মোহাম্মদের সমাধি

এম এস প্রিন্স

যে স্বপন দেখিয়া ঘুম ভাঙ্গিল রজনী দ্বি-প্রহরে
তা’র বর্ণন করিবার আগে তওবা করি হাত ওঠায়ে বসিয়াছি বিছানার ওপরে
এলাহি কবুল করুন।
জান্নাতুল বাকীতে নাই বা যদি হয় মসজিদের ধারে
চিতায় না দিয়া মৌরে ঘুমাইতে দিয়েন আমার পাশের গোরে।
‘আল্লাহু-আকবার’ ডাক শুনি তা’রে লয়ে ওঠে
পরিতে পারি গো যেন আপনার চরণে লুটে।
আর তামাম দুনিয়ার জমিনের তলে
যত মোমেন মোমেনা ঘুমায়ে রয়েছে পৃথিবীর আড়ালে
এই তওবা পৌঁছে দিন তাহাদের তরে
আর আমার জনক জননীরে বিচার দিনে
আপনার হাবিবের সাফা নসিবে জুটায়ে দিয়েন জৌলুস আয়োজনে।
লা-ইলাহা ইল্লাললাহু মোহাম্মাদুর রাসূরুল্লাহ্।

উরুতে শুয়ে জিজ্ঞাসিল মোহাম্মদ- মরণের পর
বলিতে পার কি আয়েশা কোথা হবে আমার কবর?
হা প্রাণের স্বামী
কবরস্ত হবে কোথা তুমি, তাহা জানি আমি।
আয়েশার কথা শুনিয়া মোহাম্মদ আনন্দে নাচি
কহিল- বল দেখি তুমি আমার অন্তর যাচি।
ইয়া রাসূরুল্লাহে মাতৃভূমি মক্কা মোয়াজ্জেমার উত্তরে
তোমার প্রথমা বিবি খাদিজা ঘুমায়ে রয়েছে জান্নাতুল মহল্লার তরে
আমরা জিন্দা ন-জন নারী
তোমার সেবা করিয়া চলি তবু তাহার গল্পই প্রাণেতে জরি।
এ জন্যে আমার ধারনা
তাহার পাশ ছাড়া তুমি আর কোথাও ঘুমাইবে না।
আয়েশা, খাদিজার কবরের পাশে ঘুমাইব বলিয়া ঠিক করি নাই।
যদি অনুমতি পাই-
তাহলে আরেকটি জায়গার নাম বলিবার চাই।
আয়েশার কথা শুনিয়া মোহাম্মদ সম্মতি দিল
সম্মতি পাইয়া যাহা বলিল
মদিনা হইতে মক্কায় আসিবার পথে বাবলা বাগান
লাল বালির মরুভূমিতে আবয়া প্রান্তর নামে একটি স্থান
এই খানে ঘুমায়ে রয়েছে মা-বাবা, তাই তাহাদের পাশে
ঘুমাইবে বলি পণ করিয়াছ তুমি আশে আশে।
আয়েশার কথার জবাবে মোহম্মদ বলিল- মরণের পর
ঠিক করি নাই হোক বলি মা-বাবার পাশে আমার কবর।
মোহাম্মদের কথা শুনিয়া আয়েশা আবার বলিল- ইয়া রাসূরুল্লাহে
এই মদিনায় জান্নাতুল বাকীতে ঘুমাইবে বলিতে পারি নিঃসন্দেহে।
কারণ তোমারি স্বীয় হাতে গড়া এই কবর স্থান
আল্লাহ্-ও বানায়ে রাখিয়াছে বেহেস্তের বাগান।
এই খানে যাহারা ঘুমাইবে
রোজ কেয়ামত পর্যন্ত আজাব বলিতে কিছু নাহি বুঝিবে।
আর তোমারি স্বীয় হাতে দেয়া যখন দশ হাজার সাহাবীর কবর
তাই বলিতে পারি এই খানেই ঘুমাইবে তুমি মরণের পর।
আয়েশার কথা শুনিয়া মোহাম্মদ বলিল- ওগো পূজারী মোর
ঠিক করি নাই জান্নাতুল বাকীতে হোক বলিয়া আমার গোর।
বুঝিয়াছি আমি নাই বলিবে তুমি তোমার প্রশ্নের জবাবে
হার মানিয়া তাই জিজ্ঞাসী প্রশ্নকরীকেই কোথা ঘুমাইবে?
জবাবে বলিল মোহাম্মদ- আজিকে রয়েছি যেথা যেই ভাবে শোয়ে
পশ্চিমে মাথা পূর্বে পা দক্ষিণে কাবার দিকে মুখ ফিরে ঘুমায়ে
থাকিতে চাই গো রোজ কেয়ামত পর্যন্ত যদি
মরণের পর দিবে কি বল তুমি তোমার ঘরেতে আমারে সমাধি?
জবাবে আয়েশা বলিল- ইয়া রাসুরুল্লাহে
তোমার কথা শুনিয়া আমার হৃদয় ভরিয়া গেল অক্ষয় উৎসাহে।
মরণের পর আমার ঘরেতে এইখানে এইভাবে তোমারে দিব কবর
মানুষ আসিয়া ঘরটাও দেখি আমার সম্মান বাড়াইতে থাকিবে জনম ভর।

আর আজিকে সোম মঙ্গল বুধ গিয়া বেলা আসর
গভীর ঘুমে ঘুমায়ে রয়েছে শেষ পয়গম্বর।
তিন দিন ধরি কোনো ঊনানে বসায়নি হাড়ি
কোনো শিশু চাহিয়াও দেখেনি স্বীয় মায়ের বুকেরপুরী।
প্রিয় নবী প্রিয় নেতা নিয়াছে চির বিদায়
আঁধার পৃথিবী শোকে কাঁদে মানুষজন পিঠ লাগায়নি বিছানায়।
তলে তলে একে একে আসি পড়ে যানাজার নামায
ওয়াক্তের বেলাতে নামিয়া আসিয়াছে সাঁঝ।
যায়নি শোনা আর কভু বেলালের আযান ধ্বনির সুর
ইসলাম রবির কিরণ যাচ্ছে চলি দূর হতে দূর।
আরো সময় যায় যদি চলে ক্রমে ক্রমে
মানুষ জন স্বীয় ধর্মের কথা যাইবে ভুলিয়া এ জনমে।
রহিবে না আর কভু ধরিবার মত হাল
এই বিদায়ী সেই এক যিনি ওড়ায়েছেন ইসলাম রবির কিরণ-পাল।
তাই আর ঠিক হইবে না তাহারে রাখিতে মাটির ওপর
বিধাতার নিয়মেই দিতে হইবে কবর।
এই ভাবি সাহাবিগণ বসিয়া এক সাথে
কেউ খাদিজার পাশে কেহ বলে মা-বাবা বা জান্নাতুল বাকীতে
প্রিয় নেতা প্রিয় নবীকে সমাহিত করিতে।
এই বলিয়া পরামর্শ করিলেও সিদ্ধান্ত বাক্য যায় গর্মিল জলে ভাসি
অবশেষে সবে মিলে আয়েশার কাছে আসি
বলিল- শেষ পয়গম্বর মরিবার পর
অবণী আঁধারে ঢাকিয়া ভাঙ্গিয়াছে মক্কা মদিনার অধর।
আরো কিছু সময় যদি তাহারে রাখি মাটির ওপরে
ইসলাম রবি নিভিয়া গিয়া চলিবে আর মোড়ে।
এই ভাবি কবরস্ত করিতে যত জায়গাই ঠিক করি
বৃথাই চলে তাই জিজ্ঞাসী- ‘তাহার পছন্দ রয়েছে না কি কোনো পুরী?’
জবাবে আয়েশা বলিল- এই-খানে এই-ভাবেই এক দিন রাসূল শোয়ে
জিজ্ঞাসিল- থাকিতে চাই আমি তোমার ঘরে ইহ জীবনের ঘুম ঘুমায়ে
তুমি নিবা না-কি বল আমার এ কথা কবুল করি?
জবাবে বলিলাম- এ আমার পরম ভাগ্য জনম জনম ধরি
তোমার কবর দেখিতে আসিয়া এই ঘরটাও দিখি দিখি
খোদার তরে আমার দাম বাড়ায়ে নিবে মানুষ ঠিকই।
লাব্বাইকা সাদাইকা ইয়া রাসূরুল্লাহে
আমার ঘরেতে তোমারে ঘুমাইতে দিব বলিলাম অক্ষয় উৎসাহে।
আয়েশার কথা শুনিয়া সাহাবিগণ এক সঙ্গে মিলি
অতীত যত যুক্তি-পরামর্শ দিয়া দিল বলী।
অতপর মোহাম্মদের লাশ একটু খানি সরায়ে
যেইখানে ইন্তেকাল করিল সেই খানেই কবর খুঁড়ি সব ব্যথা বুকে সয়ে
পশ্চিমে মাথা পূর্বে পা দক্ষিণে কাবার দিকে মুখ ফিরে
শেষ পয়গম্বরকে রাখি চলিয়া গেল সবে যার যার নীড়ে।