চট্টগ্রামের শোকের ছায়া: মহিউদ্দিন চৌধুরীর জানাযায় মানুষের ঢল

রণজিত কুমার শীল, চট্টগ্রাম: বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের বর্ষীয়ান নেতা, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি, সিটি কর্পোরেশনের সাবেক সফল মেয়র, বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী (৭৪) আর নেই (ইন্নালিল্লাহি….. রাজিউন)।

বৃহস্পতিবার দিবাগত ভোর রাত সাড়ে তিনটার দিকে নগরীর মেহেদি বাগস্থ বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতালে তিনি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, পুত্র-কন্যাসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন, শুভাকাক্সক্ষী ও রাজনৈতিক অঙ্গনের হাজার হাজার নেতা-কর্মী রেখে গেছেন। চট্টগ্রামের সিংহ পুরুষ অবিসংবাদিত নেতা ও অভিভাবক মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুতে সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে আসে।

আজ সকালে হাসপাতাল থেকে চৌধুরীর মরদেহ নগরীর ষোলশহরস্থ চশমা হিলের বাসভবনে নেয়া হলে বর্ষীয়ান এ নেতাকে শেষবারের মত দেখতে হাজার হাজার নেতা-কর্মীসহ অসংখ্য মানুষ সেখানে ভিড় জমায় এবং তাঁর মরদেহে ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর দুপুরে মহিউদ্দিন চৌধুরীর মরদেহে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতিময় স্থান নগরীর দারুল ফজল মার্কেটের দলীয় কার্যালয়ের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাণের নেতা মহিউদ্দিনকে শেষ শ্রদ্ধা জানান চট্টগ্রামবাসী। আজ শুক্রবার বাদ আছর চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে লাখ লাখ মানুষের অংশগ্রহণে প্রয়াত এ নেতার নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ইমামতি করেন মাওলানা আনিসুজ্জামান।

এ সময় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি, পানি সম্পদ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, বরিশাল-১ আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, আ’লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এমপি, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির নেতা ও সাবেক এমপি জাফরুল ইসলাম চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী, বিএনপির স্থায়ী কমিটি সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, সংসদ সদস্য ডা. আফসারুল আমীন, সাংসদ নজরুল ইসলাম চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল মান্নান, পুলিশ কমিশনার মো. ইকবাল বাহার, জেলা প্রশাসক মো. জিল্লুর রহমান চৌধুরী, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এম এ সালাম, সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম, দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমদ, সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান, উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নুরুল আলম চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ চট্টগ্রাম মহানগর ইউনিট কমান্ডার মোজাফফর আহমদসহ আরও অনেকে জানাজায় অংশ নেন।

জানাযায় লাখ লাখ মানুষের ভিড়ে লালদিঘী ময়দান ছাড়িয়ে আশপাশের বিভিন্ন এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে। জানাজার আগে প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিনের মরদেহে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। পরে বাংলাদেশ আ’লীগ, প্রধানমন্ত্রী, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড, রাজনৈতিক সংগঠন, পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার মরদেহে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়। এরপর সন্ধ্যায় নগরীর ষোলশহরস্থ চমশা হিলের পারিবারিক কবরস্থানেই পিতার কবরের পাশে মহিউদ্দিন চৌধুরীর দাফন সম্পন্ন করা হয়।

মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ, দক্ষিণ উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলা ইউনিট কমান্ড, চবি শিক্ষক সমিতি, চবি ভিসি, চুয়েট ভিসি, প্রিমিয়ার বিশ^বিদ্যালয় ও ইউএসটিসিসহ অনেকে গভীর শোক প্রকাশ করে শোকাহত পরিবার-পরিজনের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন।

মহিউদ্দিন চৌধুরীর বড় ছেলে ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল সাংবাদিকদের জানান, বাবার কবরের পাশেই চট্টগ্রামের জনমানুষের নেতা মহিউদ্দিন চৌধুরীকে সমাহিত করা হয়। বৃহস্পতিবার  নিজ বাসায় মৃদু হার্ট অ্যাটাক এবং কিডনিজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি আলহাজ এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে গত ১১ নভেম্বর রাতে ম্যাক্স হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরদিন দুপুরে মহিউদ্দিনকে হেলিকপ্টারে ঢাকায় নিয়ে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১৬ নভেম্বর অসুস্থ মহিউদ্দিনকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সিঙ্গাপুরের অ্যাপোলো গ্লিনিগ্যালস হসপিটালে মহিউদ্দিনের এনজিওগ্রাম এবং হার্টের দুটি ব্লকে রিং বসানো হয়।

সিঙ্গাপুরে ১১ দিনের চিকিৎসা শেষে ২৬ নভেম্বর রাতে মহিউদ্দিনকে নিয়ে দেশে আসেন স্বজনরা। এরপর তাকে আবারও স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গত মঙ্গলবার (১২ ডিসেম্বর) মহিউদ্দিনকে নিয়ে চট্টগ্রামে ফেরেন স্বজনরা। প্রায় ১৭ বছর চট্টগ্রামের মেয়র ছিলেন মহিউদ্দিন। রাজনীতি ও সমাজসেবায় অসামান্য অবদানের জন্য চট্টগ্রামবাসী তাকে চট্টল বীর হিসেবে জানে।

এবিএম মহিউদ্দীন চৌধুরী ১৯৪৪ সালের ১ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার গহিরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। ২০০৫ সালের মেয়র নির্বাচনে তিনি ক্ষমতাসীন বিএনপির একজন মন্ত্রীকে পরাজিত করে তৃতীয়বারের মতো চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। মৃত্যুর আগে তিনি চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন।