মুক্তিযোদ্ধা স্বামীর কাছে বীরাঙ্গনার চিঠি

প্রিয়তম,
তোমার স্মৃতির বাহক হয়ে আমি আজো বেঁচে আছি, বিদায়লগ্নের শেষ চুমুটি কপোলে না দিয়ে, দিয়েছিলে কপালে! সে স্পর্শ অনুভব করেই কাটিয়ে দিয়েছি যুগ-যুগান্তর। বিয়ের চার মাস গত না হতেই মুক্তিযুদ্ধের ডাক এলো, তিন মাসের অন্তঃস্বত্বা আমাকে পরিবারের জিম্মায় রেখে চলে গেলে ভারতে। শ্রাবণধারাসম অশ্রু ঝরা চোখে ক্রমশ দূরে চলে যাওয়া দেহটা পানে তাকিয়ে রইলাম। দেশপ্রেমিকের স্ত্রী আমি, স্বামী স্বাধীনতা যুদ্ধের সৈনিক! কতো যে গর্ব আমার, হাত বুলাই তলপেটে, তোমার আমানতের গায়ে! সেই সাথে হাত উঠে আসে কপালের শেষ চুম্বন স্থানটিতে!

প্রিয়তম,
প্রাণ উজাড় করে ভালবেসেছিলাম তোমাকে,
আগত সন্তানের জন্মদাতা তুমি! ষোলটি বসন্তপুষ্ট দেহখানা তোমাকেই সঁপেছিলাম!
তোমার সন্তানকে সূর্যের আলো দেখাতে ব্যর্থ হয়েছি আমি! দেশ মাতৃকার স্বাধীনতার বিনিময়ে তুমি শহীদ হয়েছ! ছয় মাস হানাদার ক্যাম্পে অপেক্ষার পর জেনেছি, স্বামী সন্তান হারিয়ে আমিও স্বাধীনতা পেয়েছি! সেই স্বাধীনতা, যে স্বাধীনতা তুমি প্রাণের বিনিময়ে ছিনিয়ে এনেছো! যে স্বাধীনতা, আমার সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে! যে স্বাধীনতা না তুমি, না তোমার সন্তান দেখে যেতে পেরেছো!

এতো ত্যাগের বিনিময়ে যে প্রাপ্তি, আমি তা না দেখে কি পারি প্রিয়তম! হয়তো তাই, রক্তঝরা অশ্রুমাখা চোখে না দেখা সন্তান আর স্বল্পদিনের পরিচিত তোমাকে বুকের গহীনে ধারণ করে মাটি আঁকড়ে আজো বেঁচে আছি!

বেঁচে আছি প্রিয়তম, স্বাধীন মাতৃভুমি বাংলা মায়ের আঁচলে জড়িয়ে নিজেকে! তোমার আত্মদান, তোমার ভুমিষ্ঠ না হওয়া সন্তানের আত্মদান! একটি মানচিত্র, একটি স্বাধীন ভুখন্ড দিয়েছে আমাকে। তুমি শহীদ হয়ে ভাল করেছ প্রাণপ্রিয় স্বামী আমার!নইলে হজম করতে পারতে না যে চরম মূল্য দিতে হয়েছে আমাকে এই স্বাধীনতার জন্যে!

হে স্বর্গবাসী প্রিয়তম স্বামী আমার! শিহরিত হয়োনা সে কাহিনী শুনে, তুমি যুদ্ধে যাবার পরের মাসেই তোমার বাড়ী ঘর জ্বালিয়ে, হানাদারেরা পরিবারের সকলকে গুলি করে হত্যা করে! আমি যে আয়ুস্মতী, হারামী রাজাকারেরা আমাকে গুলি না করে ধরে এনেছিল। মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীকে তো চরম মূল্য দিতেই হবে! হানাদারদের ক্যাম্পে আমাকে একপাল নর-পিশাচের মাঝে ছেড়ে দেয়া হল!

প্রিয়তম,
যে দেহটি সোহাগে-সোহাগে তুমি মাত্র চারমাস সযতনে ব্যবহার করেছিলে!তোমার সেই নবযৌবনা অন্তস্বত্বা সোহাগীনিকে পাষন্ডেরা দোলে পিষে একটি জ্যান্ত মাংসপিন্ডে পরিণত করেছে! ওখানেই তোমার আমানত কখন-কবে যে, আমার জরায়ু থেকে খসে গেছে টেরও পাইনি! আমার ইহ-পরকালের সাথী ওগো, অজ্ঞান হয়ে কদিন ছিলাম জানিনা। জ্ঞান ফেরার সাথে সাথে রক্তাক্ত মাংসপিন্ডটির উপর মুসলিম নামধারী পাকি হানাদার গুলো যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়তো, আঠার হাজার সৃষ্টজীবের মাঝে সবচেয়ে হিংস্র প্রাণীটিও লজ্জায় ঘেন্নায় মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হতো!
যে কোনো পশুও এদের চেয়ে শতগুণ উত্তম!

প্রিয়তম,
যতোবার অজ্ঞান হয়েছি, তার চেয়ে বেশী বার আত্মহত্যা করতে চেয়েছি, প্রতিবারই আমি ব্যর্থ হয়েছি!

হে শহীদ, মুক্তিযোদ্ধা স্বামী আমার, পবিত্র দেহটি রেখে গিয়ে নিজেও দেশের জন্যে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছ! আর আমি, সন্তান তো দূরে নিজ দেহটির পবিত্রতাও জলাঞ্জলী দিয়েছি!

প্রিয়তম,
আজ আমি বীরাঙ্গনা উপাধিপ্রাপ্ত! ছয় দশকের বেশী এ বাংলার জলবায়ু আমাকে লালন করেছে! বিধাতার বিধিলিপি স্বামী সন্তানহারা করেও ছাড় দেয়নি! স্বাধীন দেশের স্থাপতি জাতির জনক মুজিব কন্যার মর্যাদায়
বীরাঙ্গনা বানিয়ে আমাকে আজো বাঁচিয়ে রেখেছেন!

প্রিয়তম,
আমি আজো পৃথিবীর বোঝা বাড়িয়ে বেঁচে আছি! আমার সিঁথিতে এখন চলনবিলের বকেরা উড়ে, উপরের পাটির দুটি দাঁতও হয়েছে নড়বড়ে। তোমার উদ্দেশ্যে চিঠিটাও লিখছি মোটা কাঁচের চশমা পরে!

হে প্রিয়তম, মুক্তিযোদ্ধা স্বামী আমার! চির বিদায়লগ্নে এঁকে যাওয়া কপালের চুম্বন ছোঁয়াটুকুকে স্পর্শ করার জন্যে, আজো আমি বেঁচে আছি! পাষাণখন্ডে পরিণত হওয়া নিঃস্বঙ্গতার করালগ্রাসে নিপতিত এই আমি!

ইতি,
“তোমার স্মৃতির বোঝা বাহক”।

লেখক: কবি, সাংবাদিক সৈয়দ শফীক সিংহী