে ইসলাম অথবা খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করে।

অনেকে বলছেন, ভারতে লাভ জিহাদ বিরোধী আইন থাকা উচিত না। যারা এটা বলছেন, তারা কি তাদের পরিবারের সদস্যদের ভিন্ন ধর্মে বিয়ে করাচ্ছেন? বাস্তবতা হচ্ছে, হিন্দু ছেলের সঙ্গে হিন্দু মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। মুসলিম ছেলের সঙ্গে মুসলিম মেয়ের বিয়ে হচ্ছে।

ভারতে বসবাসকারী বেশিরভাগ পরিবার এটাই অনুসরণ করে। ভিন্ন ধর্মে বিয়ে হচ্ছে, তা খুবই কম। এবং সেটা পরিবারকে না জানিয়ে। তাই লাভ জিহাদ বিরোধী আইন করলে সমাজে কোনো ক্ষতি হবে না। বরং ভালো হবে।

অনেকে বলবেন, এতে ভিন্ন ধর্মে বিয়ে বন্ধ হয়ে যাবে। এটা যারা প্রচার করছেন, তারা ভুল প্রচার করছেন।

ভিন্ন ধর্মে বিয়ে অবশ্যই করা যায়। সেটা বিজেপি সরকার বাতিল করেনি। কিংবা যে রাজ্যগুলোতে লাভ জিহাদ আইন হয়েছে, সেই রাজ্যেও না।

ভারতে স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট আছে। যেই অ্যাক্টে ছেলে ও মেয়ে নিজ নিজ ধর্ম ঠিক রেখে বিয়ে করতে পারে। এতে কেউ কারো ধর্মের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। এই ধরনের বিয়েকে ভারতের হিন্দুত্ববাদীরা লাভ জিহাদ বলছেও না।

তাই নারী পুরুষের বিয়ে করার স্বাধীনতা, লাভ জিহাদ আইন হলে সংবিধান বিরোধী হবে না।

লাভজিহাদ আইন হলে যেটা বন্ধ হবে, সেটা হচ্ছে ধর্মান্তরকরণ। হিন্দু নারীকে বিয়ের মাধ্যমে মুসলমান বানানোর চক্রান্ত বন্ধ হয়ে যাবে। বিয়ে করে হিন্দু নারীকে ইসলামিক জিহাদে আইএসে যোগদান বন্ধ হবে। যা ভারতের কেরালা রাজ্যে হচ্ছে।

মুসলমান পরিচয় গোপন রেখে হিন্দু নারীকে বিয়ে করার ট্রেন্ড উত্তর প্রদেশের মতো অঞ্চলগুলোতে হচ্ছে। সেটা বন্ধ হবে।

লাভ জিহাদ বিরোধী আইন ভারতের সমাজে দরকার। হিন্দু নারীদের ভিন্ন ধর্মের ছেলেদের খপ্পর থেকে রক্ষা করতে এই আইন জরুরী। এই বিশ্বাস থেকে ভারতের বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে লাভ জিহাদ বিরোধী আইন পাস হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, পাকিস্তানে বাবা মায়ের অনুমতি ছাড়া সন্তান বিয়ে করতে পারে না। এই আইন সেই সমাজে আছে। তাতে কি পাকিস্তানের সমাজ ধ্বংস হয়ে গেছে? আসলে বিয়ের জন্য যে বয়সটি আইনে রাখা হয়েছে। সেটা শারীরিক দিক চিন্তা করে। মানসিক দিক চিন্তা করে বিয়ের বয়স নির্ধারণ করা হয়নি। ব্যক্তির শরীরিক ও মানসিক বিকাশ একই সময়ে হয় না।

তাই দেখা যায় পালিয়ে বিয়ে করার ট্রেন্ড ২০ বছরের নিচে নারীদের। আর এই বয়সের নারীদের ব্রেন ওয়াশ ও যৌনসুখ দিয়ে যে কোনো দিকে ধাবিত করানো যায়। এটা বহু ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে। তাই আগামীতে বিয়ের বয়স সংশোধন ও পালিয়ে বিয়ে রোধ করতে পাকিস্তানের মতো আইন থাকা জরুরী।

লেখক: সাংবাদিক তারিখ ৯ জানুয়ারি ২০২১