এবি ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে রদবদল

নিউজ ডেস্ক : অর্থপাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত চলা অবস্থায় পদত্যাগ করলেন বেসরকারি আরব-বাংলাদেশ (এবি) ব্যাংকের চেয়ারম্যান এম ওয়াহিদুল হকসহ তিন পরিচালক। একই সঙ্গে তিনজন নতুন পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনাপত্তির পর তিন পরিচালকের নিয়োগ কার্যকর হবে।

মঙ্গলবার রাজধানীর লা মেরিডিয়ান হোটেলে অনুষ্ঠিত বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) থেকে এম ওয়াহিদুল হকের অনুপস্থিতিতে এসব পরিবর্তন এসেছে।

এজিএমে এবি ব্যাংকের অন্যতম শেয়ারহোল্ডার ও বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোরশেদ খান, তার ছেলে ফয়সাল মোরশেদ খানসহ উদ্যোক্তা ও শেয়ারহোল্ডাররা উপস্থিত ছিলেন। ব্যাংকটির প্রায় ২৫ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা মোরশেদ খানের হাতে। দীর্ঘদিন তিনি ব্যাংকটির চেয়ারম্যানও ছিলেন।

এজিএমে ওয়াহিদুল হক, ভাইস চেয়ারম্যান সেলিম আহমেদ ও পরিচালক ব্যারিস্টার ফাহিমুল হক পদত্যাগপত্র দিলে তা গৃহীত হয়। এরপর শূন্য পদে মোস্তাক আহমদ চৌধুরী, সাজির আহমেদ এবং শিরীন শেখ মাঈন উদ্দিনকে নতুনভাবে পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে সাজির পদত্যাগকারী ভাইস চেয়ারম্যান সেলিম আহমেদের ছেলে। আর মোস্তাক আহমদ ও শিরীন শেখ মোরশেদ খানের প্রতিনিধি।

জানতে চাইলে বিএনপি নেতা এম মোরশেদ খান বলেন, ‘তিনজনের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ায় স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় তারা বিদায় নিয়েছেন। নতুন করে তিনজন পরিচালক হয়েছেন।’

আর মালিকানা পরিবর্তনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি তো জানি না। আমি শুনেছি কারা ইতিমধ্যে নিয়ে নিয়েছে। আসলে গুজবের কোনো কমতি নেই।’

এছাড়া ব্যাংকটির পরিচালক এম এ আওয়াল নতুন চেয়ারম্যান ও ফিরোজ আহমেদ ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছেন বলে মোরশেদ খানের পক্ষ থেকে বলা হলেও তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে ব্যাংকের কোম্পানি সচিব মহাদেব সরকার সুমন বলেন, ‘আইনি বাধ্যবাধকতায় তিনজন পরিচালকের মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন করে তিনজনকে দিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এখন নতুন তিন পরিচালকের অনাপত্তির জন্য তা বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অনুমোদনের পর অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের বৈঠক থেকে নতুন চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচন করা হবে। ফলে কেউ বলে থাকলে তা সঠিক নয়।’

এবি ব্যাংকের অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট থেকে বিদেশে নিবন্ধিত চার কোম্পানিকে ৫ কোটি ১০ লাখ ডলার সমপরিমাণ প্রায় চারশ’ কোটি ঋণের নামে পাচারের অনুসন্ধান করছে দুদক। ঋণের নামে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সিঙ্গাপুরে এসব অর্থ পাচার হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক পরিদর্শনে উঠে আসে। অর্থপাচারের সঙ্গে সরাসরি সংশ্নিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে পদত্যাগী চেয়ারম্যান এম ওয়াহিদুল হক, সাবেক এমডি এম ফজলুর রহমান ও শামীম আহমেদ চৌধুরী এবং ব্যাংকের হেড অব ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউট অ্যান্ড ট্রেজারি আবু হেনা মোস্তফা কামালের বিরুদ্ধে। ঋণের নামে দেওয়া অর্থের মধ্যে ৩০৭ কোটি টাকা অনাদায়ি থাকায় ইতোমধ্যে তা খেলাপি হয়ে গেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত ৬ মে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

জানতে চাইলে এম ওয়াহিদুল হক বলেন, তিনিসহ তিনজনের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ায় তারা অবসরে গেছেন। এখানে অস্বাভাবিকতার কিছু নেই। আর শারীরিক অসুস্থতার কারণে এজিএমে অংশ নিতে পারেননি বলে তিনি জানান।

সংশ্নিষ্টরা জানান, সাধারণভাবে বছর শেষ হওয়ার পরবর্তী দুই মাসের মধ্যে এজিএম ডেকে আর্থিক প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার কথা। তবে অর্থপাচারসহ বিভিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্ধারিত সময়ে এজিএম করতে না পারায় পদত্যাগী চেয়ারম্যানের ওপর বিভিন্ন কারণে শেয়ার হোল্ডারদের ক্ষোভ ছিল। যে কারণে তিনি এজিএমে অংশ না নিয়ে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন।

এর আগে গত ১৭ আগস্ট একবার আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় ব্যাংকটির এজিএম হওয়ার কথা ছিল। তবে ১৪ আগস্ট পরিচালনা পর্ষদের সভায় তা বাতিল করা হয়। এরপর ২১ ডিসেম্বর কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবে এজিএম ও বিশেষ সাধারণ সভা করার ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে গত রোববার আবার স্থান পরিবর্তন করে লা মেরিডিয়ানে নেওয়া হয়। দফায় দফায় ব্যাংকটির এজিএমের স্থান ও তারিখ পরিবর্তন নিয়ে মালিকানা পরিবর্তনের বিষয়ে ব্যাংক খাতে নানা গুঞ্জন ছিল।

সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, একজন টানা দুই মেয়াদে ৬ বছর পরিচালক থাকতে পারেন। আংশিক মেয়াদ পূর্ণ মেয়াদ হিসাবে ধরা হয়। ২০১৩ সাল থেকে মেয়াদ গণনা শুরু হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০০৭ সালে এবি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিচালক হিসেবে জায়গা পাওয়া ওয়াহিদুল হক ২০০৮ সাল থেকে ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন। একই সময় থেকে ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছিলেন সেলিম আহমেদ।