জেরুজালেম তুমি কার?

জেরুজালেমের ইতিহাস: বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিক শহর জেরুজালেম। শহরটির পূর্বে এশিয়া, পশ্চিমে ইউরোপ আর দক্ষিণে আফ্রিকা মহাদেশ। এ জন্য অনেকে জেরুজালেমকে পৃথিবীর কেন্দ্র বলে দাবি করেন। এই অঞ্চলে মানুষের বসতি আজ থেকে প্রায় সাত হাজার বছর আগে থেকে। বিভিন্ন সময়ে এই অঞ্চল দখল ও শাসন করেছেন মিসরীয়, ব্যবিলিনীয়, রোমান ও পারস্য সম্রাটেরা।

কিন্তু কোনো শক্তিই এখানে একনাগাড়ে শাসন করতে পারেনি। অটোমান তুর্কিদের ৪০০ বছরের শাসন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরই ধসে পড়ে। ১৯১৭ সালে জেরুজালেম দখলে নেওয়ার পর তিন দশক ব্রিটিশরা এখানে শাসন করে। জায়নবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে কয়েক লাখ ইহুদি শহরটিতে পাড়ি জমাতে থাকে তৎকালীন ব্রিটিশ অধ্যুষিত প্যালেস্টাইনে। এতে স্থানীয় মুসলিমদের সঙ্গে কয়েকবার দাঙ্গা বাধে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে জাতিসংঘ ফিলিস্তিন দুভাগে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়।

একটি হবে ইহুদিদের রাষ্ট্র, অন্যটি আরব ফিলিস্তিনিদের। ওই সিদ্ধান্তমতে, জেরুজালেম শাসিত হওয়ার কথা একটি আন্তর্জাতিক বিশেষ কাঠামো অনুযায়ী। আরবরা ওই পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে। ইসরায়েল ১৯৪৮ সালে তাদের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। তার একদিন পরই আরব প্রতিবেশী দেশগুলো আক্রমণ করে ইসরায়েলকে। কিন্তু আরবরা পরাজিত হয়।

যুদ্ধের পর পশ্চিম অংশ দখলে নেয় ইসরায়েল। ১৯৫০ সালে ইসরায়েলের এক নতুন আইন অনুযায়ী এই পশ্চিম জেরুজালেম হয়ে ওঠে তাদের রাজধানী। অন্যদিকে পূর্ব জেরুজালেম, যেখানে পবিত্র ওল্ড সিটি ছিল, তা ছিল জর্ডানের দখলে। এরপর ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে মাত্র ছয় দিনের মধ্যে ইসরায়েল শুধু আরব দেশগুলোকে পরাজিতই করেনি, তারা মিসরের কাছ থেকে গাজা তীর ও সিনাই উপত্যকা দখলে নিয়ে নেয়। জর্ডানের কাছ থেকে নিয়ে নেয় পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম।

১৯৭৭ সালে ডানপন্থি লিকুদ পার্টি ইসরায়েলের ক্ষমতায় আসার পরই ইহুদি জাতির সঙ্গে জেরুজালেমের সম্পর্ককে অবিচ্ছেদ্য হিসেবে প্রচার করা হয়। যার ফলে জেরুজালেমের গুরুত্ব ইহুদিদের কাছে আরও বেড়ে যায়। এরপর মুসলিমদের জন্য শহরের আল আকসাসংলগ্ন অংশে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে রাখে তারা। কয়েক দফায় সহিংসতা, গণঅভ্যুত্থান ও আন্তর্জাতিক চাপেও ফিলিস্তিনিদের কাছে জেরুজালেমের দখল ছাড়েনি ইসরায়েল। ধর্মীয় ও ভৌগৌলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় পূর্ব জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ দাবি করে আসছে ফিলিস্তিন।

ধর্মীয় গুরুত্ব : তিনটি প্রধান ধর্মের (ইসলাম, খ্রিস্টান, ইহুদি) কাছেই জেরুজালেম অত্যন্ত পবিত্র জায়গা। ইসলাম ধর্মমতে, মুসলিমদের অন্যতম ধর্মীয় স্থান আল-আকসা; জেরুজালেমে অবস্থিত মসজিদ আল আকসা বা বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে মহানবী হযরত মুহম্মদ (স) মেরাজে গিয়ে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন।

ইহুদিরা মনে করে, এখানেই তাদের আদি নিবাস। ইহুদিদের পবিত্র ভূমিখ্যাত টেম্পল মাউন্ট বা ঈশ্বরের ঘর, যা মুসলিমদের কাছে পবিত্র কুব্বাত আস-সাখরা। টেম্পল মাউন্টকে ঘিরে থাকা ওয়েস্টার্ন ওয়াল ইহুদিদের কাছে পৃথিবীর ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে স্বীকৃত। আবার যিশুখ্রিস্টের বহু স্মৃতিবিজড়িত গির্জার কারণে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের কাছেও পবিত্রতার দিক থেকে সমান গুরুত্বপূর্ণ জেরুজালেম। খ্রিস্টানদের বিশ্বাস, জেরুজালেমের বেথেলহামে যিশুর জন্ম আর এই শহরেই ক্রুশ বিদ্ধ করা হয়েছিল যিশুকে।

ইসরায়েলের অবস্থান : ১৮৪৮ সালে ইসরায়েলি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পরই ইসরায়েল জেরুজালেমের পশ্চিমাংশে দেশের সংসদ ভবন স্থাপন করে। ১৯৬৭ সালে আরবদের সঙ্গে যুদ্ধে জিতে ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেমও দখল করে নেয় এবং পুরো জেরুজালেম শহরটিকে ইসরায়েলি রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৮০ সালে আইন জারি করে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী দাবি করলেও ফিলিস্তিনিরা ও অন্য কোনো রাষ্ট্র এটির স্বীকৃতি দেয়নি।

মুসলমান ও ফিলিস্তিনিদের কাছে অত্যন্ত মর্যাদাকর বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবেশে বিভিন্ন সময় নিয়ন্ত্রণ করে সহিংসতায় জড়ায় ইসরায়েল। সর্বশেষ এ বছরের জুলাইয়ে মাউন্ট টেম্পলে সহিংসতাকে কেন্দ্র করে মুসলিমদের জন্য বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ বন্ধ রাখে। প্রবল প্রতিবাদ ও আন্তর্জাতিক চাপে ১৭ দিন পর প্রবেশদ্বার খুলতে বাধ্য হয় ইসরায়েল। ট্রাম্প জেরুজালেমকে রাজধানী ঘোষণায় বিশ্বব্যাপী সমালোচনার ঝড় উঠলেও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের প্রশংসা করে বলেন, জেরুজালেমের দীর্ঘদিনের ইতিহাসে তার নাম লেখা থাকবে। এ ছাড়া তিনি ট্রাম্পকে অনুসরণ করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।

ফিলিস্তিনিদের অবস্থান : ফিলিস্তিনিরা কোনো দিনই জেরুজালেমের দখল মেনে নেয়নি। গত দশকগুলোয় পূর্ব জেরুজালেমের বহু জায়গায় ইহুদি বসতি বানিয়েছে, কিন্তু তার পরও এখানকার সিংহভাগ বাসিন্দা ফিলিস্তিনি, যারা বহু বছর ধরেই এই শহরে বসবাস করছে। তারা চায়, পূর্ব জেরুজালেম হবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী।

ফিলিস্তিনি নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থ স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণাকে কবর দিয়ে দেওয়া। এ বছরও হামাস নেতারা জেরুজালেমকে রাজধানী ঘোষণা করে ফিলিস্তিনের সীমারেখা প্রস্তাব করেন, কিন্তু ইসরায়েল তা নাকচ করে দেয়। গত শুক্রবার রামাল্লা, বেথলেহেম, হেবরনসহ বিভিন্ন শহরে জুমার নামাজের পর ব্যাপক বিক্ষোভ করেছে তারা।

এ সময় ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে কয়েক জায়গায় সংঘর্ষ ও কয়েকজন হতাহত হয়েছে। আটক করা হয়েছে অনেককে। এ ছাড়া ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি সমর্থন জানিয়ে গতকাল মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ও শহরে শহরে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। আবার ট্রাম্পের ঘোষণার পরদিন বৃহস্পতিবার নতুন করে গণঅভ্যুত্থানের ডাক দিয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস।

মার্কিন প্রেসিডেন্টদের নানামুখী উদ্যোগ : জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণার সিদ্ধান্তটি বেশ পুরনো। ১৯৯৫ সালেই মার্কিন কংগ্রেস অনুমোদিত এক আইনে ইসরায়েলের মার্কিন দূতাবাস তেলআবিব থেকে জেরুজালেমে স্থানান্তর করার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও তার পরবর্তীরা ক্ষমতায় থাকাকালীন ওই প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার জন্য স্বাক্ষর করেন।

১৯৯৩ সালে হোয়াইট হাউসে বিল ক্লিনটনের মধ্যস্থতায় অসলো চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন ইয়াসির আরাফাত ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিন। এর মাধ্যমে আইএলওকে স্বীকৃতি দেয় ইসরায়েল এবং পরে পারস্পরিক সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরিতে সাহায্য করে চুক্তিটি।

সমস্যা নিরসন না হওয়ায় এরপর ১৯৯৫, ১৯৯৮, ২০০০ ও ২০০১ সালে ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন বিল ক্লিনটন। ১৯৯৮ সালে বিল ক্লিনটন প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ফিলিস্তিন সফরে যান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শান্তি প্রতিষ্ঠা ও দুটি আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় তিনি ফলপ্রসূ হতে পারেননি। জর্জ বুশ ক্ষমতায় এসে দুই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে এবং ফিলিস্তিন, ইসরায়েল ও অন্যান্য আরব রাষ্ট্র নিয়ে আলোচনায় বসেন।

এ আলোচনা থেকে ইসরায়েল একটি রাষ্ট্রের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়। কিন্তু শান্তি প্রক্রিয়া কার্যত এগোয়নি। মার্কিনিদের ইরাক আক্রমণে ফিলিস্তিন নেতা ইয়াসির আরাফাতের অবস্থানকে তিনি সন্ত্রাসমূলক বলে আখ্যা দেন। ফলে ফিলিস্তিনি নেতাদের সঙ্গে বুশের কূটনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে, বিরোধ বাড়তে থাকে ইসরায়েল ও বুশের সম্পর্ক।

এরপর ইয়াসির আরাফাতের রহস্যময় মৃত্যু, ফিলিস্তিনি গণঅভ্যুত্থানের ফলে দ্বিপক্ষীয় সহিংসতা আরও বাড়তে থাকে। ফিলিস্তিনি নেতা মাহমুদ আব্বাসকে কয়েকবার শান্তি ও সমঝোতার আশ্বাস দিলেও ইসরায়েলের ওপর প্রত্যক্ষ সমর্থন ছিল জর্জ বুশ সরকারের।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালে ওয়াশিংটনে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে যোগ দেন মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক ও জর্ডানের বাদশা আবদুল্লাহ। আলোচনা এগোলেও শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি ছাড়াই ওবামার উদ্যোগ থমকে যায়। শুরু হয় নতুন সংকট। ওবামা সরকারের কার্যক্রমও সমঝোতাবিহীন বৈঠক ও আশ্বাসেই সীমিত থাকে।

জেরুজালেম সমস্যা নিরসনে আশ্বাস ও ফিলিস্তিনিদের উন্নয়নে অনুদান দিলেও শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের মিত্র রাষ্ট্র হিসেবেই কাজ করেছে ওবামা সরকার। এরপর ক্ষমতায় আসা ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরু থেকেই ইসরায়েলের প্রতি পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত নিয়ে আসছিলেন। যদিও একবার ফিলিস্তিন সফরে তিনি সহিংসতা নিরসন ও শিগগিরই শান্তি প্রতিষ্ঠায় ব্যবস্থা নেবেন বলে আশ্বাস দেন, কিন্তু গত ৬ ডিসেম্বর জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণার মধ্য দিয়ে নতুন করে সহিংসতার পথ খুলে দিলেন।

বর্তমান সংকট

গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে তিনি মার্কিন দূতাবাস তেলআবিব থেকে সরিয়ে জেরুজালেমে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। এর মধ্য দিয়ে ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর যুক্তরাষ্ট্রই প্রথম, যারা জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিল।

তিন ধর্মের তীর্থস্থান হিসেবে স্বীকৃত জেরুজালেমকে শুধু ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণায় ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একে অগ্রহণযোগ্য এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র তার অবস্থান হারিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই ঘোষণার কঠোর সমালোচনা ও নিন্দা হচ্ছে।

গত শনিবার জাতিসংঘ ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে বিবৃতি দেয়। মার্কিন মিত্রদের মধ্যে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, সৌদি আরব, পাকিস্তানও ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছে। অন্যদিকে ইরান, সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, তুরস্কসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ট্রাম্পের এ ঘোষণার সমালোচনা করে।