বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনে নতুন উছিলার জন্ম

হামলার খণ্ড চিত্র, মুরাদনগর কোরবানপুর

সুমন দত্ত:

বাংলাদেশে জন-বিচ্ছিন্ন সরকার থাকলে যা হয়, বর্তমানে সেটাই হচ্ছে। ক্ষমতায় থাকার চিন্তা ও সুবিধাবাদীর রাজনীতি আজ প্রতি ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জনমনে নেই শান্তি। তরকারির বাজারে আগুন, টিকিট সমস্যায় প্রবাসীদের চাকরি খোয়ানো, প্রাথমিকের শিক্ষকদের অনশন, উন্নয়নের নামে চিনিকল বন্ধের ঘোষণা, ধর্ষণ নারী নির্যাতন বেড়ে যাওয়া, পারিবারিক সহিংসতায় খুন হচ্ছে সন্তানসহ মা, মাদকাসক্ত যুব সমাজ। করোনায় ও সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু আছে আগের মতই। আইন হয়েও বাস্তবায়ন হচ্ছে না নিরাপদ সড়ক আইন। এসবের মধ্যেই মরার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে তথাকথিত ধর্ম অবমাননার নামে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর মামলা, হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজের ঘটনা।

বাংলাদেশি মিডিয়ায় বক্তব্য রাখা সুশীল বুদ্ধিজীবীদের মতে দেশে নাকি রয়েছে চ্যাম্পিয়ন অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সরকার। ধরেই নিলাম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মদিনা সনদ অনুসারে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সরকার চালাচ্ছেন। তাই যদি হয়, উপরে উল্লিখিত ঘটনাগুলোতে এই গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক সরকারের ভূমিকাটা কি?

আলু পেয়াজের মত হঠাৎ করে ধর্ষণ বাড়ার কারণ কি? হঠাৎ করে এদেশের মানুষের নবী প্রেম জেগে উঠল কীভাবে? নবী প্রেমে তৌহিদি মোমিনরা নামাজী লোককে কেন পিটিয়ে পুড়িয়ে মারছে? কয়েক বছর আগেও তো মানুষ এতটা নিষ্ঠুর ছিল না। মিডিয়ায় টক শো করা সুশীল সমাজ বিজ্ঞানীদের মুখ দিয়ে এসব প্রশ্নের উত্তর বের হয় না।

বাস্তবে সবকিছুর মূলে রয়েছে সরকার ও প্রশাসনের দায়িত্বহীনতা, অবহেলা ও দুর্নীতি।  যার যে কাজ, সেটা ঠিকমত করছে না। তার ফলে সৃষ্টি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা।একটা সাধারণ কাজ ঠিকমত করতে লাগে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা। এমন একটা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশ।  এমনটা কেন হবে?

দেশের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পুলিশের। সেই পুলিশ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। পুলিশের বিরুদ্ধে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় অভিযোগ তারা মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে। যে কারণে দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা অন্য যেকোনো সময়ের চাইতে বেড়ে গেছে।

যৌন উত্তেজক ইয়াবা ট্যাবলেট তরুণার গ্রহণ করছে। এর  ফলে সমাজে বেড়ে গেছে ধর্ষণের মতো ঘটনা।  কিশোর তরুণদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হচ্ছে লোকজন। অথচ ঘোষণা দিয়েও সরকার মাদক নির্মূল করতে পারেনি। ঘোষণা দিয়ে নিরাপদ সড়ক আইন বাস্তবায়ন করতে পারেনি সরকার।

রাজাকার ও জঙ্গি সমর্থনকারী রাজনীতিবিদদের মতো আমি বলবো না সরকারের মেগা প্রজেক্ট, মেগা দুর্নীতি। 

আমি শুধু বলতে চাই, এই সরকারের প্রশাসনে যারা আছেন, তারা কেন নিজেদের দায়িত্ব ঠিকমত পালন করছেন না? দেশের কোনো স্থানে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দেখা দিলে স্থানীয় প্রশাসন তথা ডিসি, ওসি, ইউএনও, ম্যাজিস্ট্রেট যেকোনো পদক্ষেপ নিতে পারেন।

যেকোনো সময় তারা ১৪৪ ধারা জারি করে পরিস্থিতি শান্ত করতে পারেন। সহিংসতা সৃষ্টিকারী ব্যক্তিকে ঘটনা ঘটার আগেই বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার করতে পারেন। এমন আইনি ক্ষমতা প্রশাসনের কাছে থাকলেও কোন দুর্বলতার কারণে তারা সময়মত তা প্রয়োগ করছেন না?

কুমিল্লার মুরাদনগর এলাকার কোরবানপুর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনায় জানা যায় সরকারের প্রশাসন যথেষ্ট সময় ও সুযোগ পেয়েছিল পরিস্থিতি শান্ত রাখার। কিন্তু প্রশাসন তাদের কাজের কাজটি করে নাই। একই ঘটনা এর আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরেও দেখা গিয়েছিল। কেন সাম্প্রদায়িক উসকানি দেয়ার লক্ষ্যে এলাকায় উগ্র জঙ্গিদের বিক্ষোভ মিছিল করতে দেয়া হয়?

বিএনপি হরতাল ডাক দিলে পুলিশকে যেভাবে সক্রিয় হয়ে মিছিল বন্ধ করতে দেখায়। তথাকথিত তৌহিদি মিছিলে পুলিশ কেন নিষ্ক্রিয় থাকে? তাদের এই নিষ্ক্রিয়তায় সহিংসতার শিকার হচ্ছে হিন্দু মুসলমান সবাই।

পাটগ্রাম থেকে কোরবানপুর সব জায়গাতেই আগে ধর্ম অনুভূতিতে আঘাতের গুজব ছড়ানো হয়। পরে তথাকথিত তৌহিদি মিছিল হয়। পুলিশ নিষ্ক্রিয় থাকে। এরপর হত্যা অগ্নিসংযোগ লুটপাট শ্লীলতাহানির ঘটনা গুলো ঘটে। এরপর বাংলা সিনেমার মত পুলিশের এন্ট্রি হয়। এই দৃশ্য আর কতদিন দেখতে হবে।    

কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার কোরবানপুরে ১৪৪ ধারা জারি করলে এসব হতো না। সেখানে আইন যারা হাতে তুলে নিল, পুলিশের বাধা কোথায় সেখানে? নাকি পুলিশ নিজেও ধর্মানুভূতি নিয়ে উত্তেজিত ছিল।

বলা হচ্ছে, ঘটনার পিছনে রাজনীতি থাকতে পারে। সেটা আছে কি না তা নিয়ে তদন্ত হতে পারে। তবে কুমিল্লার ওই এলাকায় যিনি ছিলেন ত্রাস, তার নাম কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ। তিনি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার আসামী। বিচারে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত হোন। বহুদিন ধরে পলাতক। ধারণা করা হয় তিনি দুবাই ও থাইল্যান্ডে পালিয়ে আছেন। সন্ত্রাসী এই ব্যক্তির জঙ্গি অনুসারীরা কুমিল্লার মুরাদনগরে বহাল তবিয়তে আছে। হয়ত তারা এতদিনে আওয়ামী লীগে এন্ট্রি মেরে দিয়েছে। আর এখন যিনি ওই এলাকার সাংসদ তিনি হচ্ছেন ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন। একজন পরিচিতি ব্যবসায়ী শিল্পপতি। হাজার কোটি টাকার মালিক। যিনি এলাকার চাইতে ঢাকায় থাকেন বেশি। মনোনয়ন কিনে এমপি হয়েছেন। এই শ্রেণির লোকরা এলাকা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায় না। 

কোরবানপুরের ঘটনাটা অন্যরকম। এখানে ফেসবুকে এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির মতকে সমর্থন করেছে। আর তাতেই সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ কি জেনে তাকে হাতকড়া পরিয়ে থানায় নিল এটাও অবাক করা ব্যাপার। সবাই জানি, পুলিশের কাছে অভিযোগ গেলেই কেউ গ্রেফতার হয় না। ঘটনা আমলযোগ্য কিনা সেটা বিচার করেই পুলিশ পদক্ষেপ নেয়। এখানে যে বা যারা পুলিশকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ দিল তারা কারা? পুলিশ নিশ্চয় সেই অভিযোগ খতিয়ে দেখেছে। কারণ অভিযুক্তকে হাতকড়া পরা অবস্থায় থানায় দেখা গেছে। যা ফেসবুকে ভাইরাল আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। অভিযুক্ত গ্রেফতার হওয়াতে অনেকেই মনে করতে পারে আসলেই ধর্ম অবমাননাকর কিছু হয়েছে। সাম্প্রদায়িক উসকানির জন্য এই ঘটনাটাই যথেষ্ট।

দু:খের বিষয় এই বোধটা আমাদের দেশের কিছু নির্বোধের নেই। যে কারণে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে বার বার।    

ফেসবুকে কত শত ব্যক্তির মতকে সমর্থন জানিয়ে আমরা মন্তব্য করি। কই কোথাও তো শুনিনি আমাদের বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ করেছে পুলিশে। আর সেই অভিযোগ শুনে পুলিশ আসবে গ্রেফতার করতে। কোরবানপুরের এই ঘটনা বিরল। সেখানকার মানুষের মনোভাব উদ্ভট ঠেকেছে আমার মতো অনেকের কাছে।

অবাক লাগে কোরবান পুরের ঘটনা, মূলধারার মিডিয়া দূরে থেকেছে। ফেসবুকে হামলার চিত্র ও ভিডিও চিত্র আগে এসেছে। সাংবাদিক হিসেবে জানি প্রতিটি মিডিয়ার জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সাংবাদিক প্রতিনিধি থাকে। টিভি চ্যানেলগুলো কোনো সংবাদ পেলে গাড়ি নিয়ে দ্রুত খবর করতে চলে যায়। কোরবানপুরের ঘটনায় মিডিয়াকে এই ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়নি। হামলার অনেক পরে মিডিয়াগুলো এখন সংবাদ পরিবেশন করছে।

 কাদের ইশারায় কোরবানপুরের ঘটনা মিডিয়াতে প্রচারে নিষেধ ছিল? সরকারের সাফ দাবি মিডিয়ার ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নাই। মিডিয়া স্বাধীন। তাহলে এই ঘটনার সংবাদ মিডিয়া দেরিতে কেন আসল? তার একটা খবর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দেয়া উচিত।

বাংলাদেশের মিডিয়া রোহিঙ্গাদের নিয়ে যেভাবে সোচ্চার, হিন্দুদের ওপর নির্যাতন হামলার খবর গুলো নিয়ে তেমন সোচ্চার কেন নয়? এখানে মিডিয়ার সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করছে কি? ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশে এমনটা আশা করা যায় কি?      

লেখক: সাংবাদিক তারিখ: ৫-১১-২০২০