এবারের বিজয় দিবস এবং তারপর

লতিফুল বারী হামিম

বুদ্ধিজীবী স্মৃতি সৌধ থেকে ফিরে বারবার মনে হচ্ছিল মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয় দিবস উপলক্ষে একটি ভাল বই পড়ব।কিন্তু কি বই পড়ব তা ঠিক করতে পারছিলাম না।

হঠাত বাসার আলমারিতে চোখে পড়ল বিখ্যাত প্রাবন্ধিক, কবি ও কলামিষ্ট আহমদ রফিক সাহেবের অনিন্দ্য প্রকাশ থেকে প্রকাশিত ‘ ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো ‘ বইটি র উপর। লুফে নিলাম আবার চোখ বুলাতে থাকলাম। আর বার বার মনে হচ্ছিল বাঙ্গালী জাতি কারো কাছে মাখা নত করতে জানে না ।এরা বিজয়ী জাতি।

১৯৭১ সালের ২৫মার্চ নিরস্র বাঙ্গালী জাতির উপর হামলা চালিয়ে ঢাকা শহরসহ সারাদেশে হাজার হাজার ছাত্র জনতাকে নির্বিচারে হত্যা করে। আত্ব রক্ষায় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে নিরস্র মানুষ আশ্রয় নিতে থাক। পূর্ব ঘোষনা অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহনের জন্য আশ্রয় কেন্দ্রর পাশাপাশি ট্রেনিং ক্যাম্প গড়ে তোলার হয়। প্রবাসী সরকার শপথ গ্রহন করে। চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের বিরুদ্ধে ছাত্র জনতা সংগঠিত হতে থাকে । শুরু হয় গেরিলা ও প্রতিরোধ যুদ্ধ। বন্ধু প্রতিম বিভিন্ন দেশের রার্জনৈতিক ও কুটনৈতিক সমর্থন ও সহায়তা ও সশস্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্টের জন্ম হয় ।

বইটিতে লেখক আহমদ রফিক সাহেব যুদ্ধকালিন দীর্ঘ নয় মাসের লোমহর্সক, ভয়াল অনেক গুলি উল্লেখ যোগ্য ঘটনা তোলে ধেরেছেন। পাক সেনা ও তাদের দোসররা ভয়, ত্রাস, চাপা আতংক ও সন্ত্রাসের শ্বাস রোদ্ধকর পরিবেশ চাপিয়ে দিয়েছিল। তখনকার রাতগুলি ছিল অনিশ্চয়তার আর দিনগুলি ছিলো শংকার। প্রতিদিনকার হত্যা, পাশবিকতা, নিপিড়ন, নিযাতনের পাশাপাশি প্রতিবাদ, প্রতিরোধ আর অবরোদ্ধ মানুষের হাসি কান্না ও সম্ভাবনার কথা লিপিবদ্ধ হয়েছে লেখকের খুরধার লেখনিতে। দেশের মানুযের প্রতি তার ভালবাসা ও দায়িত্ববোধও প্রকাশ পেয়েছে তার লিখনীতে। বই এর আকার খুদ্র হলেও এটি গৌরব উজ্জল ইতিহাসের অংশ।

বিজয়ের ৫০ বছর পরও পরাজিত সে গোষ্ঠি তৎপর। বালাদেশ ও দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি তাদের বিদ্যেসের শেষ নাই। সাহিত্য সংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রতিদিন বিষোগার করছে । জাতির পিতার ভাস্কর্য ভাংছে। তাই দেশ, দেশের মানুষ, আমাদের লড়াই সংগ্রহের ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে আরো বেশী বেশী জানতে হবে।রাষ্ট্রের সর্বত্র গনতান্ত্রিক রিতি নীতি প্রচলন করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা । শোষনমুক্ত সমাজ তথা কল্যাণমুখী সমাজ বির্নিমানে কাজ করতে হবে।

বিখ্যাত এ বইটি সংগ্রহের পেছনের একটি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই।বছর খানে আগে প্রথম আলো পত্রিকার সম্পাদক, আমার প্রিয় শ্রদ্ধাভাজন সাংবাদিক ও অভিভাবক জনাব মতিউর রহমান সাহেবের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। বেশকিছুক্ষন কথাবার্তার শেষে নাস্তা খাওয়ার পর বিদায় নেওয়ার সময় তিনি বললেন দেখ কোন বইটা তোমার পছন্দ হয়। নিয়ে যাও।টেবিলে উপর এক পাশে মতিউর রহমান সাহেবের লেখা বই আর এক পাশে প্রিয় লেখকদের সংগৃহিত বই।

আমি টেবিল থেকে মতি ভাই এর লেখা ‘ কার রাজনীতি কিসের রাজনীতি ‘ এবং আহমদ রফিক এর ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো বই দুটি হাতে নিলে। তিনি হেসে বললেন তোমার পছন্দ চমৎকার ও প্রশংসনীয়।

প্রথম আলো পত্রিকায় শুরু থেকে দীর্ঘ ১২ বছর মতি ভাই এর একত্রে কাজ করেছি । ঘন্টার পর ঘন্টা মিটিং করেছি, আলোচনা করেছি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে । কত স্মৃতি ।তারপরও সে দিনের স্মৃতি আজো মনে পড়ে। মনে পড়ে নিজের পছন্দের সাথে অন্যের পছন্দ মিলিয়ে আনন্দ নেয়ার অবিস্বরনীয় ঘটনা।

বিজয়ের ৫০ উৎযাপনের প্রাককালে আহমদ রফিক ও মতিউর রহমানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জানাই। সকলকে জন্য শুভেচ্ছা ও শুভকামনা রইল ।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক , তারিখ-১৯ ডিসেম্বর ২০২০