শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বেড়ে উঠুক মেধাও !

অনেক আগে একটি গল্প শুনেছিলাম। এক লোক তার ছেলের জন্য এক গোয়ালা ঠিক করেছিল যিনি প্রতিদিন তার বাসায় গিয়ে ১ লিটার করে দুধ দিয়ে আসবে। এভাবে প্রতিদিন ১ লিটার করে দুধ খেতে খেতে তার ছেলেটি দিন দিন বলিষ্ঠ হতে থাকল। ছেলের বাবাও মহাখুশি। তিনি ভাবলেন, আচ্ছা আমি দুধ নেওয়ার সময় তো গোয়ালার সাথে দাম নিয়ে খুব একটা কথা বলি নি। গোয়ালা যদি ৪০ টাকায় ১ লিটারের বদলে ২ লিটার দিতে পারে তাহলে মন্দ হয় না। লোকটা পরদিনই গোয়ালাকে বললেন এবং গোয়ালা রাজিও হয়ে গেল। পরদিন থেকেই তার ছেলে প্রতিদিন ২ লিটার করে দুধ খেতে শুরু করল। এটি দেখে লোকটি আরও খুশি। কিছুদিন যেতে না যেতেই লোকটির মনে হল, আচ্ছা ৪০ টাকা দিয়ে যদি গোয়ালা ৩ লিটার দুধ দিত, তাহলে আরও ভালো হতো। তিনি ভাবলেন তিনি বলে দেখবেন গোয়ালাকে। বলতে তো আর ক্ষতি নেই। পরদিনই তিনি আবার গোয়ালাকে ৪০ টাকায় ৩ লিটার দুধের কথা বললেন। গোয়ালা তাতেও রাজি হয়ে গেল। এভাবেই চলতে থাকল। কিন্তু দিনে ৩ লিটার করে দুধ খেয়েও তার ছেলের স্বাস্থ্যের খুব একটা পরিবর্তন হচ্ছিল না। লোকটি চিন্তায় পড়ে গেলেন। তিনি ভাবলেন দুধের পরিমাণ আরও বাড়াতে হবে। তাই তিনি গোয়ালাকে সেই ৪০ টাকায় ৪ লিটার দুধের কথা বলাতেই গোয়ালা বলে উঠল, ‘মশাই, ১ লিটার দুধে আর কতো লিটার পানি মেশানো যায়!’

বর্তমানে আমাদের দেশে শিক্ষা নিয়ে এতো মাতামাতি হচ্ছে যে এই শিক্ষার অবস্থাও আজ এমন রূপ ধারণ করেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছে, শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে কিন্তু বাড়ছে না শিক্ষার মান! মানহীন শিক্ষা শিক্ষিত রূপী এক অশিক্ষিত জাতি তৈরি করছে, যারাই হয়ে দাঁড়াচ্ছে দেশের বোঝা। দেশে এখন প্রায় শতভাগ শিক্ষার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে। শিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের দেওয়া হচ্ছে উপবৃত্তি। দশমশ্রেণি পর্যন্ত সকল পাঠ্যপুস্তক বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, এই বইগুলো জানুয়ারি মাসের ১ তারিখেই জাতীয় পাঠ্যপুস্তক দিবসে সকল শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। পৃথিবীর আর কোনো দেশে এমনটি আছে কিনা আমার জানা নেই। এতো কিছুর পরও আমরা সরে এসেছি মূল লক্ষ্য থেকে। যাদের জন্যই এতো কিছু, তারা পড়ছে তো? তারা শিখছে তো?

উত্তরটি কঠিন হলেও সত্য, ‘তারা স্কুলে যাচ্ছে ঠিকই, শিখছে না কিছুই।’ শিক্ষা নিয়ে দেশে যতোটা মাতামাতি করা হয়, শিক্ষার মান নিয়ে খুব একটা মাথা খাটানো হয় না। যার কারণে দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো তৈরি হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষার্থীও বাড়ছে প্রচুর। তবে শিক্ষা ব্যবসা করতে গিয়ে দেশে এতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি হচ্ছে যে কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীই ভর্তি হচ্ছে না। গত বছর একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য ৪৮ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীও আবেদন করে নি। তবে আরও রোমাঞ্চকর তথ্যটি হল ৭০০ টি প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেছে শুধুমাত্র এক থেকে দুইজন শিক্ষার্থী। শিক্ষা নিয়ে যে জমজমাট ব্যবসাটা এদেশে হচ্ছে তা এখন আর লুকোচুরি কিছু নয়, রাস্তায় নামলেই বুঝা যায়। কোচিং সেন্টারের বিজ্ঞাপনে চোখ হাঁপিয়ে উঠে।

আর শিক্ষার মানের বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে ফুটে উঠেছে বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে। ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ তে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের অনেক দেশে প্রচুর শিক্ষার্থী স্কুলে যাচ্ছে, কিন্তু তারা কিছুই শিখছে না। গ্রামীণ ভারতের পঞ্চম শ্রেণির অর্ধেক শিক্ষার্থী ‘৪৬ থেকে ১৭ বিয়োগ করলে কত হয়?’- এরকম দুই অঙ্কের বিয়োগের সমাধান জানে না। ‘দি নেম অব দ্য ডগ ইজ পাপ্পি’- এই বাক্যের অনুবাদ জানে না কেনিয়া, তাঞ্জানিয়া ও উগান্ডার তৃতীয় শ্রেণির চার ভাগের তিন ভাগ শিক্ষার্থী।

বাংলাদেশের স্বাক্ষরতার হার উন্নত দেশগুলোর মতো হলেও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে এদেশে অনেক শিক্ষার্থী ঝড়ে পড়ে। সেই রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, অনেকেই বছরের পর বছর স্কুলে গেলেও অশিক্ষিত থেকেই যাচ্ছে। শিক্ষা পদ্ধতির ধরনটা এমন যে, কে শিখছে আর কে শিখছে না- তার কোনো মূল্যায়ন হচ্ছে না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া ১০০ জনের মধ্যে ৬১ জন নিম্ন মাধ্যমিক শেষ করতে পারে। আর ৩৫ জন উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত যায়। অশিক্ষিত থেকে যাওয়া এসব শিক্ষার্থী চাকরির বাজারে উপযোগী হয়ে উঠতে না পেরে বেকার হয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ আবার স্নাতক শেষ করে পিয়নের চাকরিও করছে। ফলে ব্যক্তিগত জীবনে তারা হয়ে পড়ছে অসুখী। কিন্তু এসব শিক্ষার্থীর পেছনে সরকারের এতো ব্যয়, পুরোটুকুই বিফলে যাচ্ছে। শুধু সরকারের সম্পদই নষ্ট হচ্ছে না, এই জনগোষ্ঠী নিয়ে দেশ এক হুমকির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের বয়ঃসন্ধিকাল চলছে। চলতে গিয়ে বার বার হোঁচট খাচ্ছি আমরা। এগুলো সংশোধন করে এগিয়ে চললেই বাংলাদেশের যৌবন হবে সমৃদ্ধিময়। অন্যথায়, হারে হারে জবাব দেবার প্রস্তুতি নিতে হবে আমাদেরই।

শাহ জালাল জোনাক ,

তরুণ লেখক ও কলামিস্ট