ভোক্তাদের আস্থা অর্জন ও তা রক্ষা করাই আর্থিক খাতের প্রধানতম লক্ষ্য – ড. আতিউর রহমান

“বিশ্বাস বা আস্থাই আর্থিক খাতের মূল কথা। কারণ সব ধরনের লেনদেনই হয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর থাকা কালে আমি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আর্থিক অন্তর্ভূক্তি আর আর্থিক খাত সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছি, আর এভাবেই ভোক্তাদের আস্থা রক্ষা করার চেষ্টা করেছি।”- বলেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান। ২২ ডিসেম্বর , ২০১৭ বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির ২০তম দ্বিবার্ষিক কনফারেন্সে ‘অর্থশাস্ত্র ও নৈতিকতা: বিশেষ প্রায়োগিক ক্ষেত্রসমূহ’ শিরোনামের অধিবেশনে সভাপতির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। অধিবেশনে এ বিষয়ে বেশ কয়েকটি গবেষনা নিবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবুল বারাকাত এবং বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির কোষাধ্যক্ষ ড. মোস্তাফিজুর রহমান।

ড. আতিউর বলেন অর্থনীতি একটি নৈতিক বিজ্ঞান, এটি প্রায়োগিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। সীমিত সম্পদের ওপর বিপুল পরিমাণ মানুষের জীবন নির্ভর করে। আর অর্থনীতি এই মানুষদের বহুবিধ এবং প্রায়শ পরস্পরবিরোধী মূল্যবোধ, স্বার্থ এবং ক্ষমতা নিয়ে কাজ করে। তিনি আরও বলেন যে বাস্তবাদিতা অর্থনীতি ও নীতিশাস্ত্রের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। মানুষের কর্মকা- নিয়ন্ত্রণকারি নিয়ম ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে ভাবাটাই অর্থনীতিবিদদের কাজ। সর্বশেষ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে মানুষ আর্থিক খাতের ওপর বিশ্বাস হারিয়েছে, রাজনীতির ওপর আস্থা রাখতে পারছেনা, এমনকি বিশ্বায়নের প্রক্রিয়ার ওপরও তাদের আস্থা নেই বলে মনে করেন ড. আতিউর। এখন এই আস্থা পুনরুদ্ধার করাটাই প্রধানতম লক্ষ্য হওয়া উচিৎ বলে তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশে ভোক্তাদের আস্থা রক্ষার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা প্রসঙ্গে ড. আতিউর বলেন- “বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর স্বাক্ষরিত টাকার নোটের ওপর জনগণ অগাধ আস্থা রাখেন। আর তাই তারা লেনদেনের জন্য এই নোট ব্যবহার করেন। এই আস্থার কারণেই তারা এই ব্যাংক নোটকে মূল্য সংরক্ষণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। প্রতিদিন যে শত-সহ¯্র লেনদেন ঘটছে এবং এর ফলে যে অর্থনীতির চাকা চলমান রয়েছে এর পেছনেও রয়েছে এই আস্থা। এই নোটের মান সংরক্ষণ করা বাংলাদেশ ব্যাংকের পবিত্র দায়িত্ব, এটি কেবল আইনি দায় নয়, বরং একটি নৈতিক দায়িত্ব।”

এছাড়াও আমানতকারি ও ঋণগ্রহিতাদের আস্থা রক্ষার জন্য আর্থিক খাতের স্বচ্ছতার গুরুত্ব নিয়েও ড. আতিউর আলোচনা করেন। আমানতকারি ও ঋণগ্রহিতারা যেন আর্থিক সেবা নিতে গিয়ে হতাশ না হন তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। বাংলাদেশের সংবিধানের মূল নীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক অন্তর্ভূক্তি ও আর্থিক খাতের সবুজায়নের নৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন যে নৈতিক ভিত্তি থেকেই আমাদের সংবিধানে সাম্য ও অন্তর্ভূক্তির কথা বলা হয়েছে এবং উন্নয়ন কৌশল প্রস্তুত করা হয়েছে, আর এ লক্ষ্য অর্জনে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যথেষ্ট ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। কাজেই পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর, বিশেষত যে সমস্ত দূর্বল ব্যাংক সাম্প্রতিক সময়ে আমানতকারিদের ঠিক মতো সুদ দিতে ব্যর্থ হচ্ছে সেগুলোর ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি বাড়াতে হবে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।