চীন দাঁত দেখাবে, কামড় দেবে না —

বিভূ রন্জন সরকার:   ভারত-চীন সীমান্ত সংঘর্ষে উভয় তরফে হতাহতের খবরে কারো কারো কাছে মনে হচ্ছে পৃথিবীর বৃহৎ জনসংখ্যার বড় দুটি দেশ কী তাহলে যুদ্ধের মুখোমুখি? সংঘর্ষটা হয়েছে বেশ নাটকীয়। হতাহত হয়েছে কিন্তু কোনো আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার হয়নি। হাতাহাতি, কিলাকিলি, ইট-পাথরের যুদ্ধ। এটা কী কোনো বড় যুদ্ধের ইঙ্গিতবাহী? ভারত-চীন কী মল্লযুদ্ধের যুগে ফিরে যাবে?

ভারতের ওপর হামলা চালিয়ে চীন যদি সাফল্য পায় তাহলে আমাদের দেশে বড় এক জনগোষ্ঠী উল্লসিত হবে, ছোট অংশ দুঃখ পাবে। কারণ আমাদের দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ভারতবিরোধী, ভারত-ভীতিতে কাতর। আবার অল্প সংখ্যক মানুষ অকারণ ভারতপ্রীতিতেও কাবু।

১৯৬২ সালের পর এই প্রথম লাদাখ সীমান্তে সংঘর্ষে দুই দেশের সেনাসদস্যদের প্রাণহানি ঘটলেও এখনই বড় যুদ্ধের আশঙ্কা আছে বলে মনে হয় না। চীন নানা কারণে ভারতকে চাপে রাখতে চায়, আবার ভারতের অতি জাতীয়তাবাদী বিজেপি সরকারও নিজেদের অসহায়তা প্রকাশ করতে চায় না। যুদ্ধের সক্ষমতা দুই দেশেরই আছে। তবে সত্যি যুদ্ধ লাগলে জয়-পরাজয় নিয়ে আগাম অনুমান অর্থহীন। কারণ যুদ্ধ লাগলে তা দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তির বিন্যাস কেমন দাঁড়াবে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে।

ভারত কূটনৈতিকভাবে কিছুটা বেকায়দায় আছে। প্রতিবেশীদেশগুলোর সঙ্গে সদ্ভাবের ঘাটতি আছে। নেপালও ভারতকে লাল চোখ দেখাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ভারতের প্রতিবেশীদের কব্জায় আনার কৌশলে চীন এগিয়ে আছে।

চীন এখন এক নম্বর বিশ্বশক্তিতে পরিণত হতে চায়। তার টার্গেট আমেরিকা। আমেরিকাকে পিছনে ফেলে তার জায়গা নিতে চায় চীন। সামরিক এবং অর্থনৈতিক শক্তিতে চীন বলীয়ান। কিন্তু সে যে সবাইকে ছাড়িয়ে তালগাছের মতো একপায়ে দাঁড়িয়ে গেছে, সেটা দেখা গেলেও তার শক্তির পরীক্ষা হয়নি।

সরাসরি আমেরিকার সঙ্গে যুদ্ধ না বাঁধিয়ে একটি প্রক্সি ওয়ার চালিয়ে দেখার খায়েশ চীনের থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে ভারত হতে পারে ‘পরীক্ষাগার’।

চীনের চেয়ে আমেরিকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ভালো। চীনের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার প্রতিযোগিতায় ভারতও আছে। আবার চীনাদৈত্য রোখার জন্য আমেরিকা ভারতকে সঙ্গে চায়।

আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতির সমীকরণ সহজ নয়। চীন তার আমেরিকাবধের পরিকল্পনায় সফল হবে কিনা সেটা বিভিন্ন দেশের শক্তিবিন্যাসের ওপর নির্ভর করবে।

ভারতকে নিঃসঙ্গ ভাবার কারণ নেই। আমেরিকা ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, জাপান, রাশিয়া, ইসরায়েলসহ অনেক দেশই চীনবিরোধিতায় ভারতের পাশে থাকবে বলে মনে হয়।

তবে আমেরিকা এখন অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীনের থেকে পিছিয়ে আছে। বিশ্বমোড়লের ভূমিকা পালনের অবস্থায় আমেরিকা নেই। বলা হয়ে থাকে, আমেরিকা যার বন্ধু তার আর নতুন শত্রু দরকার হয় না। তারপরও আমেরিকাকে বন্ধু হিসেবে পাওয়ার জন্য লালায়িত দেশের সংখ্যা কম নয়।

চীনের প্রভুত্ব মানার জন্য বিশ্ব কী প্রস্তুত আছে? পৃথিবীর দেশে দেশে চীনের বিনিয়োগ আছে। বিশ্ব নাকি টাকার বশ। সে হিসেবে চীনের মোড়ল হওয়া সহজ মনে হলেও রাজনীতির হিসাব-নিকাশ সব সময় সরল পথে আগায় না।
চীন-আমেরিকার দ্বন্দ্ব কীভাবে নিরসন হবে তা এখনই বলা মুশকিল।

আমাদের দেশে যারা এখন ভারতবিরোধিতার কারণে চীনা প্রেমে দিওয়ানা হয়ে আছেন তারা জানেন না, চীনা প্রেম হৃদয়বৃত্তিক নয়, ব্যবসায়িক ভিত্তিক। চীন কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে তার নজির তারা তিয়ান ইয়ানমিন স্কয়ারে দিখিয়েছে, দেখাচ্ছে উইঘুরে। আমেরিকা ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ দেয়, আর চীন সেটা দমন করে নিষ্ঠুরতম উপায়ে।

পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের থাবা থেকে বেরিয়ে পৃথিবী কী চীনা কর্তৃত্ববাদের যাঁতায় পিষ্ঠ হতে চাইবে?

আমাদের দেশে কিছু মানুষ একেবারেই কাণ্ডজ্ঞানরহিত। তারা পরনের লুঙ্গি খুলে মাথায় পাগড়ি বেঁধে নাচতেও দ্বিধা করে না। এরা তুলসিতলায় ঠ্যাং উঁচিয়ে কুকুরের প্রশ্রাব করা দেখেও পুলক অনুভব করে। কারণ তুলসিতলায় হিন্দুরা পূজা করে।
কিন্তু এই শ্রেণির মানুষের মনোভাব দিয়ে তো বিশ্বরাজনীতি প্রভাবিত হবে না।

দেখা যাক, লাদাখ উত্তেজনা কোথায় গিয়ে শেষ হয়। লাদাঘ ভৌগোলিকভাবেই একটি নাজুক, ঝুঁকিপূর্ণ এবং বিতর্কিত এলাকা। এইখানে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জেদ বিশ্বরাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে কিনা, দেখার অপেক্ষা সেটা।

কিছু মানুষ আবেগহীন, বিবেকহীন হতে পারেন, সব মানুষ কখনোই তা হবেন না। যুক্তিবাদিতাই পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করবে। শেষপর্যন্ত জয় হয় শুভবুদ্ধিরই।