অর্থনীতি চাঙা করতে যা করতে হবে নানগাগওয়াকে

নিউজ ডেস্ক: জিম্বাবুয়ের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এমারসন নানগাগওয়া প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন কাল শুক্রবার। এক সপ্তাহ আগে জিম্বাবুয়ের সেনাবাহিনী দেশটি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। গৃহবন্দী করা হয় দেশটির ৩৭ বছরের শাসক রবার্ট মুগাবেকে। দেশটির পার্লামেন্টে মুগাবেকে অভিশংসনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর গত মঙ্গলবার তাঁর পদত্যাগের ঘোষণা আসে।

এক সপ্তাহে দেশটিতে রাজনৈতিক পটবদলে অনেক ঘটনা ঘটলেও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটেনি। দেশের জনগণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে এখন যেমন নিশ্চিত, অর্থনৈতিক পরিবর্তন কতটুকু আসবে, তা নিয়ে তেমন নিশ্চিত নয়। জনগণ আশা করছে, লাইফ সাপোর্ট থাকা অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করবেন এমারসন নানগাগওয়া। তবে দ্রুত সমাধানের বিষয়ে বিশ্লেষকেরা এখনো খুব আশাবাদী নন। সামনের সময়ের জন্য মানুষের যে প্রত্যাশা, তা পূরণ করতে হলে জিম্বাবুয়েকে দ্রুত সংস্কার পদক্ষেপ নিতে হবে। বিবিসি অনলাইনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে অন্তত পাঁচটি বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে নতুন সরকারকে।

নগদ সরবরাহ
নতুন করে শুরু করতে এমারসন নানগাগওয়ার প্রথম প্রয়োজন নগদের সরবরাহ। ২০০৯ সাল থেকেই জিম্বাবুয়ের নিজস্ব মুদ্রা নেই। পণ্য কিনতে জিম্বাবুয়ের নাগরিকেরা তাই মার্কিন ডলার ও দক্ষিণ আফ্রিকার রান্ডের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ২০০৯ সালে ডলারকে দেশের প্রধান লেনদেন মুদ্রা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। এ ছাড়া ২০১৪ সালে ইউয়ান, ইয়েন, রুপি ও অস্ট্রেলিয়ান ডলারকে লিগেল টেন্ডার মানি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। জাতীয় মুদ্রা পরিত্যাগ করার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বহু মুদ্রাভিত্তিক মুদ্রানীতি গ্রহণ করে দেশটি।

কয়েক বছর ধরে নগদ ঘাটতির কারণে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অর্থনীতি। এখন প্রশ্ন হলো, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে নগদ সরবরাহ পাওয়া যাবে কোত্থেকে? মূল সমস্যা হচ্ছে বরার্ট মুগাবে চলে গেলেও দলের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। কারণ, এমারসন নানগাগওয়াও জানু পিএফ দলের সদস্য। আর এটাই চিন্তিত করছে পশ্চিমা দেশগুলোকে। এ মুহূর্তে জিম্বাবুয়ের অর্থনীতিকে বিশ্বের সবচেয়ে ভঙ্গুর অর্থনীতি বলে মনে করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। তবে সংস্থাটি সহযোগিতায় ইচ্ছুক হলেও কোনো চুক্তিতে যেতে অনেক নিয়ম মানতে হয় তাদের। অবশ্য চীনের কাছ থেকে সহযোগিতা আশা করতে পারে জিম্বাবুয়ে।

সাম্প্রতিক সময়ে নগদের অভাবে ব্যাংকগুলোয় ভিড় করেন সাধারণ নাগরিকেরা। ছবি: রয়টার্স।ক্ষতিগ্রস্ত নীতিমালা বাতিল ও দুর্নীতি দমন
ধরা যাক, নগদ সহায়তা পেল জিম্বাবুয়ে, এতেই পুনরুদ্ধার হবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, নতুন প্রেসিডেন্টকে ওই সব অর্থনৈতিক নীতি বাতিল করতে হবে, যা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অযোগ্য। রাজনৈতিক ও নীতিগত অস্থিতিশীলতার কারণে বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে আসার সাহস করে না।

২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট মুগাবে ‘আদিবাসী ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন আইন’ পাস করেন। যার লক্ষ্য ছিল ৫১ শতাংশ কোম্পানি কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিকদের কাছে হস্তান্তর করা। এই আইনের কারণে পরবর্তী সময়ে অনেক চীনা কোম্পানিও দেশটি থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে নিয়ে যায়। আশানুরূপ ব্যবসায়িক মুনাফা অর্জন করতে পারছিলেন না তাঁরা।

আফ্রিকার অন্যতম কৃষিপণ্য উৎপাদনশীল দেশ জিম্বাবুয়ে। তবে কৃষিজমি দখলের অনুমোদন দেওয়ার পর উৎপাদন কমতে থাকে দেশটিতে। একই সঙ্গে জিম্বাবুয়ের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা বছরের পর বছর ধরে চলা দুর্নীতি। শ্বেতাঙ্গদের কাছ থেকে যেসব কৃষিজমি অধিগ্রহণ করা হয়, সেগুলো পরবর্তী সময়ে চলে যায় সেনাবাহিনী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হাতে। রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতা দেখিয়ে এগুলো বাগিয়ে নেওয়া হয়। এমন ব্যক্তির কাছে জমিগুলো চলে যায়, যারা কৃষির বিষয়ে তেমন কিছুই জানেন না। যা দুর্বল করে উৎপাদনব্যবস্থাকে।

বিদেশি ঋণদাতাদের সঙ্গে আলোচনা
২০ বছর ধরে প্রায় ৯০০ কোটি ডলার ঋণের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে জিম্বাবুয়ে। আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক সহায়তায় সেই ঋণ পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন। তবে নতুন প্রেসিডেন্টের পক্ষে এককভাবে এই ঋণের বোঝা একদম মিটিয়ে ফেলা সম্ভব নয়। ধারণা করা হচ্ছে, নতুন প্রেসিডেন্ট আইএমএফের সঙ্গে একটি নতুন চুক্তিতে যাবে। যদি সরকারবিরোধী দলের সঙ্গে একযোগে মিলিত হয়ে এগিয়ে যায়, তাহলে নতুন অর্থায়ন বা পুরোনো চুক্তির পুনর্বিন্যাস আরও সহজ হবে।

বেকারত্ব কমাতে পদক্ষেপ
জিম্বাবুয়েতে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান প্রায় নেই বললেই চলে। দেশটিতে বেকারত্বের হার এখন ৯০ শতাংশ। দায়িত্ব নিতে যাওয়া নতুন প্রেসিডেন্ট এমারসন নানগাগওয়া বলেছেন, গণতন্ত্রের বিকাশ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিই হবে তার প্রথম কাজ।

বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অর্থ সরবরাহের মাধ্যমে স্বল্প মেয়াদে বেকারত্বের হার কমিয়ে আনা সম্ভব। এ মুহূর্তে সবচেয়ে যা প্রয়োজন, তা হলো রাজনৈতিক ইচ্ছা। বেকারত্ব কমাতে সঠিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি করা। ২০ বছরে বিভিন্ন কারণে জিম্বাবুয়ে ছেড়ে গেছেন ৩০ লাখ নাগরিক। তাদের ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে, যাদের মাধ্যমে নতুন করে অর্থনৈতিক সংস্কার করা সম্ভব হবে। তবে আর্থিক ও রাজনৈতিকভাবে তাদের সুবিধা প্রদান করতে হবে।

তৈরি করতে হবে নিজস্ব মুদ্রা
স্বল্পমেয়াদে নগদ সরবরাহ দিয়ে বিপর্যয় মোকাবিলা করা গেলেও দীর্ঘ মেয়াদে জিম্বাবুয়ের নিজস্ব মুদ্রার প্রয়োজন। জিম্বাবুয়ের মুদ্রার মান একদম নেমে যাওয়ায় মার্কিন ডলার প্রচলন করা হয়। সে সময়ের জন্য সেটাই প্রয়োজন ছিল। ২০০৮ ও ২০০৯ সালে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক এত বেশি পরিমাণে নোট ছাপিয়ে ফেলে যে জিম্বাবুয়ের ডলারের দাম অতিরিক্ত কমে তীব্র মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়। এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে এই মুদ্রা বাতিল করে বন্ড নোট নামে নতুন মুদ্রা চালু করতে হয় সরকারকে। এখন একটি টেকসই মুদ্রা প্রচলনের প্রয়োজন রয়েছে দেশটিতে।