পাঁচ কোটি টাকার প্রকল্পে ৭০ লাখই বরাদ্দ বিদেশ ভ্রমণে!

 

নিউজ ডেস্ক: ‘মানিকগঞ্জ জেলায় আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট স্টেডিয়াম কমপ্লেক্স নির্মাণের লক্ষ্যে ফিজিবিলিটি স্টাডি প্রকল্প।’

২০১৮ সালে নেওয়া এই প্রকল্পটি হতে পারে সরকারি কাজের ধীরগতি এবং প্রকল্পের টাকায় সরকারি কর্মকর্তাদের অযৌক্তিক ও অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

প্রকল্পের কাজ ২০১৮ সালের অক্টোবর ২০১৯ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও নির্দিষ্ট সময়ে কোনো কাজই হয়নি। পরে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ এক বছর বৃদ্ধি করে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। সেই মেয়াদও শেষ।

এখন পর্যন্ত প্রকল্প শেষ হওয়া তো দূরের কথা, পরামর্শক প্রতিষ্ঠানই নিয়োগ দিতে পারেনি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। এখন নতুন করে সময় বৃদ্ধির জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে প্রকল্পটি বাস্তবায়নকারী সংস্থা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ।

শুধু এখানেই শেষ নয়, চার কোটি ৯৮ লাখ টাকা প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে শুধুমাত্র কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণলব্ধ অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য।

এই টাকায় ২০ কর্মকর্তা অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ডে যাবেন সেখানকার স্টেডিয়ামগুলো কিভাবে তৈরি করা হয়েছে এবং কিভাবে সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় সেই অভিজ্ঞতা অর্জন করতে। প্রকল্প সম্পর্কিত দলিল থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

এক্ষেত্রে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ও মেলবোর্ন এবং ইংল্যান্ডের একটি আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম সরেজমিনে দেখার জন্য। এই স্টেডিয়ামগুলো দেখে তারা এই স্টেডিয়ামগুলো কিভাবে এত দীর্ঘস্থায়ী হলো সে সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করবেন।

প্রকল্প অনুযায়ী দুইবারে ১০ জন করে ২০ কর্মকর্তা যাবেন দুই দেশে।

এই ১০ জনের দলে তিনজন কর্মকর্তা থাকবেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে, চারজন থাকবেন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থেকে, দুইজন পরিকল্পনা কমিশনের এবং একজন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) থেকে।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সরকারি প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রিতা এখন একটা সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

এক্ষেত্রে তিনি প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অদক্ষতাকে দায়ী করে বলেন, ‘প্রকল্প বিলম্বিত হওয়ার কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জনগণের টাকার অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে।’

অন্য এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের বাজেটের একটা বড় অংশ বিদেশ ভ্রমণের জন্য নির্ধারিত রাখা হয়েছে, যেটা জনগণের অর্থের অপচয়। এই ধরনের বিদেশ ভ্রমণ প্রকল্পে রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও পর্যালোচনা করা দরকার।’

প্রকল্পটির প্রাক্কলিত চার কোটি ৯৮ লাখ টাকা ব্যয়ের খাত অনুযায়ী পরামর্শক নিয়োগে তিন কোটি ৯৮ লাখ, শিক্ষাসফরে ৭০ লাখ, যানবাহন ভাড়া বাবদ নয় লাখ, সম্মানী বাবদ পাঁচ লাখ, ব্যবস্থাপনা ব্যয় তিন লাখ, কম্পিউটার সরঞ্জাম ক্রয়ে দুই লাখ, আসবাবপত্র দুই লাখ, প্রকাশনা ও মুদ্রণ তিন লাখ, বিজ্ঞাপন বাবদ তিন লাখ, ষ্টেশনারী ও অন্যান্য খাতে তিন লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

পুরো প্রকল্পটিই সরকারের অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হবে।

২০১৭ সালের জুলাই মাসে স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক নাইমুর রহমান দুর্জয় স্টেডিয়ামের জন্য প্রস্তাবিত জায়গা মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ফেরিঘাটের পাশে ধুতরাবাড়ি পরিদর্শন করে বলেন, ‘নদীর কাছাকাছি স্টেডিয়াম নির্মাণে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা এবং ঐ এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণেই স্থানটিকে বেছে নেওয়া হয়েছে।’

তবে পরামর্শক নিয়োগ এবং মূল প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় নির্ধারণের আগেই যেহেতু স্টেডিয়ামটি পদ্মা নদীর তীরে হবে, তাই নদীর গতি-বিধি জানার জন্য পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়েরও মতামত চাওয়া হয়।

এর প্রেক্ষিতে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, প্রস্তাবিত জায়গায় স্টেডিয়ামটি করতে হলে নদীর তীরে স্থায়ী প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা তৈরি করতে ৩২৫ কোটি টাকা খরচ হবে।

কারণ হিসেবে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, স্টেডিয়ামের জন্য প্রস্তাবিত জায়গা নদী থেকে ২১৫ মিটার দূরত্বে। তাই নদীর তীরবর্তী তিন কিলোমিটার এলাকায় নদী শাসনের কাজ করতে হবে।

স্টেডিয়াম নির্মাণের কারণ হিসেবে প্রকল্পে বলা হয়েছে, দেশে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে এবং ঢাকাতে একটি মাত্র স্টেডিয়াম থাকায় ৫০ হাজার দর্শকের ধারণক্ষমতা সম্পন্ন একটি স্টেডিয়াম দ্রুত নির্মাণ করা প্রয়োজন।

এছাড়াও দেশে ক্রিকেটারদের জন্য বিশ্বমানের একটি ক্রিকেট একাডেমির প্রয়োজন বলেও এতে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রকল্পে বলা হয়েছে, স্টেডিয়ামটি হবে উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন, আধুনিক এবং দৃষ্টিনন্দন।

সূত্রমতে, গত ২১ জুন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে পরিকল্পনা কমিশনকে জানানো হয় নির্ধারিত মেয়াদ ৩০ জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্ভব করা হবে না।

প্রকল্প নথি অনুসারে, গত বছরের ২৫ নভেম্বর জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ সচিব মো. মাসুদ করিম এক চিঠিতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিবকে জানান, উন্মুক্ত ই-জিপিতে দরপত্র আহ্বান করে ঠিকাদার/উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠান নির্বাচন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

তবে পিপিআর-২০০৮ মোতাবেক ইওআই এবং আরএফপি অনুসরণ করতে ঠিকাদার/উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ করতে হবে। উক্ত পদ্ধতি অনুসরণের ক্ষেত্রে পিপিআর-২০০৮ অনুযায়ী নূ্ন্যতম সময় দরদাতাদের প্রদানের নির্দেশনা থাকায় নিয়োগ প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প সমাপ্ত করা সম্ভব না।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. শাহ আলম সরদার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে এই প্রকল্পের কাজ শেষ করা যায়নি এবং তারা মন্ত্রণালয়কে সময় চেয়ে চিঠি দিয়ে দিয়েছে। মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে।’

‘এটি অনেক বড় একটি প্রকল্প, এজন্য কিছুটা সময় লাগছে। আশা করছি মন্ত্রণালয় আমাদেরকে নতুন করে সময় দেবে।’

শিক্ষাসফরে বেশী বাজেট বরাদ্দের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে শাহ আলম বলেন, তারা ভালো ভালো স্টেডিয়ামগুলো দেখতে চেয়েছিলেন, যাতে তাদের অভিজ্ঞতাটা এই প্রকল্পে কাজে লাগে।

তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাসফরের ব্যাপারে পরিবর্তন আসতে পারে। কারণ করোনার কারণে এখন বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ রয়েছে। এবং কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। 

সূত্র : দ্য ডেইলি স্টার