তামিম ইকবালের ব্যাটে লারা ফিরে আসেন

নিউজ ডেস্ক: ব্যাটিংয়ে বোধহয় তার একমাত্র দুর্বলতা লেগ স্ট্যাম্পের ওপর কোমর লেংথের বল। কিন্তু মাঝে মাঝে শর্টবলগুলো এমন অসাধারণ পুল আর হুকে সবার আওতার বাইরে পাঠান যে মনে হয় তিনি যেন উপমহাদেশের কোনও বাঁহাতি ব্যাটসম্যান নন, এন্টিগাতে ৪০০ রানের পথে ব্যাট করতে থাকা ব্রায়ান লারা।

নিতান্তই ভালোবাসার খাতিরে খেলা দেখার ফাঁকে ফাঁকে খেলাটা বিশ্লেষণ করা আমাদের সকলেরই কমবেশি অভ্যাস। প্রিয় খেলোয়াড়ের ভূমিকা সেখানে বরাবরই অগ্রাধিকার পায়। ব্রায়ান লারা নব্বইয়ের দশকে বেড়ে ওঠা যেকোন ক্রিকেটপ্রেমীর প্রিয় ব্যাটসম্যানের তালিকায় আছেন। কিন্তু তার অবসরের পরও যখন যোজন যোজন দূরের ক্রিকেটপাগল এক দেশের ওপেনিং ব্যাটসম্যান সেই ত্রিনিদাদের রাজপুত্রের মতো মাঝে মাঝে অবিকল শট খেলতে থাকেন, তখন ক্রিকেটিয় সৌন্দর্য্য যেন আলাদা মাত্রা পায়।

বুঝতে পারছেন কাকে নিয়ে এই রোমাঞ্চকর উচ্ছ্বাস? অপার সম্ভাবনা নিয়ে শুরু করা একটি ক্যারিয়ারকে পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর এক যোদ্ধার, তিনি তামিম ইকবাল।

যোদ্ধা কথাটি এই মুহূর্তে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের প্রতিনিধিত্ব করা প্রত্যেক সদস্যের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। হোন তিনি মাশরাফি, হোন তিনি রুবেল হোসেন, এমনকি তামিম ইকবাল নিজেই বা যুদ্ধে কম যান কিসে!

খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, ত্রিশ রান পেরোতে না পেরোতেই ক্লান্তির ইংগিত, পঞ্চাশ হতে না হতেই ইনিংসের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অপ্রয়োজনীয় চান্স নেয়া শুরু হতো। কখনও বল মাঠ পেরোতো, কখনও নিজেকেই মাঠ পেরোতে হতো। নিজের খেলা নিয়ে তখন আগ্রাসী ব্যাপারটা ছাড়া অন্যকোন কিছুর দিকে নজর কম। তাই নিজের খেলার ধরণ নিজের কাছেই ছিল একটা বাজি।

দিনের পর দিন রান পাননি। অসাধারণ কোন স্কয়ার কাটে যে ইনিংসের শুরু, ঠিক তখনই না খেললেও চলতো এমন লফটেড শট খেলে আউট। আবার কখনও লেগ সাইডের বাইরে বেরিয়ে যাওয়া একদম ‘ইজি পিকিং’ ধরণের একটি বলে খোঁচা মারতে গিয়ে কিপারের কাছে ক্যাচ। অথবা ভেতরে ঢুকতে থাকা বলে ফ্রন্টফুট ডিফেন্স করতে গিয়ে প্লাম ইনফ্রন্ট!

তবে হ্যাঁ! লফটেড শট! বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে মূল্যবান ইনিংস খেলেছিলেন তামিমের চাচা আকরাম খান, ছোটবেলা থেকেই যিনি নিজের এই ভাতিজা সম্পর্কে ছিলেন প্রবল আশাবাদী এবং আত্মবিশ্বাসী। তামিমের প্রবল রানখরার সময় নির্বাচক থাকায় পারিবারিক সম্পর্কটাও বারবার আলোচিত হচ্ছিলো। কিন্তু এমন লফটেড শট যে খেলতে পারে, অহংকারের তুঙ্গে থাকা ভারতীয় দলের ওপর নিজের দম্ভ যে এভাবে প্রকাশ করতে পারে, তাকে দল থেকে বাদ দেয়া যে কোন নির্বাচকের পক্ষেই কঠিন।

যে সুযোগটা আশরাফুল, আফতাব আহমেদ, অলক কাপালি বা তুষার ইমরানরা কাজে লাগাতে পারেননি, ইকবাল পরিবারের প্রথম টেস্ট খেলোয়াড় নাফিস ইকবাল অথবা অমিত সম্ভাবনাময় ব্যাটসমান শাহরিয়ার নাফিস হয়তো যেই সুযোগটি পানইনি, আবার জাভেদ ওমরের মতো খেলোয়াড় যে সুযোগ পেয়ে ধরে রাখার চেষ্টা করেননি,সেই সুযোগটাই কাজে লাগানোর যুদ্ধে নামলেন তামিম। এবং সেই যুদ্ধে এখনও পর্যন্ত তার যে অগ্রগতি তাতে সামনে আরও পরিণত, আরও দায়িত্বশীল এবং আরও ধৈর্য্যশীল এক তামিম ইকবাল হিসেবে দেখলে যে কারো কাছেই তার ক্যারিয়ারের শুরুর দিক মনে হবে একটি অলৌকিক ঘটনা।

বাংলাদেশ আজ নিজমাঠে রীতিমত শক্তিশালী এক প্রতিপক্ষ। আর সেই শক্তির এক পরম নির্ভরযোগ্য উৎস হলেন তামিম। টানা চার ফিফটির উদযাপনে সমালোচিত তামিম আজ এক প্রান্ত আগলে রেখে নিজের ইনিংস বড় করতে থাকেন নির্লিপ্তভাবে। আর তার যোগানো আত্মবিশ্বাসে স্ট্রোক আসতে অপর প্রান্ত থেকে। একেবারে থিতু হয়ে এবার হাত খোলেন তামিম। বেরিয়ে আসতে থাকে সুন্দরতম সব লফটেড কাভার ড্রাইভ, পা তুলে হুক, ডাউন দ্য উইকেট গিয়ে লফটেড ইনসাইড আউট- কোনটা ছেড়ে কোনটা বলবেন!

প্রতি ম্যাচে যেন আরও কার্যকরী, আরও ক্ষুরধার হচ্ছেন তামিম, সাকিব, মুশফিক, মাহমুদুল্লাহরা । আর এই যাত্রায় মাশরাফি এক কিংবদন্তি অধিনায়ক। নিজেদের পারফরমেন্সের তাগিদে, কোটি কোটি ক্রিকেটভক্তের তাগিদে এবং তাদের পেছনে ব্যয় করা উল্লেখযোগ্য সব বিনিয়োগকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর তাগিদে এই অগ্রযাত্রায় মূখ্য ভূমিকা পালন করছেন উপরিল্লিখিত পাঁচজন। এই ‘পঞ্চপান্ডবের’ উপস্থিতি আর কিছু নিবেদিতপ্রাণ, অকুতোভয়, স্মার্ট ক্রিকেটারদের নিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল শিগগিরই পরিণত হতে যাচ্ছে এক ইতিহাসের অংশ হয়ে যাওয়া দলে; এ আশা আমরা করতেই পারি এখন।