করোনাকালে শুভ বড়দিন

ড. ফাদার লিটন হিউবার্ট গমেজ, সিএসসি 

যিশুখ্রিষ্ট প্রত্যেক বিশ্বাসীকে তাঁর ভালোবাসা, ত্যাগ স্বীকার ও সেবা কাজ অনুকরণ করে দয়ালু হতে আহ্বান করেন। প্রতিদিনকার জীবনযাপনে বৈচিত্র্যময় কাজে যিশুখ্রিষ্টের আহ্বানে সাড়া দানের সুযোগ রয়েছে। আমাদের কাজসমূহের ভিত্তি ও প্রকাশ তিনটি ঐশগুণের সমন্বয়; এগুলো হলো—বিশ্বাস, আশা ও ভালোবাসা। এই গুণাবলির প্রকাশকে দয়ার কাজ বা দয়াশীলতা বলা হয়। এককভাবে দৈহিক দয়ার কাজে জড়িত হওয়া যায়; যেসব দয়ার কাজ অন্যের বাহ্যিক প্রয়োজন পূরণে সহায়ক যেমন—দরিদ্রদের খাবার, কাপড় ও আশ্রয় দিয়ে সাহায্য করা।

অন্যভাবে আধ্যাত্মিক দয়ার কাজে অংশগ্রহণ করা; যেসব দয়ার কাজ অন্যের মন-হূদয়-আত্মার প্রয়োজন পূরণে সহায়ক যেমন— অসুস্থ, বৃদ্ধ ও বিপদাপন্নদের দেখতে যাওয়া, ফোন করে খোঁজখবর নেওয়া, ভালো পরামর্শ দেওয়া-নেওয়া, কারো দুঃখকষ্টের কথা মনোযোগসহ শোনা—সবই আধ্যাত্মিক দয়ার কাজ। যা কেবল সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে, প্রতিবেশীর সঙ্গে ও বিশ্বসৃষ্টির সঙ্গে মিলনবন্ধনে আবদ্ধ থাকলেই করতে পারি।

করোনা ভাইরাস থেকে সুরক্ষা পেতে অবরুদ্ধ সময়ে বাধ্য হয়ে মানবিক কর্মব্যস্ততা থেকে বিরতি নিয়ে ধ্যানময় বিশ্রামে কিছু সময় কাটাতে সুযোগ পেয়েছি। এই অবরুদ্ধ সময় মানুষ হিসেবে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ দিকটি চেতনায় আনতে সুযোগ দিয়েছে তা হলো—আমাদের জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত ও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের উচিত একে অন্যকে সহায়তা করা, বিশেষত যারা বৃদ্ধ, অসুস্থ ও বিপদাপন্ন। নিজেরা অতিভোগ ও অতিউত্পাদনে ব্যস্ত থাকলে সৃষ্টির আর্তনাদ ও দরিদ্র-বিপদাপন্নদের আর্তনাদের জন্য দায়ী থাকব।

আমরা যদি আমাদের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান না হই তাহলে আমাদের আরো বড় রকম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে মারাত্মকভাবে অসুস্থ হতে হবে। এই অবরুদ্ধ সময় আমাদের ভাবতে সুযোগ দিয়েছে–আমরা অতিভোগ ও অতি উত্পাদনে ব্যস্ত হয়ে বিশ্বসৃষ্টিকে ক্ষতবিক্ষত করেছি। জীবনের এই কঠিন সময়ে বুঝতে শিখেছি যে, আমাদের অতি দরকারী বিষয়সমূহ হলো আমাদের নিত্য ব্যবহার্যসামগ্রী যেমন—খাদ্য, জল, ওষুধ অথচ বিলাসিতার জন্য আমরা কখনো কখনো মরিয়া হয়ে ছুটে চলছি। এই অবরুদ্ধ সময় আমাদের ভাবতে সুযোগ দিয়েছে—পরিবার ও পারিবারিক জীবন আমাদের জন্য কতটা মূল্যবান অথচ এটিকে আমরা কতটা অবহেলা করে থাকি। করোনা ভাইরাস আমাদের নিজ ঘরে অবরুদ্ধ করছে এবং বুঝেছি পরিবারই আশ্রয়স্থল। আমরা পরিবারকে গুরুত্ব দিচ্ছি এবং আপনজনের সঙ্গেই আছি।

করোনা ভাইরাসের এই অবরুদ্ধ সময় বড়দিন আমাদের জীবনটা শুধুই সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে, প্রতিবেশীর সঙ্গে ও বিশ্বসৃষ্টির সঙ্গে আনন্দোত্সব এবং বিশ্রাম উদ্যাপন করতে সুযোগ দেয়। তাতে আমাদের ক্ষতবিক্ষত অন্তরের পরিবেশ, মানব পরিবেশ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ নিরাময় হতে পারে। বড়দিন আনন্দোত্সব ও বিশ্রাম উদ্যাপনকে অনুত্পাদনশীল ও নিষ্প্রয়োজন নিষ্ক্রিয়তা বা কর্মহীনতার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও স্বতন্ত্র মনে করতে অনুপ্রেরণা দেয়। যা অন্য রকমভাবে আমাদের অন্তরে কাজ করে, আমাদেরকে প্রজ্ঞার দৃষ্টি দিয়ে জগেক দেখার শক্তি দেয়। যা আমাদের সত্তারই নবায়ন, যা আমাদের জীবনের রূপান্তর। যা প্রতিটি মানুষকে আশা, শান্তি, আনন্দ ও ভালোবাসার পথে চলতে প্রেরণা দেয়।

আসুন, বড়দিনে আনন্দোত্সব ও বিশ্রাম উদ্যাপন করি এবং সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে, প্রতিবেশীর সঙ্গে ও ধরিত্রীর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নিরাময় হতে দিই।—শুভ বড়দিন।

লেখক :খ্রিষ্ট ধর্মের প্রচারক