তেত্রিশ বছর কাটল বেতন ছাড়া

নিউজ ডেস্ক: মাওলানা মো. আনোয়ার হোসেন পটুয়াখালীর কলাপাড়ার দক্ষিণ নতুনপাড়া করিমিয়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক। ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত শরীরে গতকাল রোববার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সহকর্মীদের সঙ্গে শুয়ে ছিলেন। ১ জানুয়ারি থেকে সেখানে প্রথমে অবস্থান কর্মসূচি ও ৯ জানুয়ারি থেকে আমরণ অনশন করছেন তিনি।

কাছে গিয়ে বসে পরিচয় জানানোর পরই আনোয়ার হোসেন শুরু করলেন তার জীবনের করুণ গল্প। ৩৩ বছর আগের কথা, ১৯৮৪ সালের ১১ জুন মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের নিবন্ধন ও স্বীকৃতি পেয়েছিল তার প্রতিষ্ঠান। সেই থেকেই তার শিক্ষকতা শুরু। ৩৩ বছরে এক টাকাও সরকারি বেতন পাননি! নতুনপাড়া গ্রামের বাসিন্দাদের দেওয়া মাসিক চাঁদা ও প্রতিষ্ঠানের একমাত্র পুকুরের মাছ বিক্রির টাকায় চলে মাদ্রাসাটি। নামমাত্র বেতন পান। মিলাদ ও জানাজা পড়িয়ে আরও কিছু টাকা হাতে আসে। দারিদ্র্যক্লিষ্ট পরিবারের ঘানি টেনে চলেছেন বহু কষ্টে। কথা বলার সময় তার চোখ দিয়ে নীরবে গড়িয়ে পড়ছিল অশ্রু।

আনোয়ার হোসেনের মতো শত শত শিক্ষক এখন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আমরণ অনশন করছেন। মাঘের প্রচণ্ড শীত ও হিমেল বাতাসের মধ্যে তারা ফুটপাতে নির্ঘুম রাত পার করছেন। এরই মধ্যে ১৬৫ জনের বেশি শিক্ষক গুরুতর অসুস্থ হয়েছেন। তিন দশকের বেশি সময় বিনা বেতনে শিক্ষকতা করে আসা শিক্ষকরা চান সরকারি বেতন। এর আগে একই দাবিতে তারা অনেকবার আন্দোলন করেছেন। সামরিক ও গণতান্ত্রিক বিভিন্ন সরকারের আমলে তাদের জাতীয় বেতন স্কেলভুক্ত করারও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ইবতেদায়ি মাদ্রাসার ৩৪ হাজার শিক্ষকের অবস্থা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জনপ্রিয় কবিতার মতোই- ‘কেউ কথা রাখেনি’।

দাবি পূরণে গতকাল শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সঙ্গে বৈঠক করেন শিক্ষকরা। তাদের ২২ সদস্যের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রী অনশন ভেঙে শিক্ষকদের মাদ্রাসায় ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করেন। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে শিক্ষকদের দাবি পূরণে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। তবে শিক্ষকরা তাতে সম্মত হননি। তারা সুনির্দিষ্ট ঘোষণা চান। ফলে বৈঠক নিষ্ম্ফল হয়েছে।

সমস্যার উৎপত্তি যেখানে : বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের বিপাঠামারা স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষক আবদুল মালেক হাওলাদার জানান, তার প্রতিষ্ঠানে ৮০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তারা সরকার থেকে বিনামূল্যের বই ও উপবৃত্তিসহ অনেক কিছুই পায়। কেবল শিক্ষকরা বেতন পান না। তিনি জানান, তার প্রতিষ্ঠানটি ১৯৮৪ সালের ১ জানুয়ারি সরকারি স্বীকৃতি পায়। ৩৩ বছরেও শিক্ষকরা সরকারি কোনো অর্থ পাননি। বগুড়া সদরের রঘুনাথপুর নয়াপাড়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক মো. কামাল পাশা জানান, তার প্রতিষ্ঠানটিও একই বছর নিবন্ধিত। ১৪৪ শিক্ষার্থীর এ মাদ্রাসা এলাকার মানুষের অনুদানে চলে। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের মন্দিরগাঁও জালালিয়া সুন্নিয়া ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষক মো. আবু সাঈদ বলেন, বছরে দুইবার ভাদ্র ও অগ্রহায়ণ মাসে তারা এলাকার গ্রামগুলো থেকে ধান তোলন। তা বিক্রি করেই মাদ্রাসা চলে। শিক্ষকদের সবার গল্প প্রায় একই রকম।

শিক্ষকদের দেওয়া তথ্যে জানা গেল, চরম মানবেতর জীবন যাপন করছেন সারাদেশের স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার প্রায় ৩৪ হাজার শিক্ষক। অর্থের অভাবে মাদ্রাসাগুলোও চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। অনেক শিক্ষক মাদ্রাসা ছেড়ে চলে গেছেন। আবার অনেক মাদ্রাসা বন্ধও হয়েছে। যেগুলো চালু আছে, সেগুলোর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মাত্র একজন করে শিক্ষক রয়েছেন। সারাদেশের প্রায় ১৮ হাজার ১৯৪টি নিবন্ধিত মাদ্রাসার মধ্যে এখন চালু আছে প্রায় ১০ হাজার।

 

মাদ্রাসা শিক্ষার প্রাথমিক স্তরকে বলা হয় ‘ইবতেদায়ি’। স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা হলো- যেগুলোর সঙ্গে মাধ্যমিক (দাখিল) শাখা সংযুক্ত নেই। কিছু কিছু মাদ্রাসায় সরকার নামমাত্র অনুদান দেয়। ১০ হাজার মাদ্রাসার মধ্যে মাত্র ১ হাজার ৫১৯টি মাদ্রাসায় ৪ জন করে শিক্ষক মাসে ২৩০০ টাকা ভাতা পান। আর প্রধান শিক্ষকদের ভাতা ২৫০০ টাকা। তাও পান তিন মাস পর পর। অবশিষ্ট মাদ্রাসার শিক্ষকরা কোনো আর্থিক সুযোগ-সুবিধাই পান না। প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলোয় প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী লেখাপড়া করে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হয়। স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হলেও প্রাথমিক শিক্ষা খাতে বরাদ্দ অর্থ ও সুযোগ-সুবিধা এসব প্রতিষ্ঠান পায় না। সেখানকার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

জানা যায়, সারাদেশের সাড়ে ৮ হাজার স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় বর্তমানে ৩৪ হাজার শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। এগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ।

বৈষম্য চরমে : বাংলাদেশ স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষক সমিতির নেতারা সমকালকে জানান, ১৯৯৪ সালে এক পরিপত্রে নিবন্ধিত স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা ও প্রাইমারি শিক্ষকদের বেতন ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে নিবন্ধিত ২৬ হাজার ১৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়। কিন্তু ১৮ হাজার ৫১৯টি মাদ্রাসার শিক্ষকের ক্ষেত্রে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

সংগঠনের সভাপতি আলহাজ কাজী রুহুল আমিন চৌধুরী বলেন, ২০১৩ সালে মহাজোট সরকার ১ হাজার ৫১৯টি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রত্যেক শিক্ষককে এক হাজার টাকা সম্মানী ও ২০০ টাকা করে মহার্ঘ্য ভাতা ঘোষণা করে। গত বছর তা ২৩০০ ও প্রধান শিক্ষকদের ২৫০০ টাকায় উন্নীত করা হয়। এ শিক্ষককরা সামান্য অর্থ পেলেও আরও প্রায় সাড়ে আট হাজার নিবন্ধিত মাদ্রাসার শিক্ষকরা বিনা অর্থে শ্রম দিচ্ছেন। তারা চরম কষ্টে দিন পার করছেন। এ অবস্থায় আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে।

মানিকগঞ্জের ঘিওর মদিনাতুল উলুম ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা রফিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সময়ে কারও পক্ষে ২৩০০ টাকায় জীবনধারণ করা যায় না। একজন দিনমজুরও মাসে নয় থেকে ১০ হাজার টাকা আয় করেন। তিনি আকুতি জানিয়ে বলেন, আমাদেরও সংসার আছে, সন্তান আছে। আমরাও একটু ভালোভাবে বাঁচতে চাই। অপর শিক্ষক মাওলানা আজিজুল হক বলেন, ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলো কীভাবে চলছে কেউই জানে না। এসব মাদ্রাসার শিক্ষকদের যেন বেতন পাওয়ার অধিকার নেই! মাদ্রাসাগুলোয় শিক্ষাসামগ্রী ও আসবাবপত্র নেই। ৩৩ বছর ধরে শুধুই অবহেলিত। শিক্ষকরা আর এখানে থাকতে চান না। ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় শিক্ষকও খুঁজে পাওয়া যায় না। আর বেতনের কথা তো কাউতে বলাও যায় না।

শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য : শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তাদের দাবি পূরণের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষকরা রাস্তায় কষ্ট করুক তা কারও কাম্য নয়। তবে দাবি পূরণের সময়টুকু তো সরকারকে দিতে হবে। ৩৩ বছর অপেক্ষা করেছেন, আর একটু অপেক্ষা করলে তাদের প্রত্যাশা নিশ্চয়ই পূরণ হবে।