৭০ কোটি ডলার ছেড়েও শান্ত হয়নি বৈদেশিক মুদ্রাবাজার

নিউজ ডেস্ক: ছয় মাস ধরেই দেশে ডলারের বাজারে অস্থিরতা চলছে। অস্থির বাজার শান্ত করতে জুলাই থেকে গতকাল পর্যন্ত প্রায় ৭০ কোটি ডলার বাজারে ছেড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গতকালও ব্যাংকগুলোর কাছে ৬ কোটি ডলার বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তার পরও স্থিতিশীলতা আসেনি ডলারের বাজারে। এ অবস্থায় আজ জরুরি বৈঠক ডেকেছে বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (বাফেদা)।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গতকাল আমদানি পর্যায়ে প্রতি ডলার প্রায় ৮৫ টাকায় বিক্রি করে অধিকাংশ ব্যাংক। যদিও ব্যাংকগুলোর ঘোষিত মূল্য ছিল ৮৩ টাকার নিচে। বাজারের সংকট কাজে লাগিয়ে এক মাস ধরে প্রতিদিনই নিজেদের ঘোষিত মূল্য ভঙ্গ করেছে কোনো না কোনো ব্যাংক। এ নিয়ে ১৫টির মতো ব্যাংককে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্ক করলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডলারের দামের এ ঊর্ধ্বগতি কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। কৃত্রিম মজুদ বা অন্য কোনো পন্থায় কেউ ডলারের বাজারে সংকট সৃষ্টি করছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা দরকার। আগামী সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ডলার পাচার হচ্ছে কিনা? খুঁজে বের করতে হবে সেটিও। অন্যথায় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ডলার ছেড়ে বাজার স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে না।

বাফেদা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন বলেন, আমদানি পর্যায়ে ডলারের মূল্য ৮৩ টাকার নিচে রাখাকে কেন্দ্র করে কয়েকটি ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বাজারের চাহিদার আলোকে প্রতি ডলারের দাম কেন ৮৫ টাকা হবে না? এটিই ওই ব্যাংকগুলোর জিজ্ঞাসা। সামগ্রিকভাবে কয়েক মাস ধরেই বাজারে কোনো স্ট্যান্ডার্ড বা আইডিয়াল সিচুয়েশন নেই। সুযোগ পেলেই ফাঁকফোকর দিয়ে কিছু ব্যাংক ডলারের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় বাফেদার বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ডলারের বাজারে বিদ্যমান অস্থিতিশীলতার পরিপ্রেক্ষিতে গত মাসের শেষের দিকে বৈদেশিক মুদ্রার ডিলার ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই বৈঠকে আমদানি পর্যায়ে ডলারের দাম ৮৩ টাকার নিচে রাখতে ব্যাংকগুলোকে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়। নির্দেশনার আলোকে প্রতিদিন ব্যাংকগুলো ডলার কেনা-বেচার মূল্য ঘোষণা করলেও তার চেয়ে বেশি দামেও বিক্রি করছে কোনো কোনো ব্যাংক। ডলারের মূল্য নিয়ে বনিবনা না হওয়ায় গত কয়েক দিনে বেশকিছু গ্রাহক হারিয়েছে দেশের প্রথম সারির কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক। ব্র্যাক, দ্য সিটি, ঢাকা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের নাম রয়েছে এ তালিকায়। ফলে ডলারের বিক্রয়মূল্য নিয়ে এ ব্যাংকগুলোর মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে বলে জানা গেছে।

ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনিস এ খান বলেন, ডলারের বাজারের বিদ্যমান পরিস্থিতি সহনশীলতার বাইরে চলে গেছে। এমডি হিসেবে কোনোভাবেই ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। অসম প্রতিযোগিতার কারণে আমাকে গ্রাহক হারাতে হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, ডলারের দাম ৮৩ টাকার বেশি হতে পারবে না। কিন্তু বাজারের বাস্তবতা ভিন্ন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, দুই বছর ধরেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান মাধ্যম রফতানি আয় ও রেমিট্যান্সপ্রবাহে ভাটা পড়েছে। অন্যদিকে রেকর্ড পরিমাণ চালসহ খাদ্যশস্য ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি হওয়ায় বেড়েছে আমদানি ব্যয় পরিশোধ। ফলে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) দেশের চলতি হিসাবে ১৭৯ কোটি ১০ লাখ ডলারের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। যদিও ২০১৬-১৭ অর্থবছরের এ তিন মাসে ৫৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত ছিল। তবে অর্থবছর শেষ হয় ১৪৮ কোটি ডলারের ঘাটতি নিয়ে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে ১ হাজার ৯২০ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যা ২৭ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ২৪ শতাংশ এলসি নিষ্পত্তি বেড়েছে। অথচ এ সময়ে রফতানি বেড়েছে মাত্র ৭ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আড়াই শতাংশ কমার পর গত অর্থবছর রেমিট্যান্স সাড়ে ১৪ শতাংশ কমেছে। গত অর্থবছর আমদানিতে ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির বিপরীতে রফতানি বাড়ে মাত্র ১ দশমিক ৭২ শতাংশ। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় ডলারের বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো ইচ্ছেমতো নিজেদের কাছে বৈদেশিক মুদ্রা ধরে রাখতে পারে না। এজন্য নির্ধারিত সীমা বেঁধে দেয়া হয়। নীতিমালা অনুযায়ী, একটি ব্যাংক দিন শেষে তার মোট মূলধনের ১৫ শতাংশ সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা নিজেদের কাছে সংরক্ষণ করতে পারে। নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত ডলার থাকলে দিন শেষে বাজারে বিক্রি করতে হয়। বিক্রি করতে না পারলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বিক্রি করতে হবে। এর ব্যত্যয় হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে জরিমানা গুনতে হয়।

বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ। ওই বিভাগের সংশ্লিষ্টরা জানান, বিদেশী ব্যাংকগুলো যথাসময়ে বাজারে ডলার বিক্রি করছে না। রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় কমে যাওয়া এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বাজার স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বিদ্যমান অস্থিরতা সাময়িক। চাহিদা কমে গেলে বাজার এমনিতেই স্থিতিশীল হয়ে যাবে। আমদানি পর্যায়ে ডলারের দাম যদি ৮৫ টাকায় বিক্রি হয়, তাহলে কস্ট অব ফান্ডসহ তা অনেক বেড়ে যাবে। ফলে আমদানি পণ্যের দাম বেড়ে বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা বলেন, বাজারের চাহিদার ওপর ডলারের দাম ওঠা-নামা করে। সে বিবেচনায় দাম বাড়লে সেটি স্বাভাবিক ধরা হয়। তবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা বা অন্য কোনো কারণে দাম বাড়ছে কিনা, সেটি বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যবেক্ষণ করছে।