বিশ্ব আর্থিক সংকট ও এর পরবর্তী এক দশক এবং বাংলাদেশের আর্থিক খাত, পর্ব -১

বিশ্ব আর্থিক সংকটের প্রথম ধাক্কা লেগেছিল ২০০৭ সালের ২২ জুন। নিউ ইয়র্কে অবস্থিত সেই সময়ের বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম বিনিয়োগ ব্যাংক ‘বিয়ার স্টার্নস’ ওই দিন থেকে পড়তে শুরু করে।
খেলাপি ঋণের চাপে ওই ব্যাংক ৪.২ বিলিয়ন ডলারের এক ঋণ কর্মসূচি তার ‘হেজ ফান্ড’কে দেওয়ার পরিকল্পনা প্রকাশ করে। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর পুরো আর্থিক খাতে এর প্রভাব পড়তে শুরু করে। এক বছরের মাথায় জেপি মর্গান চেইজ ব্যাংক ও মার্কিন সরকার ‘বিয়ার স্টার্নস’কে উদ্ধার করে। কিন্তু এর পরপরই ২০০৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ‘লেহম্যান ব্রাদার্স’ অক্কা পায়। আরো বহু বড় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যালান্স শিট খেলাপি ঋণের চাপে বিপর্যস্ত বলে বাজারে তথ্য আসতে থাকে। শুরু হয় আস্থার সংকট। অনেক বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে সরকার উদ্ধার করবে বলে যে আস্থা জনমনে ছিল তা সহসাই ভেঙে পড়ে। এর পরের গল্প আমাদের সবারই জানা। যুক্তরাষ্ট্রের পুরো আর্থিক খাত নিয়ে টানাটানি শেষ না হতেই ইউরো অঞ্চলের বন্ড মার্কেটে সংকট দেখা দেয়। গ্রিস, স্পেন, আয়ারল্যান্ডসহ ইউরোপজুড়ে চলে তাণ্ডব। জাপানের অবস্থাও তথৈবচ। আর এসবের প্রভাব বিশ্বজুড়েই পড়তে থাকে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি, এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলো বিশ্ব আর্থিক মন্দার এই ধাক্কা তাদের মতো করে সামলে নেয়। বিশেষ করে এর এক দশক আগে এশীয় আর্থিক সংকট মোকাবেলার সময় তাদের যে শিক্ষাটি হয়েছিল, তা বেশ কাজে লাগে। ম্যাক্রো অর্থনীতির মৌল কাঠামো শক্তিশালী রেখে নানা মাত্রিক অন্তর্ভুক্তিমূলক মাইক্রো অর্থনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করে এশিয়ার দেশগুলো তাদের আর্থিক খাত স্থিতিশীল ও সম্মুখমুখী রাখতে সক্ষম হয়। ভারতের সংকট মোকাবেলার ধরন ছিল সন্তোষজনক।

এমনকি বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশও তার ম্যাক্রো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অটুট রেখে নানা উদ্ভাবনীমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক কর্মসূচি চালু করে বিশ্ব আর্থিক মন্দাকে সাহসের সঙ্গে মোকাবেলা করে বিশ্বের নজর কেড়েছিল। সরকারের অর্থনৈতিক নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালার যে সমন্বয় ঘটিয়েছিল, তার সুফল দেশবাসী পেয়েছেন। এখনো পাচ্ছেন। ম্যাক্রো অর্থনীতির প্রায় সব সূচকের স্থিতিশীলতা রক্ষা করেও সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ ঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাত, বিশেষ করে রপ্তানি খাতের জন্য প্রয়োজনীয় নীতি সমর্থন দিয়ে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কার্যত নিজেকে একটি উন্নয়নমুখী কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছিল। সরবরাহ ও চাহিদা তৈরির উভয় কাজে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাফল্য দেখিয়েছে। ফলে বাংলাদেশের বাড়ন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, টাকার বিনিময় হার আশাতীতভাবে স্থিতিশীল ছিল। যার সুফল সামাজিক সূচক যেমন দারিদ্র্য নিরসন, গড় জীবনের আয়ু, শিশুমৃত্যুর হার, মাতৃমৃত্যুর হার, ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসার ইত্যাদি ক্ষেত্রে পড়েছে। এসবের কারণে সমাজে বেশ খানিকটা স্বস্তি ফিরে এসেছে।

উন্নয়নশীল বিশ্বের এত সাফল্য সত্ত্বেও হালে বিশ্ব আর্থিক সংকট মোকাবেলায় বড় দেশগুলোর সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাফল্য নিয়ে অর্থনীতিবিদরা ফের প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। আর কে না জানেন, বিশ্ব আজ এক সুতায় গাঁথা। উন্নত বিশ্ব ও উদীয়মান বিশ্বের কোনো বিশেষ দেশে যদি আর্থিক সংকট ফের দেখা দেয়, তাহলে বিশ্বজুড়েই এর কুপ্রভাব পড়তে বাধ্য। এই প্রেক্ষাপট মনে রেখেই আমরা সমকালীন বিশ্ব আর্থিক খাতের গতি-প্রকৃতি অনুধাবনের চেষ্টা করছি এই নিবন্ধে।

শুরুতেই বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির প্রফেসর ড. কৌশিক বসুর একটি সাম্প্রতিক লেখায় বর্ণিত আশঙ্কার কথা বলতে চাই। ‘প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে’র অক্টোবর ১৮, ২০১৭ সংখ্যায় ড. কৌশিক বসু ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো একযোগ কাজ না করলে বিপদে পড়বে’ শিরোনামে লিখেছেন যে বিশ্ব অর্থনীতি ধীরে ধীরে হলেও বাড়ছে। আইএমএফ বলছে, এ বছর বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে ৩.৫ শতাংশ। গত বছর তা ছিল ৩.২ শতাংশ। তবে এটিই শেষ কথা নয়। বিশ্বের বড় বড় সব কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিগত দশকজুড়েই খুব শিথিল মুদ্রানীতি পরিচালনা করেছে। শূন্য অথবা মাইনাস সুদের হারে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করতে গিয়ে যে তারল্যের মহাসমুদ্র তারা তৈরি করেছে এর ফাঁদে বিশ্বকে পড়তেই হবে। বিশ্বায়নের এই যুগে শুধু একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থ ঢাললে এমনটি হতো না। বহু কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়ন্ত্রণহীনভাবে এই অর্থ ঢেলেছে। সবাই মিলে গত ৯ বছরে ৩২ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ বাজারে ছেড়েছে। সুদের হার কম রেখে আলাদা আলাদাভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো লাভবান হলেও বিশ্বের অর্থনীতির জন্য তারা সামষ্টিকভাবে এক বিরাট ঝুঁকি বা ফাঁদ তৈরি করেছে। কোনো একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমিয়ে তার মুদ্রাকে নরম করে রপ্তানিকে উৎসাহ দিতে পারলেও সবাই মিলে তা করলে ব্যাংকিং খাতের ওপর বিরাট তারল্যের চাপ সৃষ্টি হবেই। তাই ইউরোপের ব্যাংকগুলোর ‘ইক্যুইটি মূল্য’ কমছে তো কমছেই। তা ছাড়া সামান্য অথবা নেগেটিভ সুদের হারের কারণে গ্রাহকদের কাছে নগদ অর্থ ধরে রাখার যৌক্তিকতা কমে যাচ্ছে। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাই বাড়তি লাভের আশায় ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের দিকে ধাবমান হচ্ছে। ফলে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিমাণ গত এক বছরেই বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ২০০৮ সালের আগ দিয়ে মর্টগেজ ঋণের বেড়ে যাওয়ার প্রবণতাও কিন্তু এমনটিই ছিল। তাই ফের আরেকটি বিশ্ব আর্থিক সংকটের ঝুঁকি দিন দিনই যেন বাড়ছে।

এমন ঝুঁকির মধ্যে যাঁরা পেনশনভোগী তাঁরা তাঁদের পেনশন তহবিলের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুবই চিন্তিত। তাই তাঁরা আরো বেশি করে বিকল্প সঞ্চয়ের পথ খুঁজছেন। এই ধারা যদি আরো সক্রিয় হয়, তাহলে তাঁদের ভোগের পরিমাণ কমতে থাকবে। ভোগ কমলে চাহিদাও কমবে। আর চাহিদা কমলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারও কমবে। মূল্যস্ফীতিও কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়বে না। অথচ ‘কোয়ান্টেটিভ ইজিং’ বা বাড়তি অর্থ ঢালার উদ্দেশ্য ছিল এর বিপরীত। ড. বসু আরো লিখেছেন, বিশ্বায়নের এই যুগে কোনো একক দেশের পক্ষে এই ফাঁদ থেকে বেরোনোর সুযোগ নেই বললেই চলে। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো এই নেতৃত্ব দিতে পারত। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জমানায় সে সম্ভাবনার গুড়েবালি পড়েছে। তা ছাড়া জি-২০-এর দেশগুলোও এখন উন্নত ও উদীয়মান বড় অর্থনীতিগুলোর মুদ্রা ও রাজস্বনীতির ভেতর সমন্বয়ের সক্রিয়তা হারিয়ে ফেলেছে। এ পরিস্থিতিতে হয়তো প্রধান অর্থনীতিগুলোর মুদ্রা ও রাজস্বনীতির মধ্যে সমন্বয় উদ্যোগ নেওয়ার সময় এসে গেছে। আর সে রকম সমন্বিত উদ্যোগ না নিতে পারলে প্রতিটি বড় অর্থনীতিই শুধু যে বিপাকে পড়বে তা-ই নয়, উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোও এবার বিশ্ব আর্থিক মন্দার ঝাপটা থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে পারবে না। কেননা বাণিজ্যিক অর্থায়ন এখন আগের চেয়ে আরো বেশি করে সংযুক্ত হয়ে পড়েছে। তাই ফেডের মতো প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার সামান্য হেরফের হলেই চঞ্চল ডলার উল্টো পথে দৌড়াতে শুরু করবে। তৈরি হবে আর্থিক অস্থিতিশীলতা।

এ প্রসঙ্গে চীনের অর্থনীতির ঝুঁকির কথা এসে যায়। তার আগে উন্নত অথচ অপেক্ষাকৃত ছোট অর্থনীতি অস্ট্রেলিয়ার কথা বলি। অস্ট্রেলিয়াতে বাড়ি কেনার ধুম পড়ে গেছে। নানা ধরনের কর সুবিধা ও সুদের হার নিম্নগতির কারণে গৃহায়ণ ঋণ হু হু করে বাড়ছে। অথচ বেতন বা মজুরি বাড়ছে না। তাই ঊর্ধ্বমুখী বাড়ির দাম শোধ করা গৃহমালিকদের পক্ষে একসময় সম্ভব হবে না। যেমনটি যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৮ সালের দিকে ঘটেছিল। বাড়ি ফেলে মানুষ পালিয়ে গিয়েছিল।

এবারে চীন প্রসঙ্গে আসি। ইউরোপের অর্থনীতি এখনো জেগে ওঠেনি। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ধীরলয়ে বাড়ছে। গ্রিস বা ইতালির মন্দ ঋণের পাহাড় দৃশ্যমান। ঠিক এই সময় বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতি চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী। দেশটিতে ‘ছায়া ব্যাংকিং’ (ব্যাংক নয়, অথচ ব্যাংকের মতো কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত) প্রবল। তা ছাড়া জিডিপির ৩০০ শতাংশ ঋণগ্রস্ত দেশটি নিয়ে আইএমএফসহ বিশ্ব আর্থিক সংগঠনগুলোর দুশ্চিন্তার শেষ নেই। এমনকি চীনের সরকারও তার দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার প্রশ্নে চিন্তিত। চীনের প্রবৃদ্ধি এখন কমছে। এর সঙ্গে আর্থিক অস্থিতিশীলতা যোগ হলে পুরো বিশ্বে, বিশেষ করে এশিয়ায় বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে। যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাব্রিয়েল ইনভেস্টমেন্টের ব্যবস্থাপনা অংশীদার রিচার্ড ভেইগ মনে করেন, আগামী পাঁচ বা ১০ বছর ধরে চীনের অর্থনীতি নিম্নমুখী ধারাতেই থাকবে। তাঁর মতে, দুটি কারণে চীনে আর্থিক সংকট দেখা দিতে পারে। এক. ব্যক্তি খাতের ঋণের হার জিডিপির অনুপাতে আগামী পাঁচ বছরে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে। দুই. ব্যক্তি খাতের মোট ঋণ জিডিপির অনুপাতে ওই সময়ে ১৫০ শতাংশেরও বেশি হারে বেড়ে যেতে পারে। তিনি মনে করেন, এ দুটি কারণে চীনে আর্থিক সংকটের আশঙ্কা ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ সত্যি হতে পারে।

পরবর্তী পর্ব আসছে……………

 

লেখক : ড.আতিউর রহমান
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক গভর্ণর,
বাংলাদেশ ব্যাংক