জনক জননী

এম.এস প্রিন্স
হেমন্তের ৬ষ্ট দিন, বেলা দ্বী-প্রহর
গেণ্ডারিয়ার গলি পথে হাঁটু জল, বৃষ্টি অঝর।
সবে আজ বাসাতে কাঁথা গায় বিছানায় ঘুমে
কাজ বাজ যার যত নিয়া নিল মধুর আনন্দে জমে
আর বাসাতেও, তাই বুঝি নামেনি কেউ পথে
শুধু বাঁকা জল খেলা করিতেছে জন শূন্যে রথে।
তবে আমি রাস্তার পাশে বেলকুনিতে বসা একা
নীরব চোখে ঘুম নেই নেই মা-বাবার দেখা।
ঈদ গেল বহু দিন।

ঈদের তিন দিন পর বিদায় নিয়া এলাম শহরে
কর্মের জরি যদি মিলে কপলে ভাগ্য চাকা ঘুরে
মাস শেষে মায়না পাব মা-বাবার কাপড় কিনে
হাসি মুখে বাড়ি যাব। না জানি এত দিনে
চিন্তা করিতে করিতে শরীরে কী হাল করিল মায়
জন্মিয়া দেখি নাই নতুন কাপড় জড়াতে গায়।
আমাকে এম.এস.এস পাশ করায়েছে বাবা সাধনায়
যেন ছেলে অন্যের জমিতে কাজে না যায়।
বলে চোখের জল ফেলে আবারো কয়- কড়া সূর্যে
পিঠ পুড়ে সকাল দুপুর দু’মুঠো ভাত, বেলার সাঁঝে
আরো কত কথা কত কাজ বাজ থাকে পড়ে
আগামী কাল আসিও, মায়না নিও একেবারে।
বলে বিদায় দেয়, কিন্তু সংসারে কী যে হাল
ওরা বুঝতে চায় না, বাপজান তোর দিন কাল
ফিরে আসুক বড় হ, একদিন এই অভাগার
সব দুঃখ মুছে দিস মুখে শান্তি সুখের আহার।
বাবার কথায় মন কাঁদে, তবু পাষাণ হৃদে
ভুলে সম্মুখে চলি যত অপযশের ঝুড়ি লয়ে কাঁধে।
আমাকে প্রতিষ্টিত হতে হবে হবে নিতে চাকরি
প্রথম বেতনে মা-বাবার কাপড় কিনে যাব বাড়ি
সঙ্গে রবে আরো কত ফল মিষ্টি রসমলাইর হাঁড়ি।
জন্মিয়া দেখি নাই আজো বাবা-মার মুখে
ফল কী মিষ্টি কি বাজারের ভালো মাছ জুখে
উৎসাহে পুরে, তবু সুখি তারা ধরা তলে
বাঁধা দু’জনে সাধ্যানুযায়ী সাধ-আহ্লাদের আঁচলে।
এখানে শোক নেই মলিন নেই নেই কোনো ক্ষয়
নিরাকার বন্ধন কী মায়া! খাবারে পাশাপাশি বয়।
আরো বেশি খুশি হই আমি, যখন দু’জনে আমারে
ময়না টিয়া চানার মত খাইয়ে দেয়, স্নেহ নূরে
শরতের ভরা শস্যক্ষেত্রের মত বুকে সবুজের নায়ে
না জানি এতদিনে তারা চড়ে কোন অসুখের নায়ে?

মা-বাবার কাপড় আমার প্রতিষ্টিতের জরি সবি হবে
স্পর্ধাভরে এই ভেবে
এ পাড়ার ভাই ও-পাড়ার বোনের অফিস এইখানে
সিভি নিয়া চলি ফিরি ব্যথা ভরা নয়নে।
বুঝেনি কেউ চায়ও না বুঝিতে এক মুঠো ভাতের কী জ্বালা
ইচ্ছে করিলেও পারি না খুলিতে সব কাজের তাল।
এই গীত উৎসবে দিন চলেছে দিনেরি মত
ব্যথা ভরা হৃদে যত দুঃখ ক্ষত
বয়ে চলি একা নির্জনে – তবে সব বাহিরের দ্বারে
সৌন্দর্যের প্রেমগানে উপস্থাপিত হই সবারি ধারে
বুঝিতে দেই নাই ভেতর রূপ কী উজ্জ্বল মায়া
পাষাণের ডোরে বাঁধা আছে মধুময় মৌনছায়া।
ক্ষনিকের পরিচয়ে একদিন একজনাকে ডাকিয়া কই
আমার সঙ্গীত ধ্বনির মল্লিকার বিকাশ না জানি কই?
এই টাকা যাই পারেন যেখানেই পারেন দেন করে বসিবার ঠাঁই
আমার প্রেমচ্ছবির মোহন যেন গৌড়বে ফিরে পাই।
সেই যে গেল, আমি আছি আজো আগেরি হালে
সম্মুখে আবার ঈদ।

প্রায় বছর কী কদম্বের হাসিতে ফিরে প্রণিপাতে
উচ্ছাসিত হৃদে আমি তুলে দিব কী মাল্য হাতে?
তবু যেতে হবে- সম্মুখে ঈদ বাবা-মা বড় আশে
পথ চেয়ে বসে আছে কবে সোনা মানিক ফিরে আসে
নাই বা যদি যাই, শ’দিনে এমনি একটা দিনরে ভাই
আপনার মাঝে অপরাধী হব কত বলিবার জরি নাই
নাই বা হোক চাকরি নাই বা আর- তবে এই শহরে
ক্ষণকাল কাহিনীর গঁথিত মালায় ঠাঁই নিল টিউটরে।
দু’চার জন ছাত্র পড়ায়ে মাসে যা আসে
তা থেকে খাওয়া পড়া তবু মহোৎসবে আশে
সোনামুখ উজ্জ্বল করিতে বরণ করেছি যত আছে দাবে
পৃথিবীর আড়ালে নীরবে।
মায়ের শাড়ি বাবার পাঞ্চাবী রসমলাই আপেল
যথেষ্ট না, সময়ের দাবী যত করে আরো উদ্ধেল
প্রদীপ জ্বালায়ে নব রঙ্গে কমলিনীর নূরে
তবু বৃথা কাহিনীর তরে বাঁধা আমি নিয়তির দাঁড়ে।
যাই নিয়েছি এবার চলি ফিরে বাড়ি।

একথায় দীর্ঘশ্বাসে আমারো যত কাপড় চোপড়
ব্যাগে করে চলিলাম – বুকের পাজর নিথর।
কত বাঁশ বৃক্ষের ডাল নুয়ে রয়েছে ঘরের ছালে
শুকনো পাতায় আঁটা ধরিল টিনে বৃষ্টির জলে।
না জানি কত কাল হাত পড়েনি? দরজায় তালা
ধূসর ছায়া ঢাকা আজিকের এই গগন তলা।
শুধু ঘাস জন্মিল না আরো যত সবে এমন আদাড়
জনশূন্যে বুঝিতেছি হয়নি দেয়া কভু উঠুন ঝাড়।
এঘরে ওঘরে এদিকে ওদিকে তাকায়ে বারেবার
মা-বাবাকে ডাকিয়াও কোনো সাড়া পাইনি আর ।
দেখি নাই শুনি নাই সেই হাঁস মুরগীর করুণ স্বর
না জানি কত ইঁদুর লুকায়ে রয়েছে ঘরের ভিটে গর্তের ভিতর
মাটি তুলে কী যে নাজে হাল!
জীবন চলার পথে আজিকের জীবন কাল আমার অকাল।
বুকে বজ্রবিদ্যুৎ মনন নির্জন দ্বীপ বুঝে পড়শী বাড়ির চাচি
দীর্ঘশ্বাসে এসে- ‘আমার সাত রাজার ধনরে তুই বাবাজি।’
এই বলে হাত ধরে পুকুরের দক্ষিণ পাড়ে নিয়ে
কহিল কাপড়ের আঁচলে চোখের জল মুছে দিয়ে-
‘বাপরে তোর এইখানে মা’র চল্লিশায় সেই প্রেমতর
পাশাপাশি ঘুমায়ে রয়েছে নীরবে যেন জোড়া কবুতর।’
মা ! বাবা! একদিন প্রাণ শক্তির প্রতিক নাবিকের বেশে
এ-জীবন গল্পে লিখেছিল চন্দ্র জে্যুাতিতে মৌ এসে-
জীবনের সুধারস পেয়েছি তোমার জীবন সৈকতে
দেখি কত নিরাকার প্রেমের ঝর্ণা সোনালি রথে
বন্দরে পাল তোলা জাহাজ, এসবি সবুজ নাটকে ঘেরা
আপনারে মিলায়েছি ভালোবাসায় পূর্ণ দায়িত্বভারা।
আর কোথাও না, যেন তোমারি বুকেই হয় মরণ
মনে নেই চলে গেল, অর্থ চাকরি না থাকিবার কারণ।
সে এখন আর পৃথিবীর, কিন্তু তোমরা! এই ধরা তলে
কেন আমারে একা করে ঘুমায়ে রয়েছ মাটির তলে?
এই দেখ নতুন কাপড় বাবার জন্যে এই পাঞ্চাবী
গায়ে জড়ায়ে পালন কর যে আদেশ করিল আখেরি নবী।
দেখ পরমানন্দে বধু – একদিন তোমরাই বলেছিলে
বারণ করেছি শুধু বেকার জীবনে প্রাপ্তির অপূর্ণতার ছলে
সব বাবা-মায়ের মত আমাদেরও আশা – বিয়ে করায়ে
বধু ঘরে তুলিব। চোখের সামনে হাঁটিবে নূপুর পায়ে
রাঁধিবে গল্প করিবে শ্বশুর শ্বাশুড়িরে আরো ভক্তি ভরে-
আজিকে সবি ভুলে ভাসিতেছ কেন ওই নীলাম্বরে?
তাছাড়া এই ঈদের পরে শহরে চলিব আমি আবার
নারিকেলে গুড়া নাড়– দিবে না কী বানায়ে আর?
দিবে না কী বিদায় কালে মাথায় হাত বোলায়ে
কোরান তিলাওয়াত করে ফুঁ আমারি সাড়া গায়ে?
স্পর্ধাভরে আঁচলে মুখ মুছে?

বাপরে! জীবনে যা হারায়ে গিয়াছে আর ধরা তলে
ফিরে পাইবার মত না, তবু ল খুঁজে আমারি আঁচলে।
বলে চাচি বাড়ি নিয়া গেল, তার মোহ সঙ্গীতে
ভুলায়ে বেদনা বেদনাই স্ফটিক স্বচ্ছ নিরাকার রথে।
অলৌকিক শুভ্রতায় জেগে ওঠে নীরবে খায় শকুনে
এই পৃথিবীর অঙ্কিত বৃত্তের ব্যসার্ধের কোন এক কোনে
বেঁচে আছি তবু। দীর্ঘশ্বাসে মেঘের অঞ্চল ছেড়ে
এ জীবনে নতুন গল্পে ঘরে এলাম বহু দিনের পরে।
দড়িতে এই কাপড় এই পাঞ্চাবী এই একখানা চ’ড়ি
টেবিলের কোনে, স্বপ্নের মত ও সব ফ্রেমতরি
গর্বে ধরিয়াছে, সবুজ ঘাসে শিশিরের মত মা-ও বাবাকে
হাতের স্পর্শ যেন কড়া সূর্য, বিলিন হয় কোন বাঁকে
না জানি, না জানি কত ইঁদুর চিকা তেলাপুকা – থর
বিছানাও বাকি নাই – ছড়ানো গুফুলে ধূসর।
মাকড়সার জাল! ধুলি বালি! ঢাকা এই ধরা তল
ঝেড়ে ধুয়ে মুছে সাজায়েছি, শীতল মেঘের অঞ্চল
ছেড়ে আপনার উজ্জ্বলতায় বিকশিত হইবার আশে
ঈদ শেষে শহরে আসি। অবশেষে-
বুঝি নাই মায়ের লাগি
কেনা কাপড় আমার চাচির আরাধনায় হবে যুগী।
বুঝি নাই চাচির ঘরেই খাবার দাবার চাচির ঘরেই ঈদ
মায়ের মত করেই বিদায় দিবে দিবে ভরে হৃদ।
তবু কী মায়ের অভাব পূরণ হয়?

এই ভাবনায় বিভোর আমি, বাসার বেলকুনিতে বসি
এতক্ষণ পরে দ্বারে- একি ঠুকা শব্দ! ওকি শরৎশশী?
বাহিরের বৃষ্টির ছন্দ সবুজ তৃণের মত বয়ে এইখানে
আমাকে মিলায়েছে যে আভিজাতে মা-বাবার প্রেমস্তনে
তা থেকে ফিরায়েছে বাস্তবতায়। কী শস্যশ্যামল!
দ্বার খুলে দেখি এক ভিক্ষুক। গা থেকে ঝরিতেছে জল।
গামছা দিলাম, মুছিল – শীতল গা কাঁপিতেছে থরথর
গভীরে হায় কী ক্রন্দন বলিলাম- ‘বসুন ঘরের ভিতর।’
ধরা তলে সৃজন পথে নব সঙ্গীতে বৃক্ষপত্রালির
থরে থরে লিখিব চাওয়া পাওয়ার গল্প, যত পনির
অলৌকিক শুভ্রতায় প্রকৃয়া করনে মানবের তরে
বিলাব, বসিব সে যুত নাই। সংসার জুড়ে-
মন, ‘কিছু দয়া কর।’ আরো দশ ঘর যদি ঘুরি
মা লক্ষ্মী বর দিবে, বাড়ি যাব এই থলি ভরি।
ছেলে-পুলে বউয়ের মুখে হাসি ফুটিবে। দয়া কর

এই মাত্র ক’দিন শহরে এলাম, শূন্য হাত
কেমনে করি আপনার সে কথার কর্ণপাত?
খাই দাই – শিক্ষা প্রদীপ যে ঘরে জ্বালি
তবে আরো যারা দু’চার দিন পরে পাব- এই থলি
যত লয় তত দিব। শুধু আজিকে দয়ায় পুরে
রবের তরে আরাধি করুন, মা-বাবা ওপাড়ে
না জানি কেমন আছে?
এ-কথার জবাবে দীর্ঘশ্বাসে বলিল – বাবারে শুন
খালি মুখের দোয়া কেমনে ছোঁবে খোদার উঠুন?
যেদিন পারিবে সেদিন বলিও- স্বচ্ছ পবিত্র ঝর্ণায়
দেখিবে মা-বাবা ভাসিতেছে সবুজ মেঘের ছায়।
বলিয়া মিলিল কোন রঙ্গে না জানি
অবাক আমি শুধু চেয়ে দেখিতেছি বাহিরের বৃষ্টির স্তনযোনি।