আসামের মুসলিমদেরকেও কি বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হবে?

 

নিউজ ডেস্ক : বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন ভারতের আসাম থেকে বহিস্কার হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন রাজ্যটিতে বাস করা প্রায় ৪৮ লাখ মানুষ, যাদের বেশিরভাগই আবার মুসলিম। সম্প্রতি ভারতের একজন শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ১৯৭১ সালের আগে থেকেই যে আসামে বাস করছেন তার সপক্ষে কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন এই বিপুল সংখ্যক মানুষ।

ভারতের নাগরিকদের তালিকা সংক্রান্ত দপ্তর ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অব সিটিজেন (এনআরসি) আসামের নাগরিকদের প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করতে যাচ্ছে। গত ছয় দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো এমন একটি তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। তাদের মতে, এর উদ্দেশ্য হলো, কাগজপত্রবিহীন লোকদের শনাক্ত করা ও বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো।

আসামের নাগরিকদের তথ্য হালনাগাদ করার দায়িত্বে নিয়োজিত এনআরসি’র কর্মকর্তা প্রতীক হাজেলা কাতার ভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেন, ‘শনিবার প্রাথমিক তালিকাটি প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। প্রায় ৪৮ লাখ লোক নাগরিকত্বের জন্য যথাযথ প্রমাণ দেখাতে পারেনি।’ এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো এ ধরনের একটি তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে। এর আগে তালিকাটি বছরের শুরুতে প্রকাশ করা হয়েছিল।

হিন্দু জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী দল বিজেপি ২০১৬ সালে আসাম রাজ্যের ক্ষমতায় আসার পর এ উদ্যোগটি নেয়া হয়। আসামের অর্থ ও স্বাস্থ্য বিষয়ক মন্ত্রী হেমন্ত বিশ্বাস শর্মা বুধবার বলেন, ‘যাদের নাম এনআরসির তালিকা থাকবে না, তাদেরকে বহিষ্কার করা হবে।’ কিন্তু তাদেরকে বহিষ্কার করে কোথায় পাঠানো হবে, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানাননি।

তিনি জানান, প্রাথমিক তালিকা প্রকাশের আগে সীমান্ত এলাকায় ৪০ হাজারের বেশি পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। হেমন্ত বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা কোনো ঝুঁকি নিতে চাই না, আর সে জন্য সব ধরনের নিরপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।’

তবে, বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত হিন্দুদের ভারতে থাকতে দেওয়া হবে। নিপীড়নের শিকার হিন্দুদের আশ্রয়দানের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি অনুসারে এটি করা হবে বলে আসামের অর্থ ও স্বাস্থ্য বিষয়ক মন্ত্রী জানান।

৮০-র দশকে অভিবাসন বিরোধী বিক্ষোভ-সহিংসতায় আসামে শত শত মানুষের প্রাণ যায়। পরে সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সমঝোতা হয় যে, ১৯৭১ সালের ২৪ শে মার্চের পর আসামে আসা মানুষদের বিদেশি হিসেবে গণ্য করা হবে। ভারতের নাগরিক প্রমাণের জন্য আসামের বাসিন্দাদের প্রমাণ করতে হবে যে, তারা ওই তারিখের আগ থেকে সেখানে বসবাস করছে।

নাগরিকদের তালিকা তৈরির বিষয়টি তদারকি করছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। চূড়ান্ত তালিকা তৈরি, এবং আসাম সরকারকে তা যাচাইয়ে ৩০ জুন অবধি সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত। বেঁধে দেওয়া সময়ে মধ্যে তালিকা প্রস্তুত অসম্ভব উল্লেখ করে ফেব্রুয়ারিতে সরকার সময় বাড়ানোর আবেদন করলে তা খারিজ করে আদালত জানায়, সরকারের কাজ অসম্ভবকে সম্ভব করা।

মন্ত্রী হেমন্ত বিশ্বাস শর্মা না বললেও আসামের স্থানীয় রাজনীতিকরা বলছেন, কাগজপত্রবিহীন সকল নাগরিককে বাংলাদেশে পাঠানো হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ আসামের বাসিন্দা বিশেষত মুসলিমদের জন্য রোহিঙ্গাদের মতো দুর্ভোগ বয়ে আনবে। গত বছর মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নিপীড়নের কারণে রাখাইন থেকে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।

বাংলাদেশে বিতাড়নের বিষয়ে লেখক সঞ্জয় হাজারিকা আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা ইতিহাস পুনরায়র লিখতে পারি না। পক্ষপাতদুষ্ট, সংকীর্ণ, বিভেদ সৃষ্টিকারী দল আসামের সামাজিক বুননকে পাল্টে দেবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিপদজনক বিষয় হচ্ছে, শত্রুতার জের ধরে কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তির গায়ে ‘বাংলাদেশি’ লেবেল সেঁটে দেওয়া।’

বিরাজমান পটভূমিতে নাগরিকত্ব হারিয়ে বহিষ্কার ঝুঁকিতে রয়েছে আসামের প্রায় অর্ধ কোটি মানুষ। তবে কি ভারতের আসাম আরেকটি রাখাইন হচ্ছে। এই মানুষগুলো কোথায় যাবে? তাদেরকে কি শেষ অবধি সত্যিই বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়া হবে? এটা এখন এতদঞ্চলের স্থিতি ও শান্তি-শৃঙ্খলার এবং উল্লেখিত জনগোষ্ঠীর জানমালের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর প্রশ্ন হয়ে দেখা দিতে পারে অবিচরেই।