সাক্ষাৎকার: সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যই আমাদের মূল শক্তি

নিউজ ডেস্ক: সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাবলী মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে ওঠা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের অঙ্গীকার প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। ধর্ম নিয়ে ভেদাভেদ ভাবিয়ে তুলেছে সাধারণ মানুষকেও। ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর একের পর এক হামলা চলছে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণের আগেই জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে সংখ্যালঘুদের ঘর বাড়ি, সহায় সম্বল। সর্বশেষ গত নভেম্বরে রংপুরের হরকলি ঠাকুরপাড়া গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের আটটি বাড়িতে আগুন দেয়া হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে একজন নিহত ও পুলিশসহ ২৫ জন আহত হন। গ্রেফতার করা হয় অভিযুক্ত টিটু রায়কে। ওই মামলা এখনও চলছে। বারবার কেন দেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে, ধর্ম নিয়ে দেশের সংবিধান কি বলে, ধর্মীয় অনুভূতি কি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার হচ্ছে, সর্বোপরি, চলমান সংকট থেকে উত্তরণের উপায়ই বা কী- এসব বিষয়ে সমকাল অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তাসলিমা তামান্না

সমকাল: গত ১০ নভেম্বর রংপুরের ঠাকুরবাড়ি এলাকায় ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। এ নিয়ে কয়েকদিন ধরে প্রচার-প্রচারণা চলে। থানায় একটি মামলাও হয়েছিল। তারপরও প্রশাসন থেকে সতর্কতামূলক কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: এটি অত্যন্ত গর্হিত একটি কাজ হয়েছে। থানায় যখন একটা অভিযোগ করা হলো, তখন অন্তত প্রশাসন থেকে দেখা উচিত ছিল এই অভিযোগের কতটা সত্যতা আছে। এই ধরনের অভিযোগ যখন আসে তখন দুইটি উপায় থাকে- এক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তদন্তে নেমে এর বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করতে পারে অথবা অপ্রমাণ করতে পারে। অনেক সময় ভুল অভিযোগও যে আসে না তা নয়। কিন্তু সেটা তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসত। এতো আর পছন্দ অপছন্দের বিষয় নয়। এটি প্রশাসনের কর্তব্যের বিষয়। দুই, আমি মনে করি, এখানে কর্তব্যের অবহেলা হয়েছে। অবহেলা যে করা হয়েছে সেটারও একটা তদন্ত করা উচিত; যাতে ভবিষ্যতে কখনো এই ধরনের অবহেলা না হয়। এখানে যে শুধু কিছু মানুষের বাড়িঘর পুড়েছে, কিছু মানুষ সর্বশান্ত হয়েছে-বিষয়টা শুধু তা নয়। একটা সম্প্রদায়ের বিশ্বাস নষ্ট হয়েছে আরেক সম্প্রদায়ের ওপর। রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। আমরা সবাইকে সমান সুরক্ষা দিতে পারছি না। রোহিঙ্গাদের ওপর যে নির্যাতন হয়েছে বাংলাদেশ সেখানে সবচেয়ে বেশি সরব হয়েছে। নাগরিক সমাজ থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ প্রত্যেকেই একটা অভিন্ন জায়গা থেকে প্রতিবাদ করছি এবং প্রতিকার চাইছি। সেইখানে আমাদের দেশে যদি সংখ্য্যালঘুদের ওপর এই ধরনের অত্যাচার হয়, যার পেছনে রাষ্ট্রের গাফিলতিও প্রমাণিত হয়, সেটা তো কোনক্রমেই মেনে নেওয়া যায় না। এ ধরনের ঘটনা হলে কোন মুখে আমরা পৃথিবীর সামনে দাঁড়িয়ে রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচারের প্রতিকার চাইব। সভ্যতা, মানবাধিকার কিংবা আমাদের সংবিধান- যে বিচারেই হোক না কেন, আমরা গুরুতর অপরাধ করেছি। এর যাতে পুনরাবৃত্তি না হয় সেদিকে আমাদের গভীর মনোনিবেশ রাখতে হবে।

সমকাল: এ ধরনের ঘটনা রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিহত করার কথা। কিন্তু ২০১২ সালে রামুতে, ২০১৩ সালে পাবনার সাঁথিয়ায়, ২০১৬ সালে নাসিরনগরে এবং একই বছর গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতালপল্লীতে হামলার ঘটনার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোও। অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি না থাকলেও তাদের ভূমিকা ছিল নেপথ্যে। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: আগে রাজনীতিতে একটি আদর্শিক জায়গা ছিল। বামপন্থার একটা সক্রিয়তা ছিল। সমাজের অনেক মানুষ বামপন্থী রাজনীতির ওপর আস্থা স্থাপন করত। যারা বামপন্থার রাজনীতি করতেন তারা প্রত্যেকে জনমানুষের পক্ষে কাজ করতেন, তাদের কথা বলতেন, সুখে-দুঃখে তাদের পাশে দাঁড়াতেন। এখন বামপন্থার চর্চাটা খুবই সংক্ষিপ্ত হয়ে গেছে। এক ধরনের আগ্রাসী রক্ষণশীলতা আমাদের গ্রাস করছে। তার প্রভাবে বামপন্থার ওপর যেসব মানুষ আস্থা স্থাপন করেছিলেন তাদের অনেকেই এখন ডানপন্থার দিকে চলে যাচ্ছেন। এটা বাস্তব সত্য। বামপন্থী যে সংগঠনগুলো ছিল তাদের আর্থিক সামর্থ্য নেই; তাদের লোকবলও নেই। তাদের বিরুদ্ধে যে শুধু দক্ষিণপন্থী লোকগুলো দাঁড়াচ্ছে তা কিন্তু নয়, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের তথাকথিত প্রগতিশীল অনেকেই দাঁড়িয়েছে। বামপন্থী দলগুলো যে প্রতিবাদ করত- সেই সক্ষমতা এখন আর নেই। তারপরও অনেক ছাত্রসংগঠন সেটা করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব বামপন্থী ছাত্র সংগঠন আছে অনেক কাজেই তাদের অনেক সক্রিয়তা আছে। আশা করি, তাদের কাজের পরিধি বাড়বে।

সমকাল: রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙিয়ে অনেকেই অপরাধমূলক কাজ করছে। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলো এক ধরনের নিরব ভূমিকা পালন করছে…

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: সংখ্যালঘু কিংবা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নির্যাতন, যার কথাই বলি, তাদের ওপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে একসময় আওয়ামী লীগের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। কিন্তু দলটি যখন ক্ষমতায় থাকে, তখন এগুলো সংঘঠিত হলে তা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করে। তারা মনে করে, তাদের কোন কর্মী এই কাজ করছে; এটা জানা গেলে তাদের বদনাম হবে। এই সরকারের আমলে অনেক অপকর্ম হয়েছে, হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে জনমনে আস্থা আনা, অপরাধীদের বিচার বা শাস্তি দেয়ার পরিবর্তে কেন জানি উদাসীনতা দেখানো হচ্ছে বা নির্যাতনের বিষয়গুলো ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে। এসবের প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ তারা করছে না। শাসক দলের চরিত্র গ্রহণ করলেই রাজনৈতিক দলের চরিত্র বদলে যায়। অতীতে আমরা দেখেছি, আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী দলে ছিল তখন তারা অনেক সক্রিয় ছিল। এখন রাজনীতির দর্শন হচ্ছে, যখন কেউ বিরোধীদলে থাকে তখন মানুষকে নিয়ে থাকার একটা প্রবণতা থাকে। যেটা বিএনপি এখন চেষ্টা করছে। ক্ষমতায় গেলে বিএনপিও নিশ্চয় মানুষকে ভুলে যাবে। এটাই আমাদের দেশের রাজনীতি। মাঝখান দিয়ে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। আর পুলিশ, প্রশাসন-সব তো সরকারেরই। এখন যদি সরকার বা সরকারের নীতি নির্ধারকরা সক্রিয় না হন, তাহলে পুলিশ এবং প্রশাসনও নিষ্ক্রিয় থাকবে।

সমকাল: রাজনীতিতে ধর্মীয় অনুভূতি কাজে লাগিয়ে মানুষের মধ্যে সহানুভূতি তৈরির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সামনেই জাতীয় নির্বাচন। ধর্মীয় অনুভূতি এভাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভোটের রাজনীতি কাজ করছে কী?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: এটা রাজনীতিতে অনেক পুরনো একটি বিষয়।একাত্তরে যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল তাদেরকে ধর্মের দোহাই দিয়ে ব্যবহার করা হতো। যেকোন ধর্মের আদর্শিক যে একটা দিক আছে সেটা থেকে সবাই দূরে থাকছে। ইসলাম ধর্মের কথাই যদি বলি, সেখানে মানুষের কল্যাণ, সত্যের প্রচার, মিথ্যাকে প্রতিহত করা, অত্যাচার এবং অত্যাচারীকে প্রতিহত করার কথা বলা হয়েছে। এগুলোই বস্তুত গোটা বিশ্বে ইসলামের প্রচার সহজ করেছে। কিন্তু সেখান থেকে বেরিয়ে ধর্মকে আমরা ক্ষুদ্র স্বার্থে ব্যবহার করছি। যেদিন থেকে এটি শুরু হয়েছে সেদিন থেকেই ধর্মভিত্তিক দল এবং অন্যান্য অনেক দলও এর চর্চা করে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছে। এতে ধর্মও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী এখন মানুষ ভাবতে শিখেছে- ইসলাম সন্ত্রাসকে লালন করে। এটা একেবারেই মিথ্যা কথা। ইসলাম ধর্মের কোথাও সন্ত্রাসের জায়গা নেই।

সমকাল: রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কিংবা ব্যক্তিগত ফায়দা- যে উদ্দেশ্যই হোক, মানুষ কি তাহলে ধর্মীয় অনুভূতিতে আবেগতাড়িত হয়ে স্বার্থবাদী মানুষের সঙ্গে মিশে এমন সহিংস ঘটনা ঘটাচ্ছে?

সৈয়দ সমজুরুল ইসলাম: দৃশ্য সংস্কৃতি আমাদের মধ্যে এক ধরনের চমকের সমাজ তৈরি করেছে, যেখানে ছবিই হচ্ছে প্রধান মাধ্যম। পঠিত, মুদ্রিত বই না। টেলিভিশন, কম্পিউটার, ফেসবুকের ছবি, এগুলোই হচ্ছে প্রধান আকর্ষণ। ফেসবুকে যে ছবিগুলো ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেয়া হচ্ছে- কে করছে, কারা করছে, এসব কেউ ভাবছে না। বরং এমন কিছু দেখলেই কিছু মানুষ লাঠিসোটা হাতে দৌড়ে যাচ্ছে। এগুলো এক ধরনের ভ্রান্ত আবেগ তৈরি করছে। সত্য অসত্য বোঝার কেউ চেষ্টা করছে না। এ ধরনের আবেগ সংহত করতে পারে একমাত্র জ্ঞানের চর্চা। কিন্তু এই জ্ঞানচর্চার উৎসাহটা এখন কারো মধ্যে নেই।

সমকাল: আমাদের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র হবে ধর্মনিরপেক্ষ। অন্যদিকে সংবিধানে আবার রাষ্ট্রধর্মও আছে। বিষয়টা কি পরষ্পরবিরোধী না?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: অবশ্যই তাই। ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে। আমাদের সংবিধান বলছে, সকল ধর্মের সমানাধিকার থাকবে। ধর্ম থাকবে ধর্মের জায়গায়, মানুষের মঙ্গলের জন্য, প্রত্যেকের বিশ্বাসের গভীরে। প্রত্যেকে তার ধর্ম চর্চা করার জন্য নিরঙ্কুষ স্বাধীনতা চায়, এর নিশ্চয়তা দেয়া ধর্মনিরপেক্ষতার প্রধান শর্ত। ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মবিরোধীতা নয়। ধর্ম নিয়ে যারা রাজনীতি করেন তারাই ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে ধর্মবিরোধীতা এক করে ফেলে অপপ্রচার করছেন। সেকুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতার প্রধান কথা হলো, আমার ধর্মচর্চার অধিকার থাকবে, কিন্তু প্রাতষ্ঠানিকভাবে ধর্ম আমাদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করবে না। ৮০ এর দশকে এরশাদ যখন ক্ষমতায় আসেন তখন তিনি তার জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্য রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম চালু করলেন। তারপরও আমি মনে করি, এটি কোনো মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করত না যদি না সংখ্যাগুরুরা সংখ্যাগুরুত্ব চাপিয়ে দিত সংখ্যালঘুদের ওপর। ভারতের সংবিধানেও ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা আছে। কিন্তু ওখানেও হিন্দুত্ববাদীরা অন্য ধর্মের মানুষের ওপর প্রভুত্ব করার চেষ্টা করছে। গোরক্ষক সমিতির নামে নির্যাতন করা হচ্ছে নিরীহ মুসলমানদের। শ্রীলংকা কিংবা মিয়ানমারেও সংখ্যাগুরু বৌদ্ধরা সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন করছে।

সমকাল: সংবিধান কি আমাদের জীবনকে প্রভাবিত করছে না?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: আমাদের একটা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আছে, আমাদের সংস্কৃতিতে একটা ভারসাম্য আছে। সংবিধানে কি লেখা আছে এ নিয়ে আমি চিন্তিত নই। কারণ সংবিধানের অনেক বিধানই আমি মানি না, রাষ্ট্রও মানে না। এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, জনগণ কি ভাবছে। মানুষ যখন যা ভাবে, তা সংবিধানসম্মত না হলেও নানা ধরনের শাসক প্রশাসকরা এর সুযোগ নিয়েছে। তারা নিজেদের মতো করে সংবিধান সংস্কার করেছে, নিজেদের মতো করে তা ব্যবহার করছে।

আমি সাংস্কৃতিক শক্তিতে বিশ্বাসী। সংস্কৃতির একটি অদৃশ্য শক্তি। এটি পাকিস্তান কিংবা ভারতে ততটা কার্যকর নয়। আমাদের দেশে শিশুদের ওপর অত্যাচার হলে মানুষ রুখে দাঁড়ায়। যখন পার্বত্য চট্টগ্রামে সহিংসতা হয়েছে তখন আমরা এর বলিষ্ঠ প্রতিবাদ করেছি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার ক্ষেত্রে আমাদের নাগরিক সমাজের একটা ভূমিকা আছে। মিডিয়ারও জোরালো ভূমিকা আছে; যা মিয়ানমারে নেই। সেখানে রোহিঙ্গাদের ওপর এত অত্যাচার হল কিন্তু কেউ তাদের পক্ষে দাঁড়াল না। ভারতে আছে, কিন্তু ভারত ক্রমাগত ডানপন্থী হয়ে যাচ্ছ। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে এখনো সংযতবোধ, সাংস্কৃতিক শক্তি, পারিবারিক মূল্যবোধ আছে। তবে এটাও ঠিক, এখন এমন একটা সময় চলছে যখন পৃথিবীব্যাপী একটা বিভৎসতা ছড়িয়ে পড়েছে। এখানে আমরা তা থেকে দূরে থাকব, গা বাঁচিয়ে চলতে পারব, তা সম্ভব না। কিন্তু আমাদের চেষ্টা করতে হবে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিকে এক করে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে।

সমকাল: দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মীয় শক্তির সঙ্গে এক ধরনের সমাঝোতা করছে। বিনএপির সঙ্গে জামায়ত ও অন্যান্য দলগুলোর সম্পর্ক আছে। আবার সরকার হেফাজত ইসলামীর সঙ্গে সখ্যতা রেখে পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন করছে। অন্যদিকে, দেশে প্রচলিত কওমি মাদ্রাসা সংস্কারের দাবী দীর্ঘদিনের। কিন্তু এটাও সংস্কার হচ্ছে না। এ সম্পর্কে কী বলবেন?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো সবসময় আপোষ করেছে। কারণ হচ্ছে- ক্ষমতার লোভ। ক্ষমতায় থাকা এবং ক্ষমতায় যাওয়া এটা হল আমাদের রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য, মানুষের সেবা কিংবা দেশের উন্নতি করা নয়। উন্নতি যে দেশে হচ্ছে না তা নয়। আমি সবসময়ই বলি, আমাদের উন্নতি হচ্ছে। যখন সরকার উন্নতির পথে পা বাড়ায় তখন অভাবনীয় উন্নতি হয়। প্রধানমন্ত্রীকে আমি ধন্যবাদ জানাই, কারণ তিনি যখন পদ্মা সেতুর বিষয়টা নিয়ে অগ্রসর হলেন তখন একটা আত্মবিশ্বাস জাগলো আমাদের মধ্যে। সেই আত্মবিশ্বাসে আমরা এখন বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি- এসব ক্ষেত্রে উন্নতি করছি। আমাদের প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। আর প্রবৃদ্ধি যত বাড়ছে, মানুষের উৎসাহ তত বাড়ছে। সরকারের সমর্থন পাওয়ায় বেসরকারি খাতও জেগে উঠেছে। আমরা উন্নতির দিকে যাচ্ছি। কিন্তু ক্ষমতা যখন প্রধান হয়ে যায় তখন আপোষের প্রশ্ন আসে। তবে আমি মনে করি, সবকিছুরই একটা শেষ আছে। ২০২০ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে আমাদের দেশে একটা রাজনৈতিক পরিবর্তন হবে বলে আমি মনে করি। মানুষ প্রচণ্ড বিরক্ত সবগুলো রাজনৈতিক দলের ওপর। ৩০ ভাগ মানুষ একটা দলের পক্ষে, ৩০ ভাগ অন্য দলের পক্ষে। বাকী ৪০ ভাগ মানুষ কিন্তু বিরক্ত। এখনও তারা সংখ্যায় কম। কিন্তু যেকোন দলের চাইতে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। এরা যখন ৬০ ভাগে গড়াবে তখন আমি মনে করি একটা বিপ্লব হবে। বিপ্লব মানে এক ধরনের পরিবর্তন। এটি হতেই হবে। তারুণ্যের ওপর আমার নির্ভরতা আছে। এখন তরুণরাই আমাদের জনগোষ্ঠীর একটা বিশাল অংশ। বয়স্ক রাজনীতিবিদরা যখন চলে যাবেন আর তরুণরা আসবে, তখন তারা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখবে এই রাজনীতি আমাদের পোষাবে না।

সমকাল: একাত্তরের চেতনায় বাংলাদেশকে গড়তে করণীয় কি?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: বিএনপি সমর্থকরাও এখন বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে আনন্দের এবং গৌরবের বিষয় বলছেন। অর্থাৎ একটা পরিবর্তন আসছে। বিএনপি বুঝতে পারছে একাত্তরকে ভুলে থাকলে তার জন্য সর্বনাশ। ফেসবুকের মাধ্যমে সংখ্যালঘু নির্যাতনের মতো সহিংস ঘটনা যেমন ঘটছে তেমনি এই ফেসবুক বা ইউটিউবের মাধ্যমেই বঙ্গবন্ধুর অনেক ভাষণ শোনা ও দেখা যাচ্ছে। একাত্তরের না বলা কথা, ইতিহাস, কনসার্ট সবই পাওয়া যাচ্ছে ইউটিউবে। সব কিছুই এখন হাতের নাগালে। তরুণ প্রজন্ম এগুলো যত জানছে তত তারা একাত্তরকে আমাদের মূল ঠিকানা হিসেবে চিনছে। কাজেই এখন কোন রাজনৈতিক দল একাত্তরকে ভুলাতে পরবে না। বঙ্গবন্ধু নিয়ে কোন বিতর্ক থাকবে না। আওয়ামী লীগের উচিত বঙ্গবন্ধুকে দলের মধ্যে টেনে না আনা। বঙ্গবন্ধু এবং একাত্তর এই দুটো যদি আমরা একসঙ্গে নিয়ে আসতে পারি তাহলে ৬০ এর দশকে যে আন্দোলন হয়েছিল সেটা ফিরিয়ে আনতে পারবো। একাত্তরের চেতনা কোন বায়বীয় বিষয় না। ঐক্যবদ্ধ হওয়াই হচ্ছে একত্তরের চেতনা। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম। স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি। কিন্তু মুক্তি এখনো হয়নি। একাত্তরের চেতনা যদি আমরা কাজে লাগাই তাহলে এমন একটা সমাজ গড়তে পারবো যেখানে ধর্ম অবশ্যই থাকবে কিন্তু ধর্মের নামে সহিংসতা বা হিংসা বিদ্বেষ নয়, বরং এর মানবিক, নৈতিক দিকগুলো গুরুত্ব পাবে। এসব হবে জীবন গড়ে তোলার একটা ভিত্তি। ফলে শিক্ষা, সংস্কৃতি, মানবিকতা-এসব ক্ষেত্রে আমাদের সক্রিয়তা একশগুণ বাড়াতে হবে।

সূত্র: সমকাল ।