সামন্তবাদের অবশেষকে শেষ করুন – মুস্তাফা হুসেন

সামন্তবাদের অবশেষকে শেষ করুন – মুস্তাফা হুসেন
গত ২৩-০৮-২০০০ তারিখ বুধবার বিকাল সারে পাঁচটা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টি এসসি সেমিনার কক্ষে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন: অতীত পর্যালোচনা ও ভবিষৎ সম্ভাবনা বিষয়ে আলোচনা হয়। নেহাল খীলশ আলোচনার সূত্রপাত করেন। বশীর আল হেলাল, বদরুদ্দীন উমর, খালেকুজ্জামান,মোজাহিদুল ইসলাম সেলিম,হায়দার আকবার খান রনো, দিলীপ বড়ুয়া, নাট্যকার মামুনুর রশীদ প্রমুখ আলোচনা করেন।
আলোচনায় সকলেই সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের অতীত পর্যালোচনা করেন। কেউ কেউ ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন। কিন্তু কেউই সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রাথমিক অঙ্গিকার ও করনীয় অর্থাৎ গনতান্ত্রিক বিপ্লব তথা ভুমি মালিকানার সমস্যার সমাধান সম্পর্কে কোন কথা বলেননি।
যদিও কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেদহারের শেষাংশে বলা আছে,< সংক্ষেপে,কমিউনিস্টরা সর্বত্রই বিদ্যমান সমাজিক এবং রাজনীতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিটি বৈপ্লবিক আন্দোলন সমর্থন করে। এই সমস্ত আন্দোলনেই তারা প্রত্যেকটির প্রধান প্রশ্ন হিসাবে সামনে এনে ধরে মালিকানার প্রশ্ন, মালিকানার বিকাশের মাত্রাতখন যা-ই থাকনা কেন। শেষ কথা, সকল দেশের গনতন্ত্রী পাটিগুলির মধ্যে সম্মিলন আর বোঝাপড়ার জন্য তারা সর্বত্র কাজ করে। > এই বোঝাপড়া অবশ্য ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিকানাছাড়া দেওয়ার প্রশ্নে বোঝাপড়া নয়। এই বোঝাপড়া গনতান্ত্রিক আন্দোলন এগিয়ে নেয়ার কৌশল নিয়ে সাময়িক বোঝাপড়া। পাতিসামন্তবাদী পরনির্ভরশীল লুটের ধনিক শাসকগোষ্ঠীর কোন নেত্রী ডাক দেওয়ার সাথে সাথে বুকের বাম পাশের পাঁজরে যদি চিন চিন ব্যথা অনুভুত হয়,অথচ সাভারে ই পি জেড এর শ্রমিক হত্যার পরে নানা ঝামেলায় আন্দোলনের সিদ্ধান্ত েিত দেনী হয় তাহলে বুঝতে হবে পাটিগুলোর নেতৃত্বে আপোষমুখিতার ঝোঁক শতকরা সত্তুরভাগই প্রবল। এদের সম্পর্ক সাবধান হওয়া প্রয়োজন।
আঠারো শতকের শেষ দিকে এদেশে শ্রমিক আন্দোলন গড়ে উঠে ও উনিশ শতকের প্রথম দিকে সমাজতান্ত্রিক চিন্তাভাবনার চর্চা জোরদার হয়ে উঠে। বিশেষ দশকে কমিউনিস্ট পাটি প্রতিষ্ঠিত হলেও বিশ ব বিশেষ দশকে কমিউনিস্ট পাটি প্রতিষ্ঠিত হলেও বিশ বছরের প্রান্তসীমায়তার নেতৃত্বের অবস্থানে শ্রমিক শ্রেণীর শক্তি সমাবেশ কতটুকু ঘটেছিল তা প্রশ্নসাপেক্ষ। যদিও কমরেড মোজাফফর আহমদ,কমরেড আবদুল হালিম,কমরেড ধরনী গোস্বমী,কমরেড সামসুল হুদা ও অন্যান্যরা শ্রমজীবি হিসানে কাজ শুরু করন এবং শ্রমজীবিদের মধ্যেই কমিউনিস্ট পাটি গড়ে তোলার প্রক্রিয়া এবং বাংলার শ্রমিক ও কৃষক পাটিদল গঠনের ভেতর দিয়েই কাজ শুরু করেন। ত্রিশের দশক থেকেই বাংলার পাতি-সামন্ত-শ্রেণী-মিশ্রিত-পাতি-ধনিক শ্রেণী থেকে আগত বুদ্ধিজীবিরাকমিউনিস্ট পাটিতেব্যাপক অনুপ্রবেশ করে এবং নেতৃত্বের পর্যায়ে অভস্থান গ্রহন করে। কিন্তু শ্রমিক ও চাষী শ্রেণী থেকে আগত কমরেডদেরকে সাধারন শিক্ষাসহ রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার বিশেষ কোন ব্যবস্থা নেয়নি যেটা ছিল তাদের কমিউনিস্ট পাটিতে অন্তর্ভুক্তহওয়ার মুল শর্তাধীন দায়ীত্ব। ১৯৪০ সনে ফজলুল হক মন্ত্রীসভা কর্তৃক নিয়োজিত সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশের আমলা মি: ফ্লাউড কমিশন এর সুপারিশছিল জমিদারি হস সকল মধ্যস্বত্বব্যবস্থা বিলোপের। ১৯৪৭ সনে বাংলা ভাগের পুর্বেই প্রাদেশিক আইন পরিষদে জমিদারি উচেছদের আইন পাশ হয়। তেভাগা আন্দোলন স্থানে রুপ নেয়ার পরিবেশ থাকা সত্বেও ভুমি ব্যবস্থায় সকল রকম মধ্যস্বত ব্যবস্থা বিলোপের জন্য গন অভ্যুথানের কেউ ডাক দেয়নি।

দায়িত্বটা ছিল শ্র্রমিক শ্রেণীর পাটি তথা কমিউনিস্ট পাটির। তারা সাম্প্রদায়িক সামন্ত ধনিক শ্রেণির রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেন নিকট আত্ম সমর্পনকরে। কিন্তু তাতে হন্দি ুমাঝারি ও ধনী কৃষক,জোতদা,ক্ষুদ্র-মাঝারি ব্যবসায়ি,কুটির শিল্পীও অন্যান্য পেশাজীবিদেরকে রক্ষা করা যায়নি। হায়দার আকবর খান রনো বলেন প্রায় পনের হাজার কমিউনিস্ট পুর্ব বাংলা ছেড়ে চলে যায়। পরবর্তীতে তাদের ধনসম্পত্তি রক্ষা করা যায়নি। জোতদার জমিদার এর জমি দখলের ডাক দিলে মুসলিম জমিদার জোতদাররা এ থেকে বাদ যেতনা। কমিউনিস্ট নেতৃত্ব ভুল করেছিল। তারা প্রকাশ্যে জমিদখল আন্দোলনের তথা জোতদারি ব্যবস্থা অবসানের দাবী জানায়নি বা ঘোষনা দেয়নি। কমিউনিস্ট ইশতেহার-এ বলা হয়েছে < নিজেদের মতামত আর লক্ষ্য গোপন রাখতে কমিউনিস্টরা ঘৃণাবোধ করে। > বাংলার কমিউনিস্ট নেতৃত্ত চাষীর জমির আকাংখাকে চাপা দিয়ে রেখেছিল। ১৯৫০ এর জমিদারী ব্যবস্থা অধিগ্রহনের পর জোতদার ধনী কৃষকরা ক্ষমতাশালী হয়ে উঠে। বদরুদ্দিন উমর বলেন ১৯৭২ এর পর তারা আরও ক্ষমতাশালী হয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রের/সেক্টরের সম্পত্তির মালীকানা দখল করার জন্য এবং ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান নেয়ার জন্য উম্মত হয়ে উঠে।
২৪ তারিখের আলোচনায় এমএম আকাশ উন্নত ধনতান্ত্রিক দেশে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নয়নের মাধ্যমে পুঁজিবাদের সুউচ্চ বিকাশ সত্বেও পুঁজিবাদ সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের কাছে পরাজিত হবে বলে জানান। মহসিন শস্ত্রপাণি ক্রষি বিপ্লবেরকথা বলেন। ডা: টি আলি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অনোপার্জিত মূল্য ও কৃষি অর্থনীতিতে উদ্বৃত্ত মুল্য সৃষ্টির কথা বলেন। আনু মুহাম্মদ কৃষি বিপ্লবের গুরুত্বকে নাকচ করে দেন। তিনি আগামী সেপ্টেম্বর মাসের ৮,৯ ও ২৬ তারিখে সারা বিশ্বব্যাপি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তেল ও গ্যাস সংক্রান্ত জাতীয় স্বার্থে বিক্ষোভ মিছিলে শরীক হওয়ার জন্য সকলকে আহবান জানান। তবে তিনি গত পাঁচই আগষ্ট তারিখে বিসিআইসি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের সভায় মাফিয়া নেতৃত্ত চক্রকে পর্যদুস্ত করে বেসিক ইউনিয়ন গুলোর সাধারন শ্রমিকদের দাবি অনুযায়ি সেপ্টেম্বর ১১ও১২ তারিখে সাথারন ধর্মঘাটের আহ্বান এর কথা সভাকে অবহিত করেননি। কোন পার্টির কোন নেতাই করেননি। আনু মুহম্মদ বলেননি কৃষকে ও শ্রমিকগন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিলে অংশগ্রহন করবেনবি না। হাসান ফকরি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে জনাব নেহাল করিমের প্রবন্ধে ১১ দলের বিরুদ্ধে বক্তব্য থাকায় তাকে তার প্রবন্ধের প্রথমাংশের বেশিটুকু বাদ দিয়ে শেষাংশের সামান্যকিছু পড়তে দেয়া হয়েছিল। সভায় আগত ১১ দলের কতিপয় নেতার পক্ষ থেকে সিপিবির কমরেড সেলিমের আপত্তির কারনেই এট করতে হয়েছিল। তিনি বলেন সমাজতান্ত্রীক বুদ্ধিজীবি সংঘে মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা না থাকলে তা আওয়ামি,বি এন পি ও জামাতি ইত্যাদি নানা নামের বুদ্দিজীবি সংঘের মতাই এর একটি বুদ্ধিজীবি সংঘে পরিনত হবে। আলোচনার বিষয়বস্তু বাংলাদেশ সম্পর্কীয় হলেও অধিকাংশ সেতাই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সাম্রাজ্যবাদের,পুঁজিবাদী বিশ্বায়নও অন্যান্য দেশ সম্পর্কে অনেক কথা বলেন। কিন্তু ভারতবর্ষ বিশেষ করে পশ্চিম বাংলা সম্পর্কে কিছু বলেননি। যগিও পুর্ব বাংলায় সমাজতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী আন্দোলনের বিষয়ে আলোচনায় পশ্চিম বাংলার নামঅনিবার্য্যভাবে এসে যায়। উভয় বাংলায় ব্যক্তিগত সম্পত্তি মালিকানার বিরুদ্ধে আন্দোলন তথা কমিউনিস্ট আন্দোলন অবিচ্ছেদ্য ও অবিচ্ছিন্ন ভাবে জড়িত।

প্রকৃতপক্ষে ব্যক্তিগত সম্পত্তি মালিকানার বিরুদ্ধে বা তার ব্যবস্থার সরল ও সুস্পষ্ট ভাষায় কেউ কোন বক্তব্য রাখেননি। শ্রমিক শ্রেনীর পাটির দাবদারেরা বেসরকারী কলকারখানার সত্তুর লক্ষ শ্রমিকের অমানবিক ও হিংস্র নির্যাতনের বিরুদ্ধে কোন বক্তব্য রাখেননি। যদি ও ডাসক্যাপিটাল এর সাময়িক অপ্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে পুঁজিবাদী বিশ্বের প্রগতিশীল তাত্বিকরা যে আলোচনা করেছেন তারা কথা কৌতুককর ভাবে উল্লেখ করেছেন। আমরা আমাদের বক্তব্য হাজির করি এই ভাবে: < অর্থশাস্ত্রের বিষয়বস্তু এমনই ধরনের যা যুদ্দক্ষেত্রে শক্র হিসাবে টেনে নিয়ে আসে মানুষ্য হৃদয়ের হিংস্রতম, জঘন্যতম ও ক্রুরতম প্রবৃত্তি অর্থাৎ ব্যক্তিগত স্বার্থের প্রকোপ কে। যেমন,ইংল্যান্ডের প্রতিষ্ঠিত গির্জা তার ৩৯ দফা অনুশাসনের ৩৮ দফার উপর যত আক্রমন হোক তা যত সহজে ক্ষমা করে,তার আয়ের ৩৯ ভাগের ১ ভাগের ওপর আক্রমন হলে তা সহজে ক্ষমা করেনা। আজকাল বিদ্যমান মালিকানা সম্পর্কের সমালোচনার তুলনায় নাস্তিকতাতো লঘু অপরাধ। >
তাই বৈজ্ঞানিক কমিউনিজম নিয়ে যত তাত্বিক আলোচনাই হোকনা কেন….বাংলাদেশের ভুমি ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠানের জন্য আন্দোলন গড়ে তোলা উচিত।
তারিখ- ২৬/০৮/২০০০

সাইফ শোভন, ঢাকা নিউজ২৪.কম