একটি আলোকিত অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি

আতাউর রহমান:   দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের আলোকিত ব্যক্তিত্ব আলী যাকেরের মৃত্যুর সংবাদে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ি। কয়েক বছর ধরে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন তিনি। বহুমুখী প্রতিভাবান সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আলী যাকেরের প্রয়াণে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অপূরণীয় ক্ষতি হলো।

আলী যাকেরের সঙ্গে আমার পথচলা দীর্ঘদিনের। তিনি বয়সে আমার চেয়ে তিন বছরের ছোট ছিলেন। আমি ‘নাগরিক’-এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। আলী যাকের আমাদের সঙ্গে যুক্ত হন স্বাধীনতার পরপরই। তিনি নাটকে অভিনয় করতেন। ‘কবর’ নাটকে চমৎকার অভিনয় করেছিলেন। আমি তার নাটক দেখেছিলাম তৎকালীন ইস্কান্দার মির্জা হলে। এরপর আমরা মুস্তাফা মনোয়ারের নির্দেশনায় টিভি নাটক ‘মুক্তধারা’ যখন শুরু করি, ওই সময় আলী যাকের জ্বর নিয়ে নাটক দেখতে আসেন। তখন তার সঙ্গে ভালো পরিচয় হয়। আমি তাকে বলি- আমরা একটা দল করেছি, আপনি আমাদের দলে যোগ দিন। তিনি আমাদের দলে যোগ দেন এবং আমার পরিচালনায় ১৯৭২ সালে ‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাটকে অভিনয় করেন।

বিভিন্ন দেশে সিনেমা হলগুলোতে একটি নাটক-সিনেমা ছয় মাস বা বছর ধরে চলে, বহু শো হয়। আমাদের দেশে কনসেপ্ট ছিল- নাটকের দুই-তিনটি শো হওয়ার পর তা বন্ধ হয়ে যেত। টিকিট বিক্রির মাধ্যমে একটি নাটকের ৫০টা শো কেন হবে না- এই চিন্তা আসে আলী যাকেরের মাথায়। ১৯৭৩ সালে এ বিষয়ে আলী যাকের একটি কনসেপ্ট নিয়ে আসেন। আমরা তাকে সমর্থন দিই। আলী যাকেরের অপূর্ব নির্দেশনায় ব্রিটিশ কাউন্সিলে বাদল সরকারের ‘বাকি ইতিহাস’ নাটক করি আমরা। আমি, আবুল হায়াৎ ও সারা আমিন ওই নাটকে মূল চরিত্রে অভিনয় করি। আলী যাকেরের ‘গ্যালিলিও’ নাটকের নির্দেশনা আমি দিয়েছিলাম। ওই নাটকেও তিনি অসাধারণ অভিনয় করেছেন। তার নির্দেশনায় আমরা ‘সৎ মানুষের খোঁজে’ নাটকে অভিনয় করেছি।
নির্দেশনা ও অভিনয় দুই ক্ষেত্রেই সমান পারঙ্গম ছিলেন আলী যাকের। লেখাপড়ার প্রতি তার খুব ঝোঁক ছিল। সন্ধ্যা থেকে আমাদের আড্ডা শুরু হতো, কখনও আলী যাকেরের বাসায়, কখনও আমার বাসায়। আমাদের আড্ডায় শুধু অভিনেতারাই আসতেন না, বিখ্যাত পেইন্টার, কবি ও ঔপন্যাসিকরাও আসতেন।অনেক সময় সারারাত আড্ডা দিয়ে সকাল ১১টায় মহিলা সমিতিতে নাটক করেছি।

আলী যাকের দেশের বিজ্ঞাপন জগতের অগ্রদূত ছিলেন। তার মতো এত বড় পরিসরে কেউ বিজ্ঞাপন ফার্ম গড়ে তুলতে পারেননি। তিনি যেখানেই হাত দিয়েছেন, সেখানেই সোনা ফলেছে। তিনি লেখাপড়া ভালো জানতেন। বাংলা ও ইংরেজি বলতেন সুন্দরভাবে। নাটকই ছিল তার প্রাণ, বিশেষত মঞ্চ নাটক। তিনি টেলিভিশনেও নাটক করেছেন। কিন্তু মঞ্চ নাটকে নির্দেশনা ও অভিনয়কে বিশেষভাবে প্রাধান্য দিতেন। হুমায়ূন আহমেদের নাটকের মাধ্যমে আলী যাকেরকে মামা বলে জানত সবাই। তার জীবনটাই ছিল আলোকিত একটি অধ্যায়।

আলী যাকের বন্ধুবৎসল অত্যন্ত উঁচু মাপের ব্যক্তি ছিলেন। খুব আড্ডা দিতে পছন্দ করতেন। সমাজের সবার সঙ্গে মিশতে পছন্দ করতেন। বিজ্ঞান, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ যেকোনো বিষয়ে জ্ঞানার্জন করতে মুখিয়ে থাকতেন। তিনি সংসার জীবনে একজন আদর্শ বাবা ও আদর্শ স্বামী ছিলেন। সবচেয়ে বড় বিষয় তিনি দেশপ্রেমী ছিলেন। আলী যাকের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও বাঙালিত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। বারডেমে যখন অসুস্থ অবস্থায় দেখতে যাই, তখন তিনি বলেছিলেন- আতাউর, আমার শরীর খারাপ, কখন কী হয় জানি না। তখন তাকে বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলে তিনি বলেছিলেন, আমি বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নেব না। আমার যা হওয়ার দেশেই হবে। পরে তার ক্যান্সার ধরা পড়ে এবং অনেকটা বাধ্য হয়েই বিদেশে চিকিৎসা নেন।

আলী যাকের বাঙালি ছিলেন, বাংলাদেশি ছিলেন এবং বাঙালির শতবর্ষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরম বিশ্বাসী একজন আলোকিত মানুষ ছিলেন। তিনি বহু দেশ ঘুরেছেন। তবে বাংলাদেশের পরিবেশ-প্রকৃতি, গ্রাম, নিসর্গ এসব কিছু তাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছিল। তার গ্রামের বাড়ি ব্র্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার রতনপুরে ঘন ঘন যেতেন। সেখানে বাড়ি করেছিলেন। গত তিন-চার বছর ধরে ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন আলী যাকের। তবে তিনি যখন যেখানে ছিলেন, দাপটের সঙ্গেই ছিলেন। তার শারীরিক গঠন ও ব্যক্তিত্ব এমন ছিল যে, কোথাও গেলে মানুষ তাকিয়ে থাকত, আর বলত- ওই যে আলী যাকের যায়। আলী যাকের একটি বড় নাম। তার পরিচিতি শুধু বাংলাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; ভারতসহ ইউরোপের অনেক দেশে তিনি পরিচিত তার সংস্কৃতিপ্রীতি ও নাট্যপ্রীতির কারণে। তিনি বাংলাদেশের একজন দেশপ্রেমী ‘লিজেন্ড’ ছিলেন। দেশকে সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছেন।
আলী যাকের গল্প করতে করতে বা আড্ডা দিতে দিতেই নাটক তৈরি করতেন। তিনি কারও সঙ্গে রাগারাগি করতেন না।

‘অচলায়ন’ নাটক করেছেন হেসেখেলে। কারও ভুল হলে হাসির ছলেই সংশোধন করে দিতেন। আজকাল এ ধরনের মানুষের যথেষ্ট অভাব দেখা যায়। আমাদের প্রজন্মে আলী যাকের, আবদুল্লাহ আল মামুন, মামুনুর রশীদ, আসাদুজ্জামান নূর, রামেন্দু মজুমদার, ফেরদৌসী মজুমদারের মতো অভিনেতা, অভিনেত্রী ও সংগঠকরা ছিলেন। আমাদের যুগটাই ছিল দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের রেনেসাঁর যুগ। সেই যুগটা আর নেই। তবে ১৫-২০ বছর পর যে এমন যুগ আসবে না এমনটিও নয়। এখন তরুণ প্রজন্মের অনেকেই ভালো করছে। আলী যাকের ছিলেন ‘রেনেসাঁস ম্যান’। স্বাধীন বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পুনরুত্থানে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান পতাকাবাহী। বাংলা ভাষা, নাটক, সংগীত, চলচ্চিত্র, পেইন্টিংসহ সবদিকেই তার ঝোঁক ছিল। তিনি জীবনকে দেখতেন সবদিক থেকে।

বন্ধুত্বের জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিলেন আলী যাকের। তিনি যেখানেই গেছেন সেখানেই বন্ধুত্ব করেছেন। সর্বগুণে গুণান্বিত একজন মানুষ ছিলেন আলী যাকের। ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে আমাদের মাঝে তার অভাববোধ কাজ করতে থাকে। তার পরও তিনি ছিলেন। এক কথায় বলা যায়, তার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে একটি আলোকিত অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল। আমরা যারা তার সঙ্গে কাজ করেছি আমাদেরও বয়স হয়েছে, অনেকেই চলেও গেছেন। তবে আলী যাকেরের চলে যাওয়ার প্রভাব থাকবে দীর্ঘমেয়াদে। তিনি কীভাবে অভিনয় করতেন বা তার জীবনাচরণ কেমন ছিল তা নিয়ে আলোচনা হবে, লেখালেখি হবে। আমার বয়স থাকলে হয়তো আমিও লিখতাম। আলী যাকেরের প্রস্থানে নিঃসন্দেহে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অপূরণীয় ক্ষতি হলো। তবে তিনি আমাদের থেকে চিরবিদায় নেননি। তিনি আমাদের মাঝে যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকবেন তার কর্ম, আদর্শ ও উঁচু মাপের ব্যক্তিত্বের কারণে।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব