২৫ মার্চ সাধারণ কোনো রাত নয়!

শিশির ভট্টাচার্য্য, পরিচালক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলের স্বাতন্ত্র্যকামী অধিবাসীদের প্রতি আর্যাবর্ত তথা উত্তরাঞ্চলের আধিপত্যকামী অধিবাসীদের ঘৃণা ও শোষণের ইতিহাস মহাভারতের মতোই সুপ্রাচীন। এরই ধারাবাহিকতায় পূর্ববঙ্গের বাঙালি মুসলমান বিংশ শতকের কয়েক দশক ধরে পাকিস্তান আন্দোলন করেছিল নিজেদের ভাগ্য নিজেরা গড়বে বলে। পশ্চিম পাকিস্তান তথা আর্যাবর্তের পাঞ্জাবি মুসলমানরা একেবারে শেষ দিকে পাকিস্তান আন্দোলনে যোগ দিয়ে শোষণ করার জন্য মুফতে একটি কলোনি পেয়ে গিয়েছিল ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলে। গরম পানির ডেকচি থেকে তপ্ত তেলের কড়াইতে গিয়ে পড়েছে বুঝতে পারার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ১৯৪৮ সালে বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন শুরু করেছিল, তারই ফলে প্রায় দুই দশক পর সৃষ্টি হয়েছিল আজকের বাংলাদেশ।

ভূমি, নদী, সাগর, পাহাড়, আকাশ—সবকিছু মিলিয়ে যদিও একটি দেশ, তবু ‘দেশ’ বলতে প্রধানত বোঝায় এর মননশীল মধ্যবিত্ত জনগণ। ‘আমি ভাবি বলেই আমি অস্তিত্ববান’ বলেছিলেন ফরাসি দার্শনিক দেকার্ত। সুতরাং সঠিক যুদ্ধকৌশলের অংশ হিসেবেই পাকিস্তানি বাহিনী হানা দিয়েছিল বাঙালি জাতির ভাবনা তথা অস্তিত্বের দুর্গ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এটিই পৃথিবীর একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়, যেটির ভূমির অনেকখানিই শহীদের রক্তে রঞ্জিত। এই রক্ত বৃথা যায়নি, কারণ একদিকে বাঙালি মুসলমানের অবিমৃশ্যকারিতার অন্যতম উদাহরণ যে ‘পাকিস্তান’, তার অবসানের শুভসূচনা হয়েছিল ২৫ মার্চ রাতে। অন্যদিকে ২৫ মার্চ না হলে কখনোই পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানের মোহভঙ্গ হতো না, অর্থাৎ তারা বুঝতেই পারত না যে তারা প্রথমত এবং প্রধানত বাঙালি, ঠিক যেমন ইরানিরা বা তুর্কিরা প্রথমত ইরানি বা তুর্কি, তারপর তারা মুসলমান। জাতিগত ও রাজনৈতিক আশা-আকাঙ্ক্ষার পার্থক্য যদি ধর্মগত ঐক্যের তুলনায় প্রবলই না হবে, তবে একদল ধর্মভাই রাতের অন্ধকারে অন্য ধর্মভাইদের আক্রমণ করবে কেন? একই ধর্ম ও কমবেশি একই সংস্কৃতির আরব উপদ্বীপে একাধিক দেশই-বা প্রতিষ্ঠিত হবে কেন?

রাষ্ট্রগঠনের উদ্যোগ নিয়েছে, এমন বিশ্ববিদ্যালয় পৃথিবীতে সম্ভবত এই একটিই আছে। রাষ্ট্রগঠনের উদ্যোগ নেওয়ার ‘অপরাধে’ আক্রান্ত হয়েছে—এমন বিশ্ববিদ্যালয়ও পৃথিবীতে সম্ভবত দ্বিতীয়টি নেই। ২৫ মার্চ রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আক্রান্ত হওয়া এবং একটি বর্বর হানাদার বাহিনীর হাতে এর নিরস্ত্র, নিরীহ ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিহত হওয়ার একটি প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে আর্যাবর্তের বর্বর মানসিকতার সঙ্গে পূর্ব ভারতের অন্যতম শান্তিকামী জাতি বাঙালিদের স্বাধিকার আন্দোলনের দ্বন্দ্বের জ্বলন্ত প্রতীক ২৫ মার্চের এই কালরাত। এই রাতে বাঙালি তথা ভারতবর্ষের ইতিহাসের গতিপ্রকৃতি অন্ততপক্ষে আরও বহু শতকের জন্য অনেকটাই নির্ধারিত হয়ে গেছে। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এই বিশেষ রাতটি একটি মাইলস্টোন, যদিও বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই এই সত্যটা এখনো সম্যক উপলব্ধি করে উঠতে পারেননি।

একদিকে ঘৃণা, অন্যদিকে ভালোবাসা
বনি আদম, সহযোগী অধ্যাপক, চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাত থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে নিধনযজ্ঞ শুরু করেছিল, বাংলাদেশের আনাচকানাচে অসংখ্য গণকবর বা বধ্যভূমি যেন সেই পৈশাচিকতারই সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বধ্যভূমি বা গণকবরগুলোর একটি রয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শহীদ শামসুজ্জোহা হল’কে প্রায় নয় মাস ধরেই ক্যান্টনমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করে। এই হলের পেছনে এক মাইল এলাকাজুড়ে ছিল বধ্যভূমি। এই বধ্যভূমিতে পাকিস্তানি সেনারা হাজার হাজার নারী-পুরুষকে হত্যা করে ফেলে রাখে। জোহা হলের অর্ধ মাইল দূরে পূর্ব কোণে ১৯৭২ সালের ২৩ এপ্রিল আবিষ্কৃত হয় একটি গণকবর। কবর খননে মেলে সহস্র মানুষের মাথার খুলি-কঙ্কাল। কবর থেকে মেলে আরও অনেক কিছুই। যেমন, ব্যবহৃত হাতঘড়ি ও কলম পাঁচটি, দুটি টুপি, এক ও দশ টাকার নোট মেলে তিন শ টাকা, একটি চাবির রিং, দুটি সাইকেলের চাবি, দুটি কানের দুল, তিনটি সিগারেট লাইটার, একটি মানিব্যাগ, একটি কাজলের টিউব, ওড়না, পাথর বসানো আংটি, চিরুনি, নারীদের কার্ডিগান ইত্যাদি। (সুকুমার বিশ্বাস, একাত্তরের বধ্যভূমি ও গণকবর, ঢাকা: অনুপম প্রকাশনী, ২০১৫) শহীদদের স্মরণে এখানে ১৯৯২ সালের ১৬ ডিসেম্বর একটি স্মৃতিফলক উন্মোচন করা হয়। স্মৃতিফলক উন্মোচন করেন শহীদ বুদ্ধিজীবী মীর আবদুল কাইয়ুমের স্ত্রী অধ্যাপক মাস্তুরা খানম। কিন্তু সেদিন রাতেই ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মীরা স্মৃতিফলকটি ভেঙে ফেলে। পরে এই স্থানে ২০০৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় গণকবর স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করা হয়।

৩১ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট স্মৃতিস্তম্ভটি প্রায় এক একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। স্তম্ভের সামনে রয়েছে মুক্তমঞ্চ। এই স্মৃতিস্তম্ভের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০০২ সালে। গোলাকৃতি একটি চৌবাচ্চাকে ভেদ করে চৌকোনাকৃতি স্তম্ভটি কয়েকটি ধাপে ওপরের দিকে উঠে তুলনামূলকভাবে সরু হয়ে গেছে। স্তম্ভের চৌকোণাকৃতি ইটের দেয়াল ভেঙে এবড়োখেবড়োভাবে গড়া। দেখে মনে হয় গুলির আঘাতে দেয়ালের বুকে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। দেয়ালের এমন রূপ দেওয়া হয়েছে, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের বাঙালিদের নির্মম নির্যাতনের মধ্য দিয়ে হত্যার বিষয়টি তুলে ধরতে এবং সে স্মৃতিই ধারণ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই স্মৃতিস্তম্ভ। এ স্তম্ভের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন প্রকাশ পেয়েছে পাকিস্তানি বাহিনী এবং এ দেশীয় ঘাতকদের প্রতি তীব্র ঘৃণা অন্যদিকে অসীম ত্যাগ স্বীকারকারী বাঙালি শহীদদের প্রতি প্রগাঢ় শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বধ্যভূমি। ছবি: স্বপ্ন নিয়ে
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বধ্যভূমি। ছবি: স্বপ্ন নিয়ে
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
পৈশাচিক গণহত্যার নীরব সাক্ষী
মো. মোক্তার হোসেন, অধ্যাপক, উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

১৯৭১ সালের এ মাসের শেষের দিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় এরপর এদের সঙ্গে আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটির সদস্যরা মেতে ওঠে দেশের জনগণ, বুদ্ধিজীবী এবং রাজনৈতিক নেতাদের অমানবিক নির্যাতন এবং বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞে। সারা দেশের মতো ময়মনসিংহের বিভিন্ন জায়গায় গণহত্যা চালানো হয়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসংলগ্ন ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে গণকবর দেয় হানাদার বাহিনী। ময়মনসিংহ শহর ও আশপাশের এ দেশের শিক্ষক, কৃষিবিদ, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, আইনজীবী, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিসেবী ও পদস্থ সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা—কেউ রেহাই পাননি। পরবর্তী সময়ে দেশ স্বাধীন হয়। বিজয়ের পতাকা হাতে নিয়ে এই গণকবরের কাছে আপনজনদের খুঁজে ফেরেন অনেকেই। স্বাধীনতা অর্জনের পর সেখানে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ না থাকলেও ‘বধ্যভূমি’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তারপর দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে ছিল শহীদ বাঙালিদের গণকবরের এই স্থানটি। ১৯৯৩ সালে ১৪ নভেম্বর তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক শাহ মোহাম্মদ ফারুকের উদ্যোগে বিভিন্ন অবয়ব দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করা হয় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বধ্যভূমি।

আমি তখন দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। সেই থেকেই প্রতিবছর ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবসে এবং ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে বধ্যভূমিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সব সদস্য ও শিশু-কিশোরেরা সেখানে সমবেত হয়। নতুন প্রজন্ম বধ্যভূমির ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ধারণা লাভ করে। তা ছাড়া, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পবিবারের ১৮ জন সদস্য শহীদ হন মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে। কেউ যুদ্ধ করতে গিয়েও শহীদ হয়েছেন। তাঁদের অনেকের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিক হল রয়েছে। বধ্যভূমিতে দাঁড়িয়ে তরুণ প্রজন্ম প্রবীণদের কাছ থেকে আত্মত্যাগের গল্প শোনে। প্রতিবছরই শহীদদের পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে স্মরণ করি বটে, কিন্তু জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যাকারী ও যড়যন্ত্রকারীদের অনেককে শনাক্ত করতে পারিনি আমরা। এটা এখন সময়ের দাবি—বর্তমান তরুণ প্রজন্মের দাবি। নৃশংস ও বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে জড়িত সবাইকে এ দেশের মাটিতে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। যাতে কেউ অন্য কোনো জাতির ওপর এ ধরনের আচরণ না করতে পারে।