বিচারকদের শৃঙ্খলা বিধি আদালতে উঠছে

নিউজ ডেস্ক: সাংবিধানিকভাবে বৈধ প্রক্রিয়ায় নিম্ন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলা বিধি জারি হয়নি বলে দাবি করেছেন দেশের সংবিধান ও আইন বিশেষজ্ঞরা। সংবিধান বিশেষজ্ঞ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম বলেছেন, সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের নির্দেশনা অনুযায়ী এ বিধিমালা জারি হয়নি। এটি জারি হয়েছে ১৩৩ অনুচ্ছেদের আলোকে।

ওই অনুচ্ছেদে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শৃঙ্খলা বিধির শর্তাবলী রয়েছে। ১১৬ অনুচ্ছেদের নির্দেশনা রয়েছে নিম্ন আদালতের যাবতীয় কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রপতি করবেন সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ অনুযায়ী। কিন্তু এই বিধিমালায় আইন মন্ত্রণালয়কে নিয়ে আসা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টের আইন মন্ত্রণালয়কে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।

নিম্ন আদালতের বিচারকদের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ করা হয়েছে যথাক্রমে রাষ্ট্রপতি ও আইন মন্ত্রণালয়কে। রাষ্ট্রপতির ভূমিকা আইন মন্ত্রণালয় পালন করতে পারে না। রাষ্ট্রপতির নামে সবকিছুই আইন মন্ত্রণালয় করবে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক দাবি করেছেন, কোনোভাবেই সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা খর্ব করা হয়নি। রাষ্ট্রপতি এবং সুপ্রিম কোর্টের মধ্যে পরামর্শের ভিন্নতা হলে সুপ্রিম কোর্টের মতামতই প্রাধান্য পাবে।

এদিকে আজ বুধবার নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা বিধিমালার জারিকৃত গেজেট আদালতে উপস্থাপন করা হবে। সোমবার নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিধিমালা গেজেট আকারে জারি করে সরকার। বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে গত তিন বছর ধরে টানাপোড়নের পর এই বিধিমালা জারি করা হয়।

জারিকৃত বিধিমালায় নিম্ন আদালতের বিচারকদের এবং ‘নিয়োগকারী’ কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্রপতিকে করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি এবং আইন মন্ত্রণালয়কে নিম্ন আদালতের বিচারকদের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ হিসাবেও নির্ধারণ করা হয়েছে। জারিকৃত বিধিমালা নিয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও মাসদার হোসেন মামলার আইনজীবীরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

এরই ধারাবাহিকতায় মাসদার হোসেন মামলার প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম বলেন, আমাদের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে ‘বিচার-কর্মবিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচারবিভাগীয় দায়িত্বপালনে রত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল- নির্ধারণ, পদোন্নতিদান ও ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃংখলাবিধান রাষ্ট্রপতির উপর ন্যস্ত থাকিবে এবং সুপ্রিম কোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তাহা প্রযুক্ত হইবে।’ এর সারমর্ম হলো নিম্ন আদালতের বিচারকদের বিষয়ে রাষ্ট্রপতি যাযা করবেন সবই হবে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শে। এখানে আইন মন্ত্রণালয়কে টেনে আনার কোনো সুযোগ নেই।

এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও এ সংক্রান্ত নথি যাবে না। যেমন ধরুন ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে বলা আছে ‘এই সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তাহার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেন। এটা কিন্তু একটা ব্যতিক্রম।

এর মানে এই না সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শের বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাবে। সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির যে পরামর্শের কথা বলা হয়েছে এই পরামর্শে ‘কালেক্টিভ উইল’ থাকতে হবে। অর্থাত্ সুপ্রিম কোর্ট এই বিষয়ে বারের সঙ্গেও পরামর্শ করবে। অন্যদিকে প্রধান বিচারপতি অন্যান্য বিচারপতির মতামত গ্রহণ করবেন। অর্থাত্ সর্বসম্মত মতের ভিত্তিতেই রাষ্ট্রপতির কাছে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ যাবে।

ব্যারিস্টার আমীর বলেন, এ বিষয়গুলো অবশ্যই সুপ্রিম কোর্টের নজরে আনা হবে। আমি ইতোমধ্যেই দুই-তিন দিন কোর্টকে বলেছি। ভেতরে ভেতরে কি আলোচনা হচ্ছে কেউই জানতে পারছি না। আমি উদ্বেগ প্রকাশ করেছি। কার সাথে কি আলোচনা হচ্ছে, আইনমন্ত্রীর সাথে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির। এখানে রাষ্ট্রপতিও অনুপস্থিত প্রধান বিচারপতিও অনুপস্থিত। প্রধান বিচারপতি সবসময়ই থাকতে হবে। ভারপ্রাপ্ত হয় যখন প্রধান বিচারপতি অসুস্থ হন বা কাজ পরিচালনা করতে পারছেন না তখন।

তবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক দাবি করেছেন, এই বিধি প্রণয়নের মধ্য দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা আরো বেড়েছে। তবে ‘না বুঝে’ অনেকেই এই বিধিমালার সমালোচনা করছেন। তিনি বলেন, সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদকে শিরোধার্য মনে করে এই বিধিমালা করা হয়েছে। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা হয়েছে এবং আপিল বিভাগের সকল বিচারপতির সঙ্গে বসেই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, মাসদার হোসেন মামলার যে ১২টি নির্দেশনা ছিল তার সাত নম্বর নির্দেশনায় যা ছিল সেটাকেও এটার মধ্যে গ্রহণ করে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এই শৃঙ্খলা বিধি করা হয়েছে।

তিনি বলেন, যারা সিভিল সার্ভিসে আছেন তাদেরও কিন্তু একটা আচরণ বিধি আছে। জুডিসিয়াল সার্ভিস ও সিভিল সার্ভিসের আচরণ বিধির মধ্যে যদি আকাশ-পাতাল পার্থক্য হয় সেটা কারো কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। বিচার বিভাগের জন্য যেখানে বিশেষ বিধান রাখা দরকার সেখানে তা রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি যখন জুডিশিয়ারির ব্যাপারে কোনো কাজ করেন, তিনি আইন মন্ত্রণালয়কে তার সেক্রেটারিয়েট হিসেবে ব্যবহার করেন। সেক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রপতির কাছে নথি চালাচালির জন্য একটা অফিস হিসেবে ব্যবহূত হয়।