কাক ডাকা ভোরেই সবুজে সাজে শ্রমিক বাজার

নাটোর প্রতিনিধি: তখনও কাক ডাকা ভোর। শরীরটা চাদ রে মোড়ানো। ঘন কুয়াশা চারিদিকে আর হিমেল হওয়ায় রিতিমতো যুবুথুবু অবস্থা। হাতে হাতে কাস্তে-কোদাল। কাঁদে ধান বাহনের জন্য আনা হয়েছে বাক। এসব সরঞ্জামাদি নিয়ে দিনমুজুর জামাল মিয়া নিজেকে হাটে তুলেছেন শ্রম বিক্রির জন্য। সময় তখন ভোর পাঁচটা। ঘনকুয়াশায় বাস-ট্রাকগুলো চলছে বাতি জ্বালিয়ে।

দিনমুজুর জামাল মিয়ার বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ এলাকায়। ভোর চারটায় ১০ টাকা ভাড়ায় ট্রাকে চরে এসেছেন ‘বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কে’র নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার নয়াবাজার শ্রমিকের হাটে। এই হাটে শুধু যে জামাল মিয়া এসেছেন তা নয়। জীবিকার তাগিদে আশপাশের কয়েকটি জেলা থেকে প্রায় ৮ হাজার শ্রমিক এসেছেন শ্রম বিক্রি করতে।

কিন্তু পাচ্ছেনা ন্যায্য মুজুরি। শ্রমিকের এই কাতারে রয়েছে নারী-শিশুসহ সব বয়সের নারী-পুরুণষরাও। কৃষি অধিদপ্তর ও স্থানীয় কৃষকদের সাথে কথাবলে জানাগেছে, চলনবিলের পানি এখন ভাটির টান। জেগে উঠছে আবাদী জমি। নরম-কর্দমাযুক্ত পলিমাটিতে চলছে বিনাহালে রসুন রোপন আর আমনধান কাটার উৎসব। এসব কাজে অনেক শ্রমিকের দরকার। পাশ^বর্তী কয়েকটি উপজেলার প্রায় ২০টি গ্রামের দিনমজুর এ হাটে উঠেন।

কম মজুরিতে পরিবার পরিজন নিয়ে দু’মুঠো ভাতের জন্য সংস্থান করা কষ্টকর। তাই একটু ভালো মজুরিতে দিনজমুরি খাটতে রোজ সাত সকালে জীবনের ঝুকি নিয়ে ট্রাক-বাসের ছাঁদে, নছিমন- করিমন, ভুটভুটিতে ওরা ছুটে আসেন এ হাটে। ভোরের কুয়াশা ঠেলে আসে শ্রমজীবি মানুষের দল নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়িয়ে পড়েন। বিভিন্ন গ্রাম থেকে কাজের সন্ধানে ছুটে আসা এসব মানুষ দিনজমুর।

সকালে দলে দলে সমবেত হতে হতে হাজার হাজার দিনজমুর জড়ো হয়। তারপর গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম উপজেলার এলাকার মানুষজন ভোরের এই মিলনমেলা থেকে দৈনিক মজুরিতে শ্রমজীবি মানুষ কিনে নেন। নাটোরের গুরুদাসপুরের নয়াবাজার পয়েন্টে প্রতিদিন ভোরবেলা বসে বিশাল দিন মজুরের হাট।

২০/২৫ জন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, শ্রমজীবি এসব মানুষের এমন হাট শুরু হয়েছে গত সাত বছর ধরে। অধিকাংশই ভূমিহীন অভাবী মানুষ এরা। পাশ^বর্তী কয়েকটি উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামঞ্চল থেকে কাজের সন্ধানে এসে দাঁড়িয়ে পড়েন। প্রতিদিন খুব ভোরে নয়াবাজার পয়েন্টে বসে এ মিলন মেলা।

দিন মজুরের নারী-পুরুষের দল এ হাটে আসেন শ্রম বিক্রি করতে। এই এলাকার মানুষজন প্রয়োজনমতো হাট থেকে দৈনিক মজুরিতে তাদের কিনে নেন। অনেকটা পণ্যের মতো চলে দর কষাকষিও। স্থানীয় ভাবে এসব অভাবী মানুষগুলো কামলা হিসাবে পরিচিত।

প্রতিদিন ৬০ বছরের বৃদ্ধ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের শ্রমজীবি নারী-পুরুষ এ হাটে পাওয়া যায়। এসব শ্রমজীবি বেশিরভাগই আশ্রয়হীন,ছিন্নমূল ও অভাবী বটে। তারা কেই কেই দৈনিক,কেউ সপ্তাহ, কেউ কেউ এক মাসের জন্য ধান কাটা,রসুন লাগানোর কাজের জন্য এ হাটে এসে সমাবেত হন। এ অঞ্চলের এই সময়ে শ্রমজীবি মানুষের বড়ই অভাব। ৩০০-৩৫০টাকা পুরুষ এবং ২০০-২৫০ টাকা মজুরিতে এসব দিনমজুর বেচা বিক্রি হয়।

দিনমজুরের হাটে আসা শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রত্যেক শ্রমজীবি মানুষের এনজিও কিস্তি, পরিবারের খাদ্য ও ছেলে মেয়েরা লেখাপড়া চলে এ শ্রমের উপার্জনে। পাশবর্তী তাড়াশ থেকে কাজের সন্ধানে আসা রেশমা বিবি (৪২) বলেন,দিনমজুর ছাড়া মোগো কোনো উপায় তো পাইনা। পাঁচ জন মানুষ আমরা পরিবারের ভাতের অভাব দেওয়ার জন্যই দিন মজুরির কাজ করি। আমাদের গ্রামে এখন তেমন কাজ নাই। তাই তোমাগো এলাকায় আইছি বাপু।

শ্রমিক কিনতে আসা কয়েকজনের সাথে কথা বললে তারা জানান, এখানে শ্রমিক হাট বসা প্রতিদিন ইচ্ছামত শ্রমিক কিনেতে পাচ্ছি। কোন সমস্যা হচ্ছে না। সময়মতো সব কাজ সঠিক সময়ে করতে পারছি। প্রতিদিন পুরুষ ৩০০ থেকে ৩৫০ এবং নারী ২০০ থেকে ২৫০ টাকা দিন হাজিরা শ্রমিক কিনেন এই এলাকার গিরস্থ্যরা।

প্রিন্স, ঢাকা