বাংলাদেশ ফতোয়া আইনের প্রয়োগ – মুস্তাফা হুসেন

বাংলাদেশ ফতোয়া আইনের প্রয়োগ – মুস্তাফা হুসেন
ফাতোয়াকোন আইন নয়। ‘যদিও ফতোয়া জারী’ নামক শব্দ দুটি বাংলা আঞ্চলে অতীত ও বর্তমান কালে সমাজ ও পারিবারিক জীবনে বহুল ব্যবহৃত। ফতোয়া অর্থ পরামর্শ। ইসলাম ধর্মাবলম্বী অনেকেই এ শব্দকে মতামত,সিদ্ধান্ত ইত্যাদি অর্থ করে খাকেন। ভারতবর্ষে দিল্লীর <সলতানদের বিশেষ প্রিয়পাত্র ও মুখ্য ‘সহযোগীদের বলা হত উলেমা অর্থাৎ সরকারী ধর্ম বিশেষজ্ঞ। সাধারনত এদের একটি নিদিষ্টপাঠক্রম শিক্ষনীয় ছিল। এই পাঠক্রমের অন্তর্গত ছিল মুসলিম শন্ত্রাবিধি,তর্কশাস্ত্র, আরবী বর্ণপরিচয়,তাফসিরহাদীস,কালাম ইত্যাদি মুসলিম ধর্মসাহিত্য।……….. হিন্দুস্তানে মুসলিম সমাজের বিকাশ ধারার বিশেষ অবস্থায় উলেমাদের অসঙ্গত প্রাধান্যলাভ স্বভাবিক ও প্রত্যাশিত ঘটনা। ………. সুলতান আলাউদ্দিনই সর্বপ্রথম এদের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রিত করতে উদ্যোগী হলেন…. তিনিপরিষ্কারভাবে উলেমাদের কাজের সীমা নির্দেশ করে দিলেন এবং এই নির্দেশের সীমার মধ্যেই তাঁদের কার্যকলাপ আবদ্ধ রাখতে বাধ্য করলেন। উলেমাদের কাজের পরিধির মধ্যে পড়ল মামলার বিচার ও বিশুদ্ধ ধর্মীয় ব্যাপারে শালিসি করা। এছাড়া আর কোন ব্যাপারে তাদের হস্তক্ষেপের অধিকার রইল না।

> তাদের দেওয়া ফতোয়া আর আইনি রুপে মর্যাদা পেল না, রাষ্ট্রীয় আইনে অন্যতম সহায়ক উৎস হিসেবে বিবেচিক হলো না। < (আমির খসরুর) সুচিন্তিত অভিমত এইযে কাজীরা (বিচার-বিভাগ নিযুক্ত উলেমারা) ইসলামীয় আইন সম্পর্কেসম্পূর্ন অজ্ঞ ছিল এবং রাজ্যের কোন দায়িত্বপূর্ণ পদেই নিযুক্ত হওয়ার মত প্রয়োজনীয়য যোগ্যতা তাদের ছিলনা।……….. স্বেচ্ছাচারী ও প্রজাপীড়ক সুলতানকে সমর্থন করাই উলেমাদের একমাত্র ধর্ম হয়ে দাড়িয়েছিল। > ডক্টর কুনওয়ার মুহম্মদ আশরাফ (দিল্লি)। > প্রকৃতপক্ষে সুলতানই সমস্ত করায়ত্ত করলেন।> (কু.মু.আ) কালক্রমে রাজকীয় ঐশ্বর্যের ছোঁয়ায় তাঁরা তাদের মূল ধারা থেকে সড়ে দাড়ান। তাদের দুর্ণীতি এমন পর্যায়ে পৌছে যে প্রবাদ বাক্য চালু হয়- কাজীর গরু কেতাবেই আছে, কিন্তু গোয়ালে নেই। মুঘল স¤্রাট আওরঙ্গজেব তৎকালীন আলেম ও উলেমাদের দিয়ে ফতোয়া-ই-আলমগিরি নামক একটি মুসলিম আইনি কোষগ্রন্থ সংকলিত করেন। তখন থেকেই ফতোয়া, স¤্রাজ্যের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব প্রবর্তিত দ্বারা সমর্থিত ও ঘোষিত (জারী) হয়েছে বলে, রাজকীয় আইনের সমমর্যাদা লাভ করে। কিন্তু দিল্লির সুলতান ও বাদশাহগণ কর্তৃক প্রবর্তিত আইন সা¤্রাজ্যের সুদু রতম অঞ্চলে নগন্য গ্রামের সাধারন মানুষের গোষ্ঠী ও সমাজে সরাসরি প্রয়োগ ও কার্যকারী হয়নি। উলেমাগণ সা¤্রাজ্যের সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলনা। বিশেষ করে বাংলা অঞ্চলে প্রধানত পীর দরবেশ ও মসজিদের ইমামগণই ফতোয়া দ্বারা মুসলিম নারী ও পুরুষ সম্পর্কীয় সমস্যাগুলোর সমাধান করতেন। তারা বিদেশীগত রাজশক্তি প্রথমাবস্থায় বিজিত অঞ্চলে নিজ দেশীয় আইন-কানুন বিধি-বিধান কিছুটা রদ বদল করে চালানোর চেষ্টা করে। কালক্রমে রাজ্যশাসনের স্বার্থে স্থানীয়দের জীবনধারার সাথে সংগতিপুর্ণ স্থানীয় ও অ-স্থানীয় আইন ও বিধি বিধান প্রয়োগের চেষ্টা করে। স¤্রাট আকবর ও জাহাঙ্গীর সেরকম একটা সম্বনয়ধর্মী চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাদের প্রয়াসের ধারা টিকে থাকেনি। ইংল্যান্ডের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ও পরবর্তীতে বৃটিশ স¤্রাটের রাজত্ব রাজ্যশাসন ব্যবস্থায় ধর্মনিরেপক্ষতা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্য ও ব্যক্তি স্বার্থপরতার ভিত্তিতে ও দৃষ্টিভঙ্গিতে নতুন আইন সমূহ প্রনয়ন ও প্রয়োগের চেষ্টা করা হয়। এতে পুরাতন সামন্ততান্ত্রিক মূল্যবোধের সাথে ইউরোপীয় ধনতান্ত্রিক মূল্যবোধের সংঘাতের সম্ভাবনা দেখা দেয়।

১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহর পর রাজনৈতিক অংগনে এদেশীয় রাজশক্তি ও সামন্ততান্ত্রিক শক্তি কৃষকদের চ‚ড়ান্তভাবে হেরে যায়। গোঁড় ইসলাম ধর্মীয় আদর্শের দ্বারা উদ্বুদ্ধ সামন্ত তান্ত্রীক শাসনব্যবস্থার নিচের স্তরের জনগোষ্ঠীর একটি অংশ যারা কৃষকদের সাথে সম্পৃক্ত ছিল, তারা বিদেশী সা¤্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সংঘাত ও সংঘর্ষে অংশগ্রহণ করলেও এদেশীয় মুসলিম রাজনৈতিক শক্তির পতনের সাথে সাথে তাদের ও প্রতিরোধ করার নিশ্চিত শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়। পরবর্তীতে দেখা দেয় বিপরীতেমুখী প্রবণতা। অথবা বলঅ যায় তারা তুর্কী মঘল আমলে গড়ে উঠা রাজঅনুগৃহ লাভের দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা অনুপ্রাণীদহয়ে বিদেশী ইংরেজ শক্তির নিকট বশ্যতা স্বীকার কারী ক্ষীয়মাণ মুসলিম সামন্ত শক্তির জী হুজুর এ পরিনত হয়। কিছু কিছু ব্যতিক্রমসত্বেও আলেম উলেমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের ধারাটা এভাবেই সমাজ জীবনে টিকে থাকে। ১৯৪৭ সনে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ইসলামী হুকুমত কায়েমের প্রত্যয়ে তারা রাষ্টীয় ক্ষমতার কাছাকাছি অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ইতোমধ্যে বিগত দুই শত বছরে ভারতবেের্ষর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, ভারত ও পূর্ব বাংলার সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনেরসাথে পূর্বেকার জীবন যাত্রার মৌলিক ও বিশাল ব্যবধান ঘটে যায়। পাকিস্তানে ও পাকিস্তানীদের প্রভাবধীন অঞ্চল পূর্ব বাংলায় ক্ষীযমান সামন্ত ও সামন্তবশেষের শক্তি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাবলয়ে উদীয়মান ধনতান্ত্রিক শক্তির প্রাধান্য মেনে নেয়। (সামরিক বেসামরিক আমলাতন্ত্র দুই ধারারই প্রতিনিধিত্ব করে।) কিন্তু অ-স্থানীয় জিন্নাহর অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটানো ও লিয়াকত আলিকে হত্যা করানোর পর একটিঅ-সমাপ্ত পরিবার থেকে আগত সামরিক কর্মকর্তার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শীর্ষবলয়ে আগমনের মাধ্যমে ধনতান্ত্রিক শক্তির প্রাধান্য জোরদার হয়। সামরিক বাহিনী পাঞ্জাবী ও ক্ষমতালোভী অ-পাঞ্জাবী ভ‚স্বামী ও সামন্ত শ্রেনীকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাবলয়ে গৌন অংশীদার করে নেয়। বিগত কয়েকশ বছরে ভারতবর্ষে পশ্চিমাঞ্চালে জবরদখল, হত্যা, খুন লুন্ঠন এরযে ধারাটা সামরিক বাহিনী লালন করেছিল, অন্তর্লীন হয়ে ও তার ক্ষীন অবশেষ সামরিক বাহিনীর মধ্যে বিরাজ করেছিল। উৎপাদনশীল উদীয়যমান বুর্জোয়াশ্রেনী (যার বেশীর ভাগই ছিল অস্থানীয়) অথবা পরনির্ভরশীল সামন্তশ্রেনী কোনটারই এরা (সামরিক বাহিনী) সঠিক প্রতিনিধিত্ব করেনি। ফলে আপাত দৃষ্টিতে যাই প্রতীয়মান হোক না কেন, ক্ষমতা স্বার্থের বাইরে তারা কখনো কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। সামন্তশ্রেনীর ভাবাদর্শের অনুসঙ্গী ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রতি ও এইশাসক গোষ্ঠীর কোন নমনীয়তা ছিল না। ১৯৫০ সনে লাহোরের শিয়া-সুন্নী দাঙ্গায় এর পরিচয় পাওয়া যায়। বিশ্বের ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতি এদের নমনীয়তা ছিল। তাদের নীতি ছিল অর্থাৎ সা¤্রাজ্যবাদীদের নিকট নমনীয়তার কারন- ক্ষমতার স্বার্থে অস্ত্র ও অর্থের ক্ষমতার সাহায্য নিয়ে ক্ষমতা টিকে থাকা। আফগান্তিানের উদ্বাস্তদের জন্য পাওয়া অর্থ ও অস্ত্র সাহায্যের কিছু অংশ দিয়ে তালিবানি জংলিদের প্রশিক্ষন দিয়ে কাবুল সরকারের পতন ঘটানো হয়। খাদ্যভাবে যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ পাকিস্তানে আশ্রয় নেয়, তখন এক তালিবানি শাসক মোল্লা ওমর দুই হাজার বছরের প্রাচীন বুদ্ধ মূর্তি ধ্বংস করার ফতোয়া জারী করেন।

না আফগানিস্তানের সামন্ত শ্রেনী, না পাকিস্তানের সামন্ত ভ‚স্বামী শ্রেনী, না সৌদি আরবের সামন্ত-ধনতান্ত্রিক রাজশক্তি, অথবা বাংলাদেশের সামন্তবিশেষ-নির্ভর ধর্মীয় গোষ্ঠী কেউই ক্ষুদার্থ আফগানি মানুষের প্রতি বাস্তব ও নৈতিক সমর্থন জানায়নি অথবা সাহায্যের জন্য সোচচার আবেদন জানায়নি। পাকিস্তানিদের সামরিক শাসকচক্র বিপদে পরে যায়। সর্বশেষ তারা আমেরিকার কাছে তালেবানি শাসক-প্রতিনিধিকেই পাঠায় সাহায্যের জন্য। সুতরাং রাষ্ট্র ও সামাজিক গোষ্ঠীর যে অংশ থেকে ফতোয়াবাজরা ক্ষমতা ও শক্তি সঞ্চয়ের আশা পোষন করে তার উৎস ক্রমক্ষীয়মান হতে থাকে।
এরপর আমরা বিবেচনা করতে পারি বাংলাদেশ রাষ্ট্রে ফতোয়া নির্ভর ও ধর্মীয় ব্যবসায়ী হাল-হকিকত বা পরিস্থিতি। ১৯২৯ সনে বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন চালু হয়। উক্ত আইনে শিশু ও নাবালকের সংজ্ঞা ও বয়স নির্ধারন করা হয়। শিশু ও নাবালক বলিতে ঐ ব্যক্তিকে বুঝাইবে যাহার বয়স পুরুষ হইলে আঠার বৎসরের নীচে এবং স্ত্রী হইলে ষোল বৎসরের নীচে হইবে। মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ কোরআন শরীফে নারীর সাবালক প্রাপ্তীর সময়কে তাহার রজস্বলা বা ঋতুবতী হওয়ার সময় থেকে ধরা হয়; সে অনুযায়ী বাংলা অঞ্চলে মেয়েদের সাবালেগ হওয়া বা সাবালক প্রাপ্তীর বয়স ৯ (নয়) থেকে শুরু। বিগত কয়েকশ বছরে দেখা যায়, বাংলার কৃষি প্রধান গ্রামাঞ্চলে একজন পূর্ন বয়স্ক আর্থীক দিক দিয়ে স্বচ্ছল মুসলমান ব্যক্তি দুই থেকে চারটি বিয়ে করে থাকেন। সতের আঠার বছর বয়সে যখন প্রথম বিয়ে করেন তখন স্ত্রীর বয়ষ নয় থেকে তের কি চৌদ্দ। পঞ্চাশের পর আবার বিয়ে করলে স্ত্রীর বয়স অনেত সময়ই তের চৌদ্দ থেকে অনুর্ধ কুড়ি বৎসর পর্যন্ত হয়ে থাকে। আইনটি ১৯২৯ সনের অক্টোবর মাসের এক তারিখে কার্যকর হয়। উক্ত তারিখের পূর্বে বাংলার গ্রামাঞ্চলে শিশু বিবাহের হিড়িক পড়ে যায়। গ্রাম্য অর্ধশিক্ষিত, অশিক্ষিত মোল্লারা ঐ অপ্রাপ্ত বয়স্ক বিয়েতে সমর্থন যোগায়। মুষ্টিময় উলেমারা তাতে অপ্রাপ্ত বয়স্কদের বিয়েতে তা বাধা দেয়ইনি, উল্টো আইনটি কোরআন হাদীসের লংঘন বলে ফতোয়া জারীকরে। উলেমাদের পক্ষে তৎকালীন ভ‚স্বামী জমীদার জোতদার মহাজন শ্রেনীর শতকরা পচাঁনব্বই অংশই ছিল। কিন্তু প্রথমত আইন জারিকার বিদেশি বৃটিশ রাজনৈতিক শক্তি তাদের পক্ষে থাকার প্রশ্নই ছিল না; দ্বিতীয়ত বাংলা অঞ্চলের সামন্তাবশেষের মুসলিম উচ্চ বর্গীয়রা ও ক্ষুদে ধনিক শ্রেনী রাজনৈতিক ক্ষমতাবিহীন ছিল বলে প্রতিরোধ এগিয়ে আসতে পারেনি।(একুশ শতকের শুরুতে উপরোক্ত সামাজিক গোষ্ঠী ও শ্রেনী শ্রেনীগত ভাবই রাজনৈতিক ক্ষমতায় আসীন অর্থাৎ বিভিন্ন প্রকরণ সত্বেও এরাই শাসক ও শোষক গোষ্ঠী বলে দ্ব›েদ্ব লিপ্ত হওয়ার সাহস দেখায়। যদিও তা অভ্যন্তরীণ দ্ব›দ্ব।) তৃতীয়ত শরিয়তি পীর, ইমাম ও মোল্লাদের মৌখিক ওয়াজ নসিহত দ্বারা দীক্ষাপ্রাপ্ত ও আধুনিক শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত মুসলমান কৃষক সমাজ বিগত পৌণে এক শতাব্দী যাবৎ আইনটিকে নিরবে পাশ কাটিয়ে আসছে। ১৯৩৯ সনে ভারতীয় আইন পরিষদ কর্তৃক পাসকৃত আইন অনুযায়ী বিবাহীতা মুসলমান মহিলার বিবাহ বিচ্ছেদের আইন কার্যযকর হয়। বাংলার কৃষক সমাজে এটা বিবি এখতিয়ারী কাবিন আইন বলে পরিচিতি লাভ করে। ভাষাটা উলেমাদের দেওয়া। শব্দগুলোর অর্থ ——স্ত্রীর অধিকারের দলিল। কোরআনে উল্লেখ আছে যে ১) নারীদের উপর পুরুষদের কিছুটা মর্যাদা আছে। ২) সূরা নিসা ৩৪ এ আছে—– রিজালু ক্ব্যাওয়ামুনা আলান নিসায়ী।। অর্থাৎ পুরুষেরা স্ত্রীদের উপর কর্তৃত্ব করবে। মর্যাদার প্রশ্নে এখানে নারীর নি¤œতর অবস্থান সুস্পষ্ট। অথচ ১৯৩৯ এর আইনে বিবাহ বিচ্ছেদের ব্যাপারে স্ত্রীর মতামত ও সিদ্ধান্তের অধিকারকে শ্রেষ্ঠতর করা হয়েছে।

একই সমস্যার দুটি অবস্থার মধ্যে সংঘাত এবং ধর্মগ্রন্থের নির্দেশ ও ব্যাখ্যাকে রাষ্ট্রীয় আইন কর্তৃক এড়িয়ে চলার প্রক্রিয়ায় বাতিল করার যে প্রবনতা পরিলিক্ষিত হয় তা উলেমা গোষ্ঠী কর্তৃক প্রতিাবাদিত হলে ও চ‚ড়ান্ত পরিনামে ফতোয়াদানকারী উলেমাদেরকে নিস্তেজ করে রাখে।
ভারত উপমহাদেশে বাংলার পূর্ব অঞ্চলে ১৯৭২ সনে বাঙ্গালীদের দ্বারা বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর, ২০০১ সনে প্রথম রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সাথে ধর্মীয় গোষ্ঠ, তাদের ধারনা ও নেতৃত্¦ের, সামাজিক আইন, বিধি বিধান ইত্যাদি নিয়ে সরাসরি সংঘাতের সৃষ্টি হয়। এই সংঘাতটামুলত ফতোয়া নিয়ে সৃষ্টি হয়। ফাতোয়া জারী করা হয় তিনটি বিষয়ের উপর। এগুলো হল -১)সম্পত্তি ও তার উত্তরাধিকার,২) নারী পুরুষের সম্পর্ক এবং ৩) ব্যক্তি ও তার পারিপাশ্বীকের সাথে তার সম্পর্কের বিষয়। অর্থৎ একজন ব্যক্তির কোন ধমীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করা না করা কে ভিত্তি করে তার সামাজিক কার্যকলাপের উপর বিধিনিশেধ আরোপ ৪) রক্তজাত সম্পর্কের পরিধিতে বিদ্যমান মানুষদের পারস্পরিক নির্ভশীলতা ও সাহায্যের বিষয়। ইতোপূর্বে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার চৌদ্দ বছর পর সামরিক আইন প্রশাসক আয়ুব খান ১৯৬১ সনে মুসলিম পরিবার আইন অর্ডিন্যন্স জারী করেন। মুসলিম পরিবার আইন অর্ডিন্যন্স তিনটি উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল। একঃ মুসলিম পরিবারে উত্তরাধিকার নির্নয় সম্পর্কীত (পূর্ব থেকে প্রচলিত) আইনের সংস্কার। পূর্বে, পিতামহের জীবিত থাকাকালে পিতার মৃত্যু হলে পৌত্রের উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তিলাভের অধিকার নাকচ হয়ে যেত। কিন্তু ১৯৬১ এর আইনে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে পৌত্র এই অধিকার অর্জন করে। দুইঃ কোন মুসলিম পুরুষ সুন্নত বা বিধি নিষেধ এর তারতম্যর মর্যাদায় দ্বিতীয় মান সমপন্ন অধিকার হিসাবে বিবেচিত অধিকার বলে চার বিবাহ করতে পারতো। ১৯৬১ এর আইন অনুযায়ী দ্বিতীয় বিবাহ করতে গেলে প্রম স্ত্রীর অনুমতি নেয়াকে বাধ্যতামূলক করা হয়। প্রথম স্ত্রীর অস্বকৃতিমূলক অভিযোগের ভিত্তিতে বিবাহকারী পুরুষের শাস্তির বিধান প্রবর্তিত হয়। প্রথমটিতে উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি অর্জনের ব্যাপারে ঐশী বা যাজকীয় বিধানকে ফরমান বা অর্ডিন্যন্স জারীর মধ্যেমে রাজকীয় বা রাষ্ট্রিয় বিধানের অধিনস্থ করা হয় কিংবা বলা হয় ধর্মগ্রন্থের অপরিবর্তনীয়কতাকে চ্যালেঞ্জ করে রাষ্ট্রের নিরংকুশ অধিপত্যকে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

ভারতের মুঘল স¤্রাট আত্তরঙ্গজেব তার ফতোয়ায়ে আলমগিরি তে মুসলিম আইনের যে সঙহিতা সংকলন করান, তার দুই শত বছর পর আধুনিক ইউরোপ থেকে আগত ব্রিটিশ বেনিয়াদের সরকার রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অর্ডিন্যন্স বা ফরমান জারীর মাধ্যমে মুসলমানদের (১) সম্পত্তির প্রশ্ন এবং (২) নারী পুরুষের যৌন সম্পর্কের বিষয়ে ধর্মীয় বিধি বিধানদেরকে ইনফেরিয়র করে রাষ্ট্রীয় বিধি বিধিানের আওতা ও ক্ষমতা সম্প্রসারিত করতে থাকেন। এভাবেই ইউরোপীয় ধারায় ব্যক্তির সম্পত্তি ও নারী পুরুষের সম্পর্কের বৈশিষ্ট্য রাষ্ট্র হস্তক্ষেফ করতে শুরু করে। কিন্তু রাষ্ট্রের এই হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিধায়কগন ফতোয়া জারী করেও সুবিধা করে উঠতে পারেনি। ফতোয়া-ই-আলমগিরি নামক আইন সংহিতা প্রনয়নে দুই শতাব্দী পার হতে না হতেই কোন কোন বিষয় পরিবর্তিত হওয়ার কারনে রাষ্ট্রীয় সরকার আইন জারীকরে, যা মূল মূল প্রশাসনিক কেন্দ্রে অবস্থিত কোর্টগুলি বিচার কার্যে প্রয়োগ করে। উক্ত আইনের এমন একটি হল—–১৮২৭ সালের বোম্বে রেগুলে শন এ্যাক্ট। কিন্তু অত্যন্ত অল্প সংখ্যক কোর্টেই উক্ত আইন বিচার কার্যে ব্যভহার করা হত। ১৯৬১ সালের পারেবারিক আইন অর্ডিন্যান্স কার্যকর করার জন্য গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল অর্থাৎ ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত সালিশী আদালত গঠন করা হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই আইন এর প্রয়োগ খুব কদাচিৎই বাস্তবায়িত হয়। মুঘল আমলের শেষ দিকে ফতোয়া-ই-আলমগিরির মতামত ও সিদ্ধান্ত বাংলার মুসলিম জনসমাজের সংখ্যালঘু উপর তলার অংশে অনুসৃত হলেও নিচুতলার সংখ্যা গরিষ্ঠ অংশে কখনোই অনুসৃত হয়নি অথবা সামান্যই অনুসরন করা হয়েছে। বরং দীর্ঘ দুই শত বছরে বাংলার মুসলিম জনসমাজে যে পরিমান ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার ঘটেছে, ঠিক সে পরিমানেই ইসলাম ধর্মের শিক্ষা ও অনুশাসন মুসলামানের জীবনে চর্চিত ও পালিত হয়েছে। বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্যে করা যায় যে ইংরেজ আমলে রাষ্ট্রীয় আইন ও আইনের শাসন ইত্যাদির প্রতি ইংরেজি/ইউরোপীয়য ধাঁচের শিক্ষায় শিক্ষিত মুসলমান বাংগালীদের অনুসরনের আকাংখা ও আকর্ষন যেমন বাড়ে, তেমনি ১৯৪৭ ও ১৯৫২ তে বাঙ্গালী মুসলমান ও বাঙ্গালীদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও ভাষার অধিকারের মত সাংস্কৃতিক স্বাধীনতর পথ প্রশস্ততর হলে বাঙ্গালী এলিট শ্রেনীর একটি অংশে ইসলামী শিক্ষার প্রসার তেমনি বাড়ে, তেমনি ইসলামি ধর্মানুচরনের প্রতিও প্রবল আগ্রহের সৃষ্টিহয়। অর্থব্যবস্থার সামন্তাবশেষের শক্তি তাদের ক্ষয়িষ্ণু মূল্যবোধকে তাদের পুরনো সম্পত্তি স্বার্থের সাথে টিকিয়ে রাখতে চায়। উল্টোভাবে বলা যায় পুরাতন সম্পত্তি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই পুরাতন ধর্মীয় মূল্যেবোধকে টিকিয়ে রাখতে চায়। সমগ্র ইংরেজ ও পাকিস্তান আমলে ইসলামি শাস্ত্রবিদদের সাথে রাষ্ট্রীয় শক্তির সংঘাত ঘটেনি। অথচ একুশ শতকের প্রারম্ভে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় শক্তির সাথে পুরাতন সম্পত্তি সম্পর্ক অর্থাৎ কেবলমাত্র সামন্তাবশেষনয় সামন্তবাদেরই জীবন দর্শণ বা দৃষ্টি ভঙ্গির প্রশ্নে ইসলামী শাস্ত্রবিদ দের সংঘাত ঘটে যায়।

১৯৬১ সালের পরিবার আইন ফরমানের উল্লেখযোগ্য ও ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য এই যে রাষ্ট্রীয় আইন গভীরতম অংশে কার্যকর করা হলো তার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের অভিপ্রায় ও ক্ষমতা সম্প্রসারনের চেষ্টা করা হয়। সনাতন ইসলামী ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ এর বিরুদ্ধে শোরগোল তোলে। হৈচৈ বাধানোর চেষ্টা করে, কিন্তু সব কিছুই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। সামন্ততান্ত্রিক কেন্দ্রীয় শক্তির প্রতি অনুগত্য অভ্যস্ত ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ সামরিক একনায়কের কাছে নতিস্বীকার করে, পাকিস্তানের বুর্জোয়া ও সামন্ততান্ত্রীক শাষকগোষ্ঠী যেমন বুর্জোয়াদের আধিপত্য মেনে নেয়; একচেটিয়া বর্জোয়াদের একমেবাদ্বিতীয় প্রতিনিধি সামরিক একনায়ক (যার প্রশাসন এর মৌলিক নিতীই হল জোর যার মূলুক তার অর্থাৎ পেশীশক্তি বা অস্তই ক্ষমতার উৎস) এর নিকট আলেম উলেমাদের নেতৃত্ব আত্মসমার্পণ করে। আত্মসমর্পণকারীদের আদর্শ ও দর্শণ হল ধর্ম। এযাবৎকাল চলে আসা নিয়মানুযায়ী সামন্ততান্ত্রীক কর্তৃত্বের নিকট আত্মসমর্পণ করাই যাদের সাধারণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য (কারন সামন্তাতান্ত্রীক উৎপাদন ব্যবস্থার একটি বৈশিষ্ট্য হল বিদেশী রাজশক্তির বিরুদ্ধাচরন করা), তারা একটি বিদেশী ফরমানের নিকট নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়, এটা ভাবলে বিস্ময়ে অবাক হয়ে যেতে হয়। এই আত্মসর্মপণের কারণ কী? কারন হলো বিদেশী বৃটিশ বেনীয়া আর যাই করুক, ভারতীয় সামন্ততন্ত্রের মূলে প্রত্যেক্ষভাবে আঘাত করেনি। বরং তার অস্তিত্বকে আঘাত না করে তাদের নিজেদের সা¤্রাজ্যবাদী লুন্ঠন নিরকুংশ করার স্বার্থে বিভিন্ন অঞ্চলের সামন্ত প্রভুদের সাথে যেমন কুটকৌশল বন্ধুত্বের (ম্যানুভারিং) খেলা খেলে, তেমন লুন্ঠন প্রক্রিয়ায় সাথে নিয়ে নেয় স্থানীয় উঠতি বুর্জোয়াদের প্রতিনিধিবৃন্দকে। মুঘল সা¤্রাজ্য ব্যবস্থা তথা সামান্ততন্ত্রে যে স্থানীয় সম্ভাব্য বণিক-বুর্জোয়াদে কে বৈদেশিক বাণিজ্যে উৎসাহিত করেনি বরং বিদেশি বানিক বুর্জোয়াদের উপঢৌকনে সন্তুষ্ট থেকেছে সেটাই এ সময় সুঁচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরিয়েছে। তাই ব্যক্তি জীবনের এতদিনকার নিয়ামক হিসাবে প্রজলিত ধর্মীয় বিধিবিধানের হস্তক্ষেপ হলেও সম্ভাব্য বাণিক বুর্জোয়ারা তাতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি । য়ে সামন্তশ্রেণী বাধা হিসাবে দাঁড়িয়েছিল, তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা ১৮৫৭ এর মহাবিদ্রোহের পর ছিন্ন বিচিছন্ন ও ধ্বংশ হয়ে যায়। যদিও তাদের সামন্ত ব্যবস্থার অর্থনৈতিক কাঠামো ও ক্ষমতা অটুট থাকে। সে রকম অবস্থায় ইস্ট ইন্ডিয় কোম্পানীর আইন বাংলা তথা ভারতীয়দের ব্যক্তি জীবনে অবঞ্ছিত হস্তক্ষেপ হিসেবে আর বিবেজিত হয়নি। বরং সকল ক্ষেত্রেই এই হস্তক্ষেপকে তারা স্বাগতই জানিয়েছিল। তাই এখানে বিচার্য বিষয় ….শাসন কর্তৃত্বের ফরমান জারীর পিছনে বিদ্যমান শসক শ্রেণি ও সমাজ কর্তাদের সমর্থনটা কতটা জনসমর্থনপুষ্ট,আন্তরিক ও দৃঢ় ছিল বৃটিশ আমলের পুর্ব পর্যন্ত আলেম ও উলেমা শ্রেণী সম্পত্তি সম্পর্কিত সমস্যা এবং নারী -পুরুষের সম্পর্কের সমস্যা নির্ধারনে পরামর্শ,মতামত ও সুপারিশ প্রদান করত আর এই সুপারিশ কে ফতোয়া বলা হত। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর রাজত্ব কায়েমের পর কিছুকাল তাদের ভুমিকা বজায় থাকলে ও কালক্রমে রাস্ট্রীয় জীবন থেতে তাদেরভুমিকা অন্তর্হিত হয়ে যায়, কারন তাদের রাষ্ট্রীয় পোষক শ্রেণীর প্রাধান্যই অন্তহির্ত হয়ে গিয়েছিল বলে। পাকিস্তান আমলেও তার পুনর্জীবন ঘটেনি। বরং রাষ্ট্রীয় নেতাদের কথাবার্তায়ধমীয় জিগিরের এত বেশী ফেনা উঠেযে তাতে করে তাদের ভ‚মিক আরও বিলীন হওয়ার পর্যায়ে চলে যায়। পাকিস্তান অমলে সারা পাকিস্তান ভিত্তিতে ধনতœš ও ব্যাক্তি স্বাতন্ত্রের প্রাধান্য অস্তে আস্তে শেকড় গাড়তে থাকে। কিন্তু পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পুর্ব বাংলার স্থানীয় ধনিক,ব্যবসায়ী,জোতদার ওধনি খামারিরা (আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারকারী ইউরোপ আমেরিকাররিচ ফার্মার নয়,কেউ বলেন ধনি কৃষক,আবার কেউবা বলেন গ্রাম্য ধনী)রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আসীন হয়। তাদের রাষ্ট্রীয় স্বাতন্ত্র্যের সংগ্রমের কালে ধমীয় মুল্যবোধের নামে এদেশের জনগণ ও তাদের উপর যতনিপীড়ন ওঅত্যাচারই চালানো হোক না কেন,পরবর্তীকালে এই শ্যেণীরবা সামাজিক গোষ্ঠিগুলোর নেতৃত্বই ধর্মীয় মুল্যবোধ জনিত দুর্বলতার কাছে আত্মসমর্পণ করে।

এই সামাজিক গোষ্ঠীসমূহ প্রকৃতপক্ষে দুটি মূল্যবোধকেই ধারন করে। এই দৈত্ব চরিত্রবিশিষ্ট। তাই যখন এলিট শ্রেনীর একটি অংশ সা¤্রাজ্যবাদী ঋণ ব্যবস্থার আর্থীক সহায়তায় ধনতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সুরসুরি অথবা অনুপ্রেরনা দেওয়ার চেষ্টা করে, তখন গনতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ তাকে সত্যিকার অর্থেই এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়। সংঘাত বেধে উঠে আলেম উলেমা তথা ধর্মীয় ব্যবসায়ীদের সাথে। উৎপাদনের আধুনিক প্রযুক্তির সাথে বিষয়গত ও বিষয়ীগত ভাবে সমপৃক্ত ইউরোপীয় ধারায শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী সমাজে তাদের কর্তৃত্বকে নিরকুংশ করার স্বার্থে তাদের ও উৎপাদনের উপায়ের মালিক শ্রেনীর স্বার্থনুগ নিয়ম-বিধি আইন-কানুন চালু করতে সচেষ্ট থাকে। অপরদিকে পুরাতন উৎপাদন সম্পর্কের নিয়ম বিধি আইন কানুন সংরক্ষনে সচেষ্ট হয় আলেম উলেমা ও ধর্মীয় শাস্ত্রবিদগণ। (আলেম উলেমারা ধর্ম ব্যবসায়ী এই অর্থে যে এখন সব কিছুই বাণিজ্যিক ভিত্তিক চিন্তা করা হয়। এদেশে ধর্মের যেহতু চাহীদা রয়েছে, তাই ধর্মীয় শিক্ষাদীক্ষাকে ব্যবসায়িক ভিত্তিক কাজে লাগানো হয়। এর জন্য বাজার সৃষ্টি করা হয়। বাজার তৈরী করা ও টিকিয়ে রাখার জন্য ধর্মীয় চেতনার সুরসুরি দেয়া হয়। এক ধর্মগ্রন্থের ভাষাকে, দুই খোদ ধর্ম শিক্ষাদানকে তারা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যবহার করে থাকে। ১৯৫২সনের পর বিগত প্রায় পঞ্চাশ বছরে ধর্মীয় শিক্ষাতেও বাংলা ভাষা চর্চা ও প্রসারের ফলে ইসলামী ধর্মীয় চিন্তাধারার প্রসার ঘটেছে বেশী। এতদসত্বেও এরা জীবীকার প্রয়োজনে ধনতান্ত্রিক মানবিক সম্পর্কের ভিত্তি হিসাবে বিবেচিত অর্থ- সম্পর্কের স্বীকার করে নিতে নিতে বাধ্য হয়। একটা অংশ রাষ্ট্রের শাসক গোষ্ঠীর যে কোন ধরনের আনুকুল্য পাওয়ার জন্য উদগ্রীব থাকে। অবশ্য এটা হল তাদের বহিবারন। মূল ও সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ সবসময় পুরাতন মূল্যবোধ দ্বারাই পরিচালিত হয়। সব সময় কামনা করে যেন রাষ্ট্রীয় শক্তি তাদের অনুকুলে থাকে। এমনকি তারা রাষ্ট্রের রাজনৈতক শক্তিকেই করায়ত্ত করার আকাংখা প্রকাশ করে থাকে এবং তার পক্ষে হিংসাত্মক পথ গ্রহণ করতে উদ্যত হয়। ধর্মগ্রন্থ কোরানে উল্লেখিত বিধি বিধান ও ইসলাম ধর্ম প্রবর্তক হযরত মুহম্মদ (সঃ) কর্তৃক আচরিত জীবন প্রণালী অর্থাৎ সুন্নাহ এর ভিত্তিতে আইন প্রণয়নের দাবি জানানো হয়। ইসলামি শাসনতন্ত্র সামন্ততন্ত্রের অবশেষের প্রভাবধীন কৃষিভিত্তিক গোষ্ঠী তে/সমাজ ধর্মের ভাব দিয়ে মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবোধে কে জিইয়ে রাখা হয়। হতাশাগ্রস্থ সাধারন মানুষ অলৌকিকতার প্রতি আত্মসমর্পন করে ব্যক্তিজীবন, সমাজ জীবন সব কিছুই ধর্মীয় ধ্যান ধারনার দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। সাথে সাথে গোষ্ঠী চেতনার দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে অন্যতর গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হয়। সাম্প্রদায়ীকতার উদভব হয়। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে ভারত মুঘল রাজশক্তি এই বিষয়টিকে বাস্তব স্বার্থে উপলব্ধি করেছিল। রাজশক্তি ইসলাম ধর্মালম্বি হওয়া সত্বেও, তাদের নিজেদের স্বার্থে, মুসলিম ধ্যান ধারনার সাথে স্থানীয় হিন্দু ধারনার একটা সমন্বয় সাধনের চেষ্টা চালায়।

কিন্তু তা সর্বাংশে ফলপ্রসু হয়নি। ফলপ্রসু না হলেও রাজশক্তির পক্ষ থেকে প্রজা ও অধঃস্তন প্রজাদের ক্রমবর্ধমান স্বার্থসংশ্লিষ্ট সমস্যাকে মোকাবেলা করার জন্য আইন সংহিতা প্রনয়নের প্রয়াস পরিলিক্ষত হয়। তার প্রমান আইন-ই-আকবরি ও ফতোয়া-ই-আলমগিরি। ভারতবর্ষের মত উন্নত দেশে যেখানে মনুসিংহতার মত শাসন শোষন সংহিতার সৃষ্টি হয়েছিল, সেখানে যেখানে পঞ্চদশ, ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীর রাজশক্তিকে বাইয়ের অর্থাৎ ইউরোপীয়য রাজচিন্তা বা রাষ্ট্রচিন্তা কোন ভাবেই প্রভাবিত করেনি, এমন ভাববার কোন কারন নেই। তৎকালীন রাজশক্তি বিদেশাগত লোকজনদের রাজচিন্তার সংস্পর্শে আসে এবং তার দ্বারা অনুপ্রানিত হয়, কিন্তু সুদুর প্রসারী অর্থনৈতিক চিন্তাদ্বারা প্রভাবিত হয়নি। সকল তুর্কী, আফগান ও মুঘলগন বহিরাগত। তারা আরবীয় এবং প্রধানত পারসীয় কিছু রাজচিন্তা ও ধ্যান ধারনা তাদের সাথে নিয়ে আসে। তাদের সকল রাজচিন্তার বাইরের আবরনটা ছিল ধর্মীয়। অভিজ্ঞ আকবর ও শিক্ষিত জাহাঙ্গীর রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইনের অনুশাসনকে রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। কিন্তু মুজাদ্দিদে আলফেসনির মত লোকদের প্রচেষ্টায় তা প্রতিহত হয়। তাদের রাজ শাসন চিন্তা ও ধ্যান ধারনার কেন্দ্রীয় পরিধিতেই সীমাবদ্ধ থাকে। নি¤œতর স্তরে ছড়ানোর সুযোগ লাভ করেনি। তখন ঐ ক্ষেত্রে উলেমা নামক মুসলিম ধর্মীয় আইনবেত্তাদের শক্তি আটুট থাকে। মুসলিম জনগোষ্ঠী-প্রধান অঞ্চলে মুসলিম সামন্তরা কিছুটা পরিমানে এদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতেন। কিন্তু বাংলায়, যেখানে ইসলাম ধর্মের গনপ্রচার উনবিংশ শতাব্দীর আগে পর্যন্ত ঘটেনি, সেখানে আঞ্চলিক ও গ্রামীন শক্তিপ্রতিভুরা নামে মাত্র মুসলমানদের উপর তাদের শাসন পরিচালনা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পীর দরবেশদের শরিয়তি বিধিবিধান সম্পর্কে পরামর্শ বা ফতোয়া দ্বারা সাহায্যপ্রাপ্ত হতেন। (প্রায় সকল ক্ষেত্রেই এই শরিয়তি পীর দরবেশগন ছিলেন ক্ষমতা প্রতিভুদের রক্ত সম্পর্কিত কোন ঘনিষ্ঠ আত্মীয় স্বজন অথবা সামাজিক মর্যাদা বিচারে ক্ষমতা প্রতিভুদের সমস্তরের ব্যক্তি, যারা মসজিদ বা মাদ্রাসার সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। অথবা একাধারে মসজিদের ইমাম, কোরান ও হাদীস ব্যাখ্যাকারী আলেম এবং বয়োবৃদ্ধ মধ্যগুরূ ও ছিলেন।)কিন্তু তাদের অনুশাসন নামে মাত্র-মুসলমান সমগ্র কৃষক, তাঁতী, জোলা, ও জেলে জনসমাজের মধ্যে প্রসারিত ছিলনা। যোগাযোগের (স্থানিক,বাচনিক ও কিছুটা চিন্তামুলক-ভাবপ্রকাশার্থে ভাষাগত) যে বিচিছন্নতা বাংলা অঞ্ছলে তথা ভারতের আঞ্চলিক ও গ্রামীন সামন্তাবশেষকে টিকে থাকতেসাহায্র করেছিল,একবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই খো গেল বাংলা অঞ্চলে সেই ধরনের বিচ্ছিন্নতা অনেকটা অন্তর্হিত। বাংলা ভষায় দর্মীয় শিক্ষাদান, মুলানুগইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞানতার অন্ধকারে থাকা সামন্তাবশেষের সংস্কৃতি ও ভাববাদিতার অধীন জনগোষ্ঠীর চোখকে ভাব প্রকাশের অবাধ প্রান্তরের সামনে উন্মুক্ত করে দেয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীক সম্প্রদায়বিশিষ্ট একটি জনবহুল দেশে বিগত পঞ্চাশ বছরের সবগুলো সরকারই ভুমি ব্যবস্থায় সামন্তাবশেষেরস্বার্থকে লালন করে,সাথে সাথে ধর্মীয় চিন্তা চেতনাকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে সহায়তাদান করে। বেড়ে উঠতে সাহায্য করে।

সেখনে এলিটদের একটি অংশ যখন ধর্মীয় বিধি নিষেধের ক্ষমতাকে সংকুচিত করে বিগত দুইশত বছরে গড়ে উঠা আইনি বিষয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে প্রধান ও একচ্ছত্র করে তুলতে চাইছে, তখনই বিগত পঞ্চাশ বছরে পুনর্জন্ম প্রাপ্ত ধমীয় শক্তিমাথা তুলে দাঁড়াতে চাইছে। আপাত: বিস্ময়কর মনে হলেও প্রকৃত তহ্য এই যে অওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি সহ এদেশীয় অন্যান্য শাসক গোষ্ঠী ধর্মীয় রাজনৈতিক শক্তির ভাবাবদিতার কাছে আতœ সমর্পণ করে। হাই কোর্ট থেকে ফতোয়ার একাংশের বিরূদ্ধে যেমন রায় প্রদানও মতামতপ্রকাশকতরা হয় তেমনি সুপ্রীম কোর্ট থেকে ফতোয়ার চাইতে রাষ্ট্রীয় আইনকে প্রাধান্য দেয়ার বিষয়ে আরও অগ্রসর না হওয়ার ব্যাপারে স্তগিতাদেশ জারী করা হয়। আওয়ামী লীগ পিছনে সরে আসে। বি এন পি জাতীয় পার্টি নিশ্চুপ থাকে। আধুনিক ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ৗ নাগরিক চেতনার যে ধারা অধিকতর শক্তিশালী হয়ে প্রাধান্যে আসতে পারছেনা,এটা তারই প্রমান।
এর কারনাটা নিহিত এলিট শ্রেণীর আভ্যন্তরীন দ্বৈততা ও তদজনিত দুর্বলতার মধ্যে। যে এলিট শ্রেণী নিজেদের স্বার্থ বজায় রাখার জন্য ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও ধনতান্ত্রিকতাকে সমর্থন করে তারাই আবার নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই সামন্ত অবশেষকে টিকিয়ে রাখে। বগুরা ও ব্রাম্মন বাড়ীয়া সহ সারা বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলেই অস্বাভাবিক উচ্চ সূদের হারের মহাজনী ব্যবস্থা চালু থাকার কারন হল অবিকশিত গ্রামীন ধনিক গোষ্ঠী ও পংগু বিকলাঙ্গ ধনতান্ত্রীক ব্যবস্থা নতুন উৎপাদন সৃষ্টিকে বাধাগ্রস্ত করে রাখা। কৃষকের পক্ষে নেতিবাজক এই সুদি ব্যবস্থার অস্বাভবিক উন্মত্ততায় অর্থ নৈতিক ভাবে অরক্ষনীয় সীমান্ত দিয়ে ঢুকে পড়ে ত্রাতা/ফেরেশতার বেশ ধরে ধনি দেশগুলোর ধনিক শ্রেণীর ও লগ্নীকারকদের দালাল এন জি ও ধান্দাবাজেরা। তাদেন (মানে গ্রাম ত্যাগ করা ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত এবং একই ভাবে পুরাতন সম্পত্তি সম্পর্কের স্বার্থ ভোগকারী এনজিও প্রবর্তকদের ঋণ পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ার সাথে গ্রামীন মহাজনী স্বার্থের দ্বন্দের সৃষ্টি হয়। গ্রামীন মহাজনী স্বার্থের সাথে সম্পৃক্ত গ্রামে থেকে যাওয়া অশিক্ষিত ও অর্ধাশিক্ষিত এলিট শ্রেণীর পিছিয়ে পড়া অংশ অন্য কথায় আওয়ামী লীগ,বি এন পি,জামাত,জাতীয় পার্টিও স্থানীয় নেতারা এক কাট্রা হয়। এদেরই উদ্যোগে ব্রাম্মনবাড়ীয়ায় সর্বাতœক হরতাল পালিত হয়। কৃষক ও শ্রমিকের অর্থনৈতিক স্বার্থের পক্ষের লোকজন নিশ্চুপ থাকে। তারা সঠিক ভাবে নির্ধারন করতে পারেনা তাদের কোন পক্ষে যাওয়া উচিৎ। মহাজনের কাছ থেকে ঋণ গ্রহনকারীরা মহাকনদের ঋণব্যবস্থায় অতিষ্ঠ ও বিরক্ত হয়ে এন জি ও র শরণাপন্ন হয়, আবার এন জি ও বিরোধীদের ধমীয় প্রচারণায় প্রভাবিত হয়ে ফতোয়াবাদীদৈর কর্মসূচিতে শামিল হয়। সঠিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যার জন্য বামপন্থীরা এগিয়ে আসেনা। গ্রামীণ মহাজনরা পুরাতন অর্থনৈতিক সম্পর্কের ধারক,অন্যদিকে এন জি ও ঋণ প্রদানকারীরা সা¤্রাজ্যবাদী ঋণনেট ওয়ার্কের অসরকারী প্রতিনিধি। জলে বাঘ ডাঙ্গায় কুমির। এই উভয় শত্রæর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারেনা জনগণ।
একদিকে সামন্তাবশেষের স্বার্থ ও সংস্কৃতির শক্তিরসাথে উদীয়মান ধনতান্ত্রীক স্বার্থ চেতনার দ্বন্ধ, কৃষকদের সাথে গ্রামীন শোষকদের দ্ব›দ্ব,অন্যদিকে,সা¤্রাজ্যবদী ঋণ লগ্নীকারকদের স্বার্থের এদেশীয় দালাল-পাহাড়াদার এনজিওদের সাথে এদেশীয় গ্রামীন শোষকদের দ্ব›দ্ব,আর একদিকে চাষী ও কৃষকদের স্বার্থের সাথে এনজি দের দ্ব›দ্ব এবং ফতোয়াবাদীদের দ্বন্দ্ব।এই সকল দ্বন্দ্ব বিজরিত একটি সমাজে ফতোয়াকে অস্বীকার অথবা ফতোয়াকে রাষ্ট্রীয় আইন হিসাবে পাওয়ার আকাঙ্খা যে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার সৃষ্টি করেছে,তাক তদূর প্রর্যন্ত অগ্রসর হবে সেটা নির্ভর করছে উপরোক্ত দ্বন্দ্ব গুলোর বিলুপ্তির বা অপনোদনের উপর।

সাইফ শোভন, চিফ রিপোর্টার,ঢাকা নিউজ২৪.কম