বাংলাদেশ-ভারত নৌ, সড়ক ও রেলপথে পণ্য পরিবহন শুরু হচ্ছে

নিউজ ডেস্ক:  চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে ট্রানজিট চালু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এর আওতায় বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যসহ অন্য যে কোনো দেশে সহজে পণ্য পরিবহন করতে পারবে। এর ফলে ৯ বছর আগে বহুমাত্রিক ট্রানজিট (নৌ, সড়ক ও রেল) চালুর বিষয়ে দু’দেশের সরকারপ্রধান যে একমত হয়েছিলেন, তা বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। অনেকে এ ব্যবস্থাকে ট্রান্সশিপমেন্টও বলছেন। এটি চালুর ফলে বাংলাদেশ ও ভারত লাভবান হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ট্রানজিটের আওতায় পণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ কমবে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের। বাংলাদেশেরও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেগবান হবে। তবে অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ মনে করেন, ট্রানজিটের ফলে ভারত বেশি সুবিধা পাবে। এই চুক্তির ফলে ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে। বিনিময়ে ‘মাশুল’ বা ফি পাবে না বাংলাদেশ। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাসেই ট্রায়াল বা ‘পরীক্ষামূলক’ ট্রানজিট চালু হচ্ছে। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ঢাকায় অনুষ্ঠিত উভয় দেশের নৌ সচিব পর্যায়ের বৈঠকে এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। ওই সিদ্ধান্তই এখন কার্যকর হচ্ছে।

সূত্র বলেছে, জানুয়ারির ২০ থেকে ২৫ তারিখের মধ্যে ভারতে কনটেইনারভর্তি দুটি জাহাজ কলকাতা বন্দর থেকে রওনা হয়ে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে পৌঁছবে। এর পর পণ্যগুলো খালাস হয়ে সড়কপথে আখাউড়া হয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ত্রিপুরা এবং সিলেটের তামাবিল হয়ে আসামে পৌঁছার কথা। এ ছাড়া কিছু পণ্য আশুগঞ্জ বন্দর হয়ে কুড়িগ্রামের চিলমারী রুটে আসামের ধুবিয়ানা এবং রাজশাহীর গোদাগাড়ী হয়ে মেঘালয়ের ধুলিয়ানায় নিয়ে যাওয়া হবে। এ লক্ষ্যে দু’দেশের মধ্যে প্রক্রিয়া চলছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (পরিকল্পনা) জাফর আলম বলেন, কী পরিমাণ পণ্য আসবে তা জানা যায়নি। তবে পরীক্ষামূলক ট্রানজিটের আওতায় যা আসবে তা হ্যান্ডল করার জন্য আমরা প্রস্তুত রয়েছি। তিনি জানান, ছয় মাসের মধ্যে পতেঙ্গা কনটেইনার ডিপো চালু হচ্ছে। ফলে কোনো সমস্যা হবে না। তবে ভবিষ্যতে পণ্যের পরিমাণ বাড়লে বন্দরের অবকাঠামোর আরও উন্নয়ন করতে হবে। আশুগঞ্জ বন্দর সম্পর্কে তিনি বলেন, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর চাহিদা ভিন্ন ভিন্ন। অনেক রাজ্য নিজেই স্বয়ংসম্পূর্ণ। ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ছে না। আর চাহিদা না বাড়লে বাণিজ্যের প্রসার ঘটে না। যে কারণে আশুগঞ্জ বন্দর এখনও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি বলে মনে করেন তিনি।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবাল ও মেরিন) ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ আলী চৌধুরী বলেন, এটি হবে পরীক্ষামূলক ট্রানজিট। ফলে এখন যে অবকাঠামো রয়েছে তা দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যাবে। তিনি বলেন, বন্দর ব্যবহারের জন্য সবার কাছ থেকে প্রযোজ্য হারে নির্ধারিত যে ফি আদায় করা হয়, ট্রানজিটের পণ্য পরিবহনে ভারতের কাছ থেকে একই ফি আদায় করা হবে। এটি সরকারি সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে বলে জানান তিনি। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অবকাঠোমো উন্নয়ন ছাড়া ট্রানজিটের সুফল মিলবে না। একই সঙ্গে চার্জ বা ফি যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, ট্রানজিট চুক্তির ফলে বাংলাদেশ সুবিধা পাবে না। কারণ, এর বিনিময়ে মাশুল বা ফি দেবে না ভারত। এই চুক্তি দেশের স্বার্থের পরিপন্থি- এ কথা উল্লেখ করে প্রবীণ এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, এতে বাংলাদেশের পাওনাগুলো নিশ্চিত না করে একতরফাভাবে ভারতকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দেশের জনগণের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। সাধারণ মানুষের মতামত উপেক্ষা করে কোনো চুক্তি করলে দেশের জন্য সুখকর হয় না বলে জানান তিনি।

বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ও এফবিসিসিআইর সাবেক পরামর্শক মঞ্জুর আহমেদ একই মন্তব্য করে বলেন, ট্রানজিটের ফলে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম এবং মোংলা পোর্ট ব্যবহার করে ভারত তার নিজ ভূখণ্ডের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে কানেক্টটিভিটি (যোগাযোগ) জোরদার করতে পারবে। এতে ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে। এই ট্রানজিটের ফলে বাংলাদেশ তেমন লাভবান হবে না বলে মনে করেন তিনি।

পেছনের কথা :২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফর করেন। সফর শেষে দুই দেশের যৌথ ইশতেহারে চট্টগ্রাম এবং মোংলা বন্দর ব্যবহার করে দুই দেশের মধ্যে বহুমাত্রিক (নৌ, সড়ক ও রেল) ট্রানজিট চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রাম ও মোংলা পোর্ট ব্যবহারের বিষয়ে ২০১৫ সালে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক হয় (এমওইউ)। এক বছর পর ২০১৬ সালের জুনে নদীপথে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রানজিট চালু হয় নৌ প্রটোকল চুক্তির আওতায়। গত অক্টোবরের প্রথম দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে দুই দেশের মধ্যে সড়ক, রেল ও নদীপথে পণ্য পরিবহনের লক্ষ্যে ট্রানজিট চুক্তি কার্যকরের বিষয়ে সই হয়। একই সঙ্গে এটি কীভাবে পরিচালিত হবে সে বিষয়ে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরসের বিষয়ে (এসওপি) চুক্তি হয়। দুই দেশের সরকারপ্রধানের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে সর্বশেষ ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ঢাকায় নৌ