আধুনিকায়নের নামে টিএসসি ভবন ভাঙা যাবে না

নিউজ ডেস্ক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ভবন ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে কর্তৃপক্ষ। ইতিমধ্যেই কাজ শুরু হয়েছে। এমন সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সালমান সিদ্দিকী ও সাধারণ সম্পাদক প্রগতি বর্মণ তমা।

যুক্ত বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, “সংস্কৃতিগত ও স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে আলাদা ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির। ১৯৬০ এর দশকে বিখ্যাত গ্রিক স্থপতি কনস্ট্যান্টিন ডক্সিয়াডেসের নকশায় বর্তমান টিএসসি ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল। এটি আধুনিক মানববান্ধব স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। কারণ বিশ শতকের প্রথমার্ধে বহুল প্রচলিত নান্দনিকতাহীন ও কৃত্রিম স্থাপত্যশৈলীর বদলে ডক্সিয়াডেস নির্মাণ করেছিলেন স্থানীয় আঙ্গিকের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এক অনন্য স্থাপত্য। স্থানীয় উষ্ণ আবহাওয়ার বিষয় মাথায় রেখে ভবনে দ্বৈতছাদ তৈরী করা হয়েছিল যাতে দুই ছাদের মাঝখান থেকে ঠান্ডা বাতাস প্রবাহিত হতে পারে। বর্ষাকালে যাতে পানি না জমতে পারে সেজন্য ছাদেই পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। মূল বিষয় হলো টিএসসি দেখলে মনে হবে এটি একটি সজীব প্রাণবন্ত ছোট শহর।

তাছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে টিএসসির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা টিএসসিতে জড়ো হয়েই মিছিল-সমাবেশে অংশগ্রহণ করতো। নববর্ষ, ভাষা আন্দোলন দিবস ইত্যাদি টিএসসিতেই পালন করা হতো। এছাড়া বর্তমানের শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিনিময় ও মিথস্ক্রিয়ার কেন্দ্রস্থল হল টিএসসি। শুধু এ বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বাস্তবে ঢাকার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চর্চার অন্যতম কেন্দ্রস্থল হলো এই টিএসসি।

কিন্তু প্রশাসন এরূপ ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও শৈল্পিক তাৎপর্য উপেক্ষা করে টিএসসি ভবন ভেঙে ‘আধুনিক’ বহুতল ভবন নির্মাণ করতে চাচ্ছে। যেখানে পৃথিবীর নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিবেকবান প্রশাসন তাদের ঐতিহ্যবাহী নিদর্শনগুলো সর্বাধিক যত্নে সংরক্ষণ করছে, সেখানে আমাদের নির্বোধ প্রশাসন তুচ্ছ উন্নয়নের অজুহাতে ধ্বংসাত্মক প্রকল্প হাতে নিচ্ছে। মূলত তারা মতবিনিময় ও সংস্কৃতি চর্চার স্থান সংকুচিত করতে চাচ্ছে। আমরা দেখেছি যে সারা দেশে জনসমাগমের স্থলগুলো সরকার ও পুলিশ নিয়ন্ত্রণ করতে চাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় আমরা দেখতে পাচ্ছি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে মেট্রোরেল নিয়ে শাহবাগ ও টিএসসি এলাকার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সমাগম স্থল সংকুচিত করে দেওয়া হয়েছে। কারণ স্বৈরাচারী সরকার ও প্রশাসন কখনোই সংঘবদ্ধ মানুষ পছন্দ করে না। তারা মানুষদের বিচ্ছিন্ন করে রাখতে চায়। তাই যেসব জায়গায় লোকজন একত্রিত হয়, ঐক্যবদ্ধ হয়, সেসব জায়গার নিয়ন্ত্রণ রাখা জরুরী তাদের জন্য।”

নেতৃবৃন্দ আরো বলেন “এই প্রকল্প সরাসরী প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গ্রহণ করা হয়েছে। ২ই সেপ্টেম্বর এক ভার্চুয়াল সভায় প্রধানমন্ত্রী জানান তিনি টিএসসি ভবনকে আধুনিক ভবন হিসেবে ‘দেখতে চান’। কিন্তু একটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম কখনোই প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর নির্ভর করতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মতামত ও চাহিদা অনুসারেই প্রশাসন পদক্ষেপ নিবে। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রশাসনের মদদে এভাবেই সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জন করা স্বায়ত্তশাসন ধূলিসাৎ করা হচ্ছে।

আপাত অর্থে উন্নয়নমূলক এসব কাজের পেছনে প্রশাসন-সরকারের দুরভিসন্ধি থাকে। আমরা আশঙ্কা করছি, এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে টিএসসির সাংস্কৃতিক পরিবেশকে নষ্ট করা হবে। এক ধরনের ‘কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা’ তৈরি করে চিন্তা চর্চা ও মতবিনিময়ের পরিবেশ নষ্ট করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন স্থাপনগুলো আগের যে কোন স্থাপনার চেয়ে আরও বেশি বাণিজ্যিক ও কর্পোরেট হয়ে পড়ছে। এর অনেক উদাহরণ দেওয়া সম্ভব। তাই আধুনিকায়নের নামে মূলত মুক্ত চিন্তা চর্চার ওপর আঘাত আসবে ও টিএসসি আরও বেশি বাণিজ্যিক হয়ে পড়বে, তা সহজেই অনুমেয়।”

ঢাকানিউজ২৪ডটকম