চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন মন্ত্রী ছায়েদুল হক

নিউজ ডেস্ক: সর্বস্তরের মানুষের ভালোবাসা নিয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের জননেতা, সংসদ সদস্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী অ্যাডভোকেট ছায়েদুল হক।

রোববার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে উপজেলার পূর্বভাগ গ্রামে তার তৃতীয় দফা জানাজা হয়। এরপর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পারিবারিক কবরস্থানে মা-বাবার কবরের মাঝখানে তার মরদেহ সমাহিত করা হয়।

এর আগে সকাল পৌনে ১০টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ছায়েদুল হকের প্রথম জানাজা হয়। জানাজায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, ডেপুটি স্পিকার, সংসদ সদস্য এবং আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশ নেন। জানাজার পর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার প্রতি ঢাকা জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান করা হয়।

পরে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমীন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের পক্ষ থেকে নূর-ই-আলম চৌধুরী ও হুইপবৃন্দ, বিরোধীদলীয় নেতার পক্ষে বিরোধীদলীয় হুইপ মো. নূরুল ইসলাম ওমর, পার্লামেন্ট মেম্বার্স ক্লাবের পক্ষে এ বি তাজুল ইসলাম ছায়েদুল হকে কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে তার মরদেহ বহনকারী হেলিকপ্টার নাসিরনগর ডিগ্রি কলেজসংলগ্ন হেলিপ্যাডে অবতরণ করে। ঢাকা থেকে তার মরদেহ নিয়ে আসেন সাবেক আইনমন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীম। এ সময় মরদেহ গ্রহণ করেন প্রয়াতের সহকর্মী আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক এমপি এবং জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সদর আসনের সংসদ সদস্য র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী।

এখান থেকে মরদেহ নেওয়া হয় আশুতোষ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। সেখানে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার প্রতি গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। এ সময় বিউগলের করুণ সুরে বিশাল মাঠে শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে তার দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন প্রয়াতের একমাত্র ছেলে ডা. এ এস এম রায়হানুল হক ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীম।

জানাজায় অংশ নেন আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক এমপি, সাবেক আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু এমপি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর আসনের সংসদ সদস্য র. আ. ম. উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ (বাঞ্ছারামপুর) আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী এ বি তাজুল ইসলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধা, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. নজরুল আনোয়ার, জেলা প্রশাসক রেজওয়ানুর রহমান, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শফিকুল আলম এমএসসি, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল-মামুন সরকার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইকবাল হোসাইন, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ এ. কে. একরামুজ্জামান, নাসিরনগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এ টি এম মনিরুজ্জামান সরকার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিয়াকত আলী, সাবেক উপমন্ত্রী অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির, স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মঈন উদ্দিন মঈন, কেন্দ্রীয় কৃষক লীগ নেতা এম এ করিম, কেন্দ্রীয় সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ফরহাদ হোসেন সংগ্রাম, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ডা. রাফিউদ্দিন আহমেদ প্রমুখ। জানাজায় জেলার বিভিন্ন এলাকা ও নির্বাচনী এলাকার অর্ধলক্ষাধিক মুসল্লি অংশ নেন। এর পর বর্ষীয়ান এই জননেতার মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন মন্ত্রী, এমপি, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, উপজেলা প্রশাসনসহ সর্বস্তরের মানুষ। এ সময় সেখানে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।

দ্বিতীয় দফা জানাজার পর ছায়েদুল হকের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় নিজ বাড়ি পূর্বভাগ গ্রামের পশ্চিমপাড়ায়। সেখানে বাদ জোহর পূর্বভাগ এসইএসডিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তৃতীয় দফা জানাজার পর পারিবারিক কবরস্থানে তার মরদেহ সমাহিত করা হয়।

কর্মসূচি

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী অ্যাডভোকেট ছায়েদুল হকের মৃত্যুতে তিন দিনের শোক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে নাসিরনগর উপজেলা আওয়ামী লীগ। শোক কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে কালো পতাকা উত্তোলন, কালো ব্যাজ ধারণ ও মিলাদ মাহফিল। সোমবার থেকে এই শোক কর্মসূচি শুরু হয়।

সংক্ষিপ্ত জীবনীপঞ্জি

অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ ছায়েদুল হক ১৯৪২ সালের ৪ মার্চ নাসিরনগর উপজেলার পূর্বভাগ ইউনিয়নের পূর্বভাগ গ্রামে জন্ম নেন। তার বাবা সুন্দর আলী, মা মেহের চান্দ বিবি। ১৯৬৬ সালে তিনি ছয় দফা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যোগ দেন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৮ সালে অর্থনীতিতে এমএ ডিগ্রি নেওয়ার পর তিনি এলএলবি পাস করে আইন পেশায় নিযুক্ত হন।

একাত্তরের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ছায়েদুল হক ১৯৭৩ সালে প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নাসিরনগর আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন।

এর পর ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি ১২ জানুয়ারি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। এর আগে তিনি নবম জাতীয় সংসদে খাদ্য, দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ছিলেন।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে মোহাম্মদ ছায়েদুল হক মৎস্য খাতের ব্যাপক উন্নয়ন করেন। তার সময়েই মাছ ও ছাগল উৎপাদনে বাংলাদেশ সারাবিশ্বে চতুর্থ স্থান অর্জন করে। তার প্রচেষ্টায় ইলিশ উৎপাদনেও ঈর্ষণীয় সাফল্য আসে। এ সময় নাসিরনগরে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়।