অনলাইন জালিয়াতির ৬৭ শতাংশ ক্ষেত্রে ব্যাংকাররা জড়িত

নিউজ ডেস্ক:  অনলাইন ব্যাংকিং জালিয়াতির প্রায় ৬৭ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যাংকাররা জড়িত। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তথ্যপ্রযুক্তি সেবা দাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশে ব্যাংকাররা এ জালিয়াতি করে থাকেন। এ ধরনের ঘটনা অনলাইন ব্যাংকিংয়ে সুযোগের পাশাপাশি ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। গ্রাহকদের সঙ্গে এমন প্রতারণার ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটছে এটিএম ও প্লাস্টিক কার্ড এবং মোবাইল ব্যাংকিয়ের মাধ্যমে।

ব্যাংক খাতের ৫০টি জালিয়াতির ঘটনার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ ইনিস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণায় উঠে এসেছে এমন তথ্য। বৃহস্পতিবার বিআইবিএম মিলনায়তনে ‘অলটারনেটিভ ডেলিভারি চ্যানেল : অপরচুনিটিজ অ্যান্ড চ্যালেঞ্জ অব দ্য নিউ ব্যাংকিং এনভারনমেন্ট’ শীর্ষক কর্মশালায় গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়।

কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান। স্বাগত বক্তব্য দেন বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী। কর্মশালায় গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করে বিআইবিএমের সহযোগী অধ্যাপক মো. মাহবুবুর রহমান আলমের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যাংকিং জালিয়াতির ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটছে এটিএম ও প্লাস্টিক কার্ডের মাধ্যমে। প্রায় ৪৩ শতাংশ ঘটনা প্রযুক্তিভিত্তিক। এমন প্রতারণার ২৫ শতাংশ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঘটছে। অনলাইন চেক ক্লিয়ারিং (এসপিএস) ও ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের (ইএফটি) মাধ্যমে ঘটছে ১৫ শতাংশ। ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে ১২ শতাংশ, ব্যাংকিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে ৩ শতাংশ এবং সুইফটের মাধ্যমে ২ শতাংশ জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে।

এতে আরও বলা হয়েছে, অনলাইনে এমন জালিয়াতির প্রায় ৬৭ শতাংশ ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যাংকাদের জড়িত থাকার তথ্য মিলেছে। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও তথ্যপ্রযুক্তি আইটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশে এ প্রতারণা হয়ে থাকে। এর মধ্যে ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্মকর্তা এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা ঘটান। শুধু ব্যাংক কর্মকর্তারা ঘটিয়েছেন ১৮ শতাংশ জালিয়াতি। আর ৯ শতাংশ জালিয়াতির সঙ্গে ব্যাংকার ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশ রয়েছে।

কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাজী হাসান বলেন, বিকল্প ব্যাংকিং ব্যবস্থা খুবই ভালো। তবে এর অপব্যবহার হলে আর্থিক খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের অপব্যবহার করে বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স আনা হচ্ছে। ব্যাংকারদের প্রযুক্তির অপব্যবহার সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে যাতে আর্থিক খাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে।

তিনি বলেন, অনলাইনভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু হওয়ায় ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয় অনেকাংশে কমেছে। মাত্র দুই লাখ জনবল দিয়ে এতগুলো ব্যাংকের কয়েক হাজার শাখায় ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অনলাইন ব্যাংকিং চালু না হলে এতগুলো শাখা পরিচালনায় ১০ লাখেরও বেশি জনবল প্রয়োজন হতো।

পূবালী ব্যাংকের সাবেক এমডি ও বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক হেলাল আহমদ চৌধুরী বলেন, বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি হয়েছে। ১০ টাকার হিসাব খোলার সুযোগ দিয়ে শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবাইকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় আনার পরিমাণ আরও বাড়াতে হবে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ইয়াছিন আলী বলেন, বাংলাদেশের সবাইকে ১০ টাকার হিসাব খোলার জন্য বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডির প্রশংসা করে তিনি বলেন, এর ফলে ব্যাংকিং খাতে জালিয়াতি অনেক কমে এসেছে।

ব্যাংক এশিয়ার এমডি ও প্রেসিডেন্ট মো. আরফান আলী বলেন, আগামী দিনে ব্যাংকিং খাতের প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুতি না থাকলে ভয়াবহ সমস্যার মুখে পড়বে ব্যাংকিং খাত। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে সবাইকে মনোযোগী হতে হবে।

কর্মশালায় উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে বিশিষ্টজনরা বলেন, অনলাইন ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে সবাইকে আরও সচেতন করতে হবে। লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত তথ্যের গোপানীয়তা নিশ্চিতে গ্রাহক ও ব্যাংক উভয়পক্ষকে আরও সতর্ক হতে হবে। ইন্টারনেটের ডেটা খরচ কমানো উচিত। ডেটা খরচ কমালে গ্রাহকরা সুবিধা পাবেন। এ ছাড়া এ ক্ষেত্রে ব্যাংকারদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। বিকল্প চ্যানেলে লেনদেনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংকগুলো এখনও অনেক পিছিয়ে আছে। এর অন্যতম কারণ এসব ব্যাংকের অনেক শাখায় এখনও বিদ্যুৎ যায়নি।

সূত্র: সমকাল