বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে কখনও ভাবিনি

নিউজ ডেস্ক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের সাথে যা হয়েছে, সেটি অত্যন্ত দুঃখজনক, লজ্জাজনক ও অবিশ্বাস্য। বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে কখনও ভাবিনি। এটা পাকিস্তান আমলেও ঘটেনি, এমনকি ব্রিটিশ আমলেও ঘটেনি।’

কোটা সংস্কার আন্দোলনে গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি দাবিতে রোববার সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে ‘নিপীড়ন বিরোধী শিক্ষকবৃন্দের’ ব্যানারে আয়োজিত এক কর্মসূচিতে তিনি এসব কথা বলেন।

এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে পদযাত্রা বের করেন নিপীড়ন বিরোধী শিক্ষকবৃন্দ। পরে ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে কর্মসূচি শেষ হয়।

সমাবেশে ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কারের দাবি যোক্তিক ছিল। এটা সরকারও স্বীকার করেছে। কিন্তু সে দাবি বাস্তবায়নে বিলম্ব হওয়ায় শিক্ষার্থীরা আবার আন্দোলনে নামতে চাইলে, তাদের ওপর নৃশংসভাবে হামলা চালানো হয়েছে। হামলার শিকার এক ছাত্রী গণমাধ্যমের কাছে যা বলেছে, তা অকল্পনীয় ঘটনা। তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। যারা হামলা করেছে, তারা সবাই চিহ্নিত।’

হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করে তিনি বলেন, ‘আক্রান্ত শিক্ষার্থীরা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে তাদেরকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসা না দিয়ে বের করে দিয়েছে। এটা খুবই অমানবিক। আন্দোলনকারী যাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের অবিলম্বে মুক্তি দাবি করছি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, ‘একটি যোক্তিক আন্দোলন করে শিক্ষার্থীরা হাতুড়িপেটা খেয়েছে। এই হাতুড়ি শুধু শিক্ষার্থীদের মেরুদণ্ড ভাঙেনি, এটি বাংলাদেশে মানচিত্রের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। মেয়ে শিক্ষার্থীরা শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এদেশে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার অধিকার সবার আছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা হামলার প্রতিবাদ করতে গিয়েও পাল্টা হামলার শিকার হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে উল্টো মামলা করে তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমরা এ ষড়যন্ত্রমূলক মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতিকে উদ্দেশ্যে করে তিনি বলেন, ‘আমরা অতীতে দেখেছি শিক্ষক সমিতি শিক্ষার্থীদের পাশে ছিল। তাদের ওপর হামলা হলে তারা শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার খরচ বহন করতেন। কিন্তু বর্তমান শিক্ষক সমিতি এসব বিষয়ে কোনো ভূমিকা রাখেনি।’

সমাবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. গীতি আরা নাসরীন শিক্ষকদের পক্ষে পাঁচ দফা দাবি পেশ করেন। দাবিগুলো হল— সকল হামলাকারীর বিচার করতে হবে; আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে; আক্রান্তদের চিকিৎসার ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে; নারী আন্দোলনকারীদের ওপর যৌন নিপীড়কদের বিচার করতে হবে; কোটা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি, দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে।

সমাবেশে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক তাসনীম মাহমুব সিরাজ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ফাহমিদুল হক, আর্ন্তজাতিক বিভাগের শিক্ষক তানজীম উদ্দিন খান প্রমুখ। এছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন।

রাশেদের মুক্তি দাবিতে ঢাবি ব্যাংকিং বিভাগের মানববন্ধন: এদিকে কোটা সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম-আহ্বায়ক রাশেদ খানসহ অন্য ছাত্রদের নিঃশর্ত মুক্তি দাবিতে মানববন্ধন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্সুরেন্স বিভাগ বিভাগের শিক্ষার্থীরা। রাশেদ এই বিভাগের এমবিএ’র ছাত্র।

বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মাহবুবুল হক বলেন, ‘কোটা সংস্কারের দাবি যৌক্তিক। যার গুরুত্ব বুঝে প্রধানমন্ত্রী কোটা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। এই যৌক্তিক আন্দোলন করার কারণে রাশেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমরা রাশেদসহ সবার নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানাই।’

সাদিয়া আফরিন নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘এ ক্যাম্পাস কারোর একার নয়। কিন্তু এ ক্যাম্পাসে মেয়েদের ওপরেও হামলা হয়েছে। আমরা এ হামলার বিচার চাই।’

মানববন্ধনে শিক্ষার্থীদের হাতে ‘চাইতে গিয়ে অধিকার, সইব কতো অত্যাচার’, ‘নিরাপদ ক্যাম্পাস চাই’, ‘চারদিকে হামলা কেন?’, ‘রাশেদের বাবাকে হুমকি কেন?’, ‘অবিলম্বে প্রজ্ঞাপন দাও’, ‘রাশেদ কেন জেলে?’ ইত্যাদি লেখা সংবলিত প্ল্যাকার্ড দেখা যায়।