শ্যাম না কুল রাখবে চীন?

শেখ রোকন

রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনা কূটনীতি কি উভয় সংকটে? আরও ভেঙে বললে, বেইজিং কি খানিকটা বিচলিত? দেখা যাচ্ছে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ঢাকায় যে কোনো ‘মুভ’ দেখলেই পাল্টা ‘মুভ’ করছে বেইজিং। অনেকের মনে আছে, অক্টোবরের চতুর্থ সপ্তাহে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরের মাত্র দুই দিনের মাথায় হাজির হয়েছিলেন চীনের বিশেষ দূত সান গোসিয়াং। আবার নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি টমান শ্যানন ঢাকা সফর করে যাওয়ার পর তৃতীয় সপ্তাহে ঢাকা ঘুরে গেলেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং য়ি। এর বাইরেও গত আগস্টের পর থেকে যখনই রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতীয়, আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিস্থিতির কোনো তারতম্য হয়েছে; ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসকে দেখা গেছে সক্রিয় হতে।
চীনা কূটনীতির একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে একদিকে অর্থনৈতিক প্যাকেজ অফার করা, অন্যদিকে ‘থার্ড পার্টি’ প্রভাব কাজে লাগানো। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, মিয়ানমারকে বিভিন্ন সময়ে কাজে লাগিয়েছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও পাকিস্তানকে কাজে লাগাতে কসুর করেনি। মিয়ানমারের রাখাইন পরিস্থিতির ক্ষেত্রেও দেশটি দৃশ্যত একই ধারায় অগ্রসর হচ্ছিল। সেখানকার চ্যাউকফু এলাকায় একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ এবং চীনের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত তেল-গ্যাস পাইলাইন ও রেল যোগাযোগ গড়ে তোলার উদ্যোগ অনেক দিনের। ভারত মহাসাগর ব্যবহারের ক্ষেত্রে মালাক্কা প্রণালির যে নাজুকতা বা সম্ভাব্য নাজুকতা বেইজিংকে মাথায় রাখতে হয়; নিজস্ব অর্থায়নে চ্যাউকফু বন্দর তৈরির পর তা আর থাকবে না। যে কারণে রাখাইন রাজ্যকে চীন একটি অর্থনৈতিক হাব হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ইতিমধ্যে মিয়ানমারের কাছ থেকে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্প পার্ক প্রতিষ্ঠার সম্মতিও আদায় করেছে। চোখ রয়েছে উপকূলীয় তেল-গ্যাস উত্তোলনেও।

শুধু মিয়ানমার নয়; বঙ্গোপসাগর ঘিরে চীনের যে বৃহত্তর ‘বিনিয়োগ’ পরিকল্পনা, তাতে বাংলাদেশও ছিল বা আছে। স্বভাবতই চীন চেয়েছে, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে রাখাইন অস্থিতিশীল না হয়ে উঠুক। মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যেও বজায় থাকুক ‘স্ট্যাটাস-কো’। এর আভাস মিলেছিল চীনা বিশেষ দূত সান গোসিয়াংয়ের প্রথম দফা ঢাকা সফরে। দুই দফা সফরসূচি পিছিয়ে গত এপ্রিলে তিনি ঢাকায় এলেও রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে চীনের স্পষ্ট কোনো অবস্থান জানাননি। কপবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শনে ঢাকার অনুরোধেও খুব উৎসাহ দেখাননি। কিন্তু আগস্টে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ‘তাতমাড্য’ ও রাখাইন উগ্রপন্থি বৌদ্ধরা রোহিঙ্গাদের ওপর নির্বিচার হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও অঘ্নিসংযোগ শুরু করার পর, আক্ষরিক অর্থেই লাখ লাখ নির্যাতিত নারী, শিশু ও পুরুষ কোনো রকমে প্রাণ নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পর; অঞ্চলটি ঘিরে চীনের নকশা কি নড়বড়ে হয়ে পড়েছে? অন্তত চীনের দিক থেকে যে যথেষ্ট সিরিয়াসলি নেওয়া হয়েছে, ঘন ঘন সফর ও মীমাংসাসূত্র ‘দ্বিপক্ষীয়’ রাখার অনুরোধের মধ্যেই তা স্পষ্ট।

চীনের বেকায়দা হচ্ছে, রোহিঙ্গা সংকট তার জন্য শ্যাম রাখি না কুল রাখি পরিস্থিতি তৈরি করেছে। রাখাইন ঘিরে সাত বিলিয়নের বেশি বিনিয়োগ উদ্যোগ শুধু আর্থিকভাবে বড় বিষয় নয়; শুধু অর্থনৈতিকভাবে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প নয়; বরং এর সঙ্গে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে বেইজিংয়ের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত অবস্থানের বিষয়ও জড়িত। এখন রোহিঙ্গা ইস্যু যদি বহুপক্ষীয় বা আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠে, স্বাভাবিকভাবেই চীনের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক একাধিপত্যের নকশা ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। বিশেষত এই সংকটের শুরুতেই যেখানে ঢাকা প্রস্তাব দিয়েছে, রাখাইনে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে একটি ‘নিরাপদ অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠা করা হোক। নিরাপদ অঞ্চল মানে স্বভাবতই জাতিসংঘের ব্যানারে বহুজাতিক বাহিনীর উপস্থিতি।

এর বাইরে নয়াদিল্লীর বিষয়টিও মাথায় রাখতে হচ্ছে বেইজিংকে। বঙ্গোপসাগর ও রাখাইন অঞ্চল ভারতের জন্য ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি একদিকে চায় রাখাইনের কালাদান বন্দর প্রকল্পের বাইরেও উপস্থিতি বজায় রাখতে, অন্যদিকে তাদের ‘দোকলাম-দোস্ত’ চীনের প্রভাব ও উপস্থিতি যথাসম্ভব খর্ব করতে। বেইজিংয়ের প্রতি রেঙ্গুনের যে কোনও মাত্রার অসন্তোষ ও অনির্ভরতার সর্বোচ্চ সদ্ব্যাবহার করতে চাইবে নয়াদিল্লী। যে কারণে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত তাদের ‘পরীক্ষিত বন্ধু’ ঢাকার পক্ষে থাকার বদলে ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থান নিয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে চীন চাইছে, মিয়ানমার তার প্রতি আরও নির্ভরশীল হোক। রোহিঙ্গা ইস্যুতে যখন সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে বড় বেকায়দায়, তখন বেইজিং রেঙ্গুনের ‘ফ্রেন্ড ইন নিড’ প্রমাণিত হোক। আবার বাংলাদেশও যাতে চীনের প্রভাবের বাইরে চলে না যায়, সেটাও নিশ্চিত করতে চাইছে। এই কারণেই রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘের নিন্দা প্রস্তাবে সায় দিলেও কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের বিপক্ষে ভোট বা ভেটো দিয়ে আসছে। একই কারণে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর শেষে মিয়ানমার গিয়ে যে সমাধানসূত্র দিয়েছেন, তাতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার কথা রয়েছে; রাখাইনে শান্তি ও স্থিতিশীলতার কথা রয়েছে; অস্থিতিশীলতার কারণ অনুন্নয়ন দূর করে রাখাইনের উন্নয়ন নিশ্চিত করার কথাও রয়েছে; কিন্তু রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার কথা নেই।

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক